যাই হোক, ওদের বললাম আমি। এবার তাহলে পানমাসির পিছু নেওয়ার সময় হয়েছে। কথা বলার সময় শেষ। এবার রক্ত ঝরানোর সময় চলে এসেছে।
ওদের দুজনের সাথে কথা বলা শেষ করে জাহাজ থেকে নেমে এলাম আমি, বন্দরের পথ ধরে দ্রুত পায়ে এগিয়ে চললাম অন্য পাশে। সেখানে দাঁড়িয়ে আছে মেমনন, আসন্ন যাত্রার প্রস্তুতি হিসেব নোঙরের দড়ি গুটাচ্ছে।
ভেবেছিলাম তোমার প্রস্তুতি নেওয়া আর শেষই হবে না, আমাকে জাহাজে উঠতে দেখে গম্ভীর গলায় বলে উঠল রামেসিস। সেরেনার অপহরণের খবর শোনার পর থেকে এ পর্যন্ত ওর মুখে হাসি দেখিনি আমি। মহান দেবতা জিউসের সম্মান আর মর্যাদার কসম, এতক্ষণ কোথায় লুকিয়ে ছিলে, টাইটা?
তুমি কি আমার ওপর কাপুরুষতার অভিযোগ আনছ? আমার গলায় এমন কিছু একটা ছিল, ফ্যাকাশে হয়ে গেল রামেসিসের মুখ। এক পা পিছিয়ে গেল সে।
ক্ষমা করো, টাইটা। এমন কথা বলা মোটেই উচিত হয়নি আমার, বিশেষ করে তোমাকে। কিন্তু কী করব, শোকে পাগল হওয়ার দশা হয়েছে আমার।
আমিও, রামেসিস। সে জন্যই তোমার একটু আগে বলা কথাটা আমি মাথা থেকে মুছে ফেলেছি। বলেই সরাসরি কাজের কথায় চলে এলাম আমি। আমার পায়রাগুলো তুলেছ জাহাজে?
বারোটা খাঁচার সবগুলোই তোলা হয়েছে। সবগুলোই মেয়ে পায়রা, কারণ ওগুলোই সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী, দ্রুতগামী এবং আর সব মেয়েদের মতোই একগুয়ে, যেমনটা তুমি আমাকে প্রায়ই মনে করিয়ে দিতে। যেন ওর কথার জবাবেই পরিচিত বাক-বাকুম শব্দ ভেসে এলো জাহাজের নিচের ডেকের ওদিক থেকে। মৃদু হাসি ফুটল রামেসিসের ঠোঁটে, খুব সম্ভব সেরেনাকে হারিয়ে ফেলার পর এই প্রথম।
তোমার গলা শুনতে পেয়েছে ওরা। তোমাকে খুব ভালোবাসে পায়রাগুলো, ঠিক আমাদের মতো।
তাহলে এবার জাহাজটাকে বন্দর থেকে বের করো, এখনই তোমাদের ভালোবাসার একটু প্রমাণ দাও আমাকে, বলে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলাম আমি। পায়রাগুলোকে একটু দেখা দরকার।
আমার কামরায় রাখা আছে খাঁচাগুলো। সেগুলোর পাশেই পাওয়া গেল আমার লেখার সরঞ্জাম রাখার বাক্স, সাজিয়ে রাখা হয়েছে টেবিলের ওপর। তার পাশে গোল করে পাকিয়ে রাখা কিছু প্যাপিরাস। প্রায় সাথে সাথেই টেবিলে বসে পড়লাম আমি, লুক্সর শহরে উটেরিকের প্রাসাদের পাশে মদের দোকানে আস্তানা গেড়ে বসা ওয়েনেগের কাছে পাঠানোর জন্য একটা ছোট কিন্তু স্পষ্ট চিঠি লিখতে শুরু করলাম। চিঠিতে লিখলাম, আমার দৃঢ়বিশ্বাস যে উটেরিকই সেরেনাকে অপহরণের নির্দেশ দিয়েছে। যদিও কাজটা হাতে-কলমে করেছে পানমাসি।
পানমাসি এখন মিশরের পথে রওনা দিয়েছে আর তার পিছু নিয়েছি আমরা। যদিও আমাদের চাইতে কমপক্ষে প্রায় বারো ঘণ্টার পথ এগিয়ে আছে সে। মিশর পৌঁছানোর আগে তাকে আমরা ধরতে পারব বলে মনে হয় না। আর যদি সত্যিই তাই হয় তাহলে এটা প্রায় নিশ্চিতভাবেই আশা করা যায় যে উটেরিক সেরেনাকে বন্দি করে রাখবে হয় দুঃখ-দুর্দশার ফটক নামের সেই ভয়ংকর কারাগারে আর না হয় লুক্সরের প্রাসাদে। ওয়েনেগকে নির্দেশ দিলাম আমার ধারণা কতটা সত্যি তা যাচাই করে দেখতে। সেইসাথে রাজকুমারীর উদ্ধারে কাজে আসতে পারে এমন যেকোনো তথ্য জানতে পারলে সেটাও সাথে সাথে আমাদের জানানোর নির্দেশ রইল তার ওপরে।
চিঠির লেখা নিয়ে সন্তুষ্ট হওয়ার সাথে সাথে সেটাকে তিন টুকরো হালকা প্যাপিরাস কাগজে আলাদা আলাদা খসড়া করে ফেললাম। আমার চিঠিগুলোকে প্রতিবারই তিনটি করে কপিতে পাঠাই আমি। কারণ এতে নিশ্চিত হওয়া যায় যে অন্তত একটা কপি অক্ষত অবস্থায় প্রাপকের ঠিকানায় পৌঁছে যাবে। স্বাস্থ্যবান পায়রাদের জন্য আকাশপথ বেশ বিপজ্জনক স্থান, কারণ সেখানে প্রায়ই বাজপাখি আর অন্যান্য শিকারির আনাগোনা দেখা যায়। কিন্তু অতীত অভিজ্ঞতা থেকে আমি নিশ্চিতভাবে জানি যে তিনটির মাঝে কমপক্ষে একটা পাখি তার নির্দিষ্ট খোপে পৌঁছবেই, যেখানে ডিম ফুটে জন্ম নিয়েছিল সে।
এবার খাঁচা থেকে সবচেয়ে শক্তপোক্ত দেখে তিনটি পাখি বেছে নিলাম আমি, প্রতিটার পায়ে বেঁধে দিলাম একটা করে চিঠি। তারপর দুটোকে আবার খাঁচায় ফিরিয়ে দিয়ে একটাকে আলতো করে ধরে উঠে এলাম ডেকের ওপর।
ওপরে উঠে আসার সাথে সাথে একটা জিনিস দেখে খুশি হয়ে উঠল আমার মন। ইতোমধ্যে বন্দর থেকে বেরিয়ে এসেছে জাহাজ, এগিয়ে চলেছে খোলা সাগরের দিকে। এবার প্রথম পায়রাটাকে উড়িয়ে দিলাম বাতাসে। তিনবার জাহাজকে ঘিরে চক্কর দিল পায়রাটা, তারপর উড়ে চলল দক্ষিণ দিকে। এর এক ঘণ্টা পর পর বাকি দুটো পাখিকেও ছেড়ে দিলাম আমি, দেখলাম উড়তে উড়তে দিগন্তের ওপারে হারিয়ে গেল তারা। অপেক্ষাকৃত মন্থর গতিতে তাদের পিছু নিয়ে চলতে লাগল মেমনন।
উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে তাজা বাতাস বইছে, আর সেই বাতাসে ভর করে এগিয়ে চলেছি আমরা। ছয় দিন চলার পরেই ক্রিট দ্বীপ পার হয়ে আসতে পারলাম আমরা, এবং আরো পাঁচ দিনের মাথায় দেখা মিলল আফ্রিকান উপকূলের। এই সময়ের মাঝে মোট নয়টা অচেনা জাহাজকে মাঝ সাগরে থামিয়েছে আমাদের জাহাজ, তন্ন তন্ন করে তল্লাশি করা হয়েছে সেগুলো। প্রত্যেকটা জাহাজই প্রথমে আমাদের জলদস্যু ভেবে পালানোর চেষ্টা করেছে। ফলে পিছু ধাওয়া করে ওদের থামাতে বাধ্য হয়েছি আমরা। এবং এই কাজ করতে গিয়ে বেশ লম্বা সময় নষ্ট হয়েছে আমাদের, গিথিয়ন বন্দর থেকে নীলনদের অববাহিকায় পৌঁছাতে স্বাভাবিকভাবে যত সময় লাগে তার চাইতে অনেক বেশি। নয়টা জাহাজের কোনোটাতেই অবশ্য সেরেনাকে পাওয়া যায়নি; কিন্তু রামেসিস আর আমি চাইনি যে ভাগ্যের ফেরে হাতের নাগালে পেয়েও হারিয়ে ফেলি ওকে।
