ওকে নিয়ে সেই কামরায় চলে এলাম আমি, যেখানে আমার লোকেরা পালমিসকে শুইয়ে রেখেছে। যদিও ওর আহত স্থানগুলো ঢাকার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি, মুখ থেকে রক্ত মুছে দিয়েছি, আঁচড়ে দিয়েছি চুলগুলো। শূন্য চোখের পাতাগুলো সেলাই করে বন্ধ করে দিয়েছি, সেলাই করতে হয়েছে এফোঁড়-ওফোঁড় হয়ে যাওয়া পেট। কিন্তু তার পরও এখনো এই অবস্থায় কোনো সন্তানকে তার মায়ের সামনে হাজির করা যায় না। পালমিসকে দেখে চমকে উঠে আমাকে জড়িয়ে ধরল বেকাথা, ওভাবেই রইল কয়েক মুহূর্ত। তারপর হঠাৎ ঝাঁপিয়ে পড়ল ছেলের মৃতদেহের ওপর। শোক আর কান্নার দমকে থরথর করে কেঁপে উঠছে শরীরটা।
কিছুক্ষণ পর অনেকটা জোর করেই বেকাথাকে একটা জোরালো ঘুমের ওষুধ খাইয়ে দিলাম। আমার ওষুধের বাক্স থেকে তৈরি করেছি জিনিসটা। কাজ শুরু হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম ওর পাশে। তারপর বাকি তিন ছেলের একজনকে ডেকে ওর দায়িত্ব নিতে বললাম। তারপর চললাম তেহুতির খোঁজে।
বেকাথার শোকার্ত অবস্থা দেখার চাইতেও কঠিন পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হলো এবার আমাকে।
প্রথমে তেহুতির পরিচারিকাদের বাইরের ঘরে অপেক্ষা করতে বললাম আমি, তারপর ঢুকলাম ওর শোবার ঘরে। বিছানার ওপর শুয়ে ঘুমাচ্ছিল ও, পরনে একটা লম্বা রাতপোশাক। সুন্দর লম্বা চুলগুলো মাথার চারপাশে ছড়িয়ে আছে, ঠিক যেন ট্যাগেটাস পর্বতমালার ওপর চাঁদের আলোয় ঝলকাচ্ছে তুষারের শুভ্র স্তূপ। মনে হচ্ছে যেন আবার ছোট্ট একটা মেয়েতে পরিণত হয়েছে ও। ওর পাশে শুয়ে ওকে জড়িয়ে ধরলাম আমি।
টাইটা! চোখ না খুলেই ফিসফিস করে বলে উঠল তেহুতি। আমি জানি তুমি ছাড়া আর কেউ হতে পারে না। তোমার গায়ে কি সুন্দর একটা গন্ধ থাকে সব সময়!
ঠিকই ধরেছ তেহুতি। আমি।
ভয় লাগছে আমার, বলল ও। একটা খারাপ স্বপ্ন দেখেছি।
সাহস রাখো তেহুতি। সাহস রাখতে হবে তোমাকে।
পাশ ফিরে আমার মুখোমুখি হলো তেহুতি। খারাপ খবর নিয়ে এসেছ তুমি, আমি অনুভব করতে পারছি। সেরেনার কোনো বিপদ হয়েছে, তাই না?
আমি খুব দুঃখিত, সোনামণি, কথাগুলো বলতে গিয়ে গলায় আটকে গেল আমার।
বলো টাইটা। দয়া করে সত্য গোপন করার চেষ্টা কোরো না আমার কাছ থেকে।
চুপচাপ আমার কথাগুলো শুনল ও। চেহারা রক্তশূন্য পাথরের মতো চোখগুলো জ্বলতে লাগল রাতপ্রদীপের মৃদু আলোয়। সেই ছোটবেলার মতো এখনো ভূতদের তাড়ানোর জন্য মাথার কাছ একটা প্রদীপ জ্বেলে রাখে ও। আমার কথাগুলো যখন শেষ হলো তখন মৃদু স্বরে প্রশ্ন করল তুমি বলছ যে এটা উটেরিকের কাজ?
সে ছাড়া আর কেউ নেই এই কাজ করার মতো।
সে কি সেরেনার ক্ষতি করবে?
না! নিজের অনিশ্চয়তাকে ঢাকতে গিয়ে আপনাআপনি জোরাল হয়ে উঠল আমার কণ্ঠস্বর। উটেরিক একজন উন্মাদ। অন্য স্বাভাবিক মানুষের মতো নয় তার চিন্তাভাবনা। মোটেই না। সেরেনা যদি মারা যায় বা ওর কোনো ক্ষতি হয় তাহলে উটেরিকের কোনো লাভ হবে না। কথাগুলো বলার সময় বাম হাতের তর্জনী দিয়ে মধ্যমাকে আঁকড়ে ধরে রাখলাম আমি। চাই না যে আমার কথা শুনে খেপে উঠুক কোনো রাগী দেবতা।
তুমি আমার খুকুকে খুঁজে এনে দেবে না, টাটা?
হা তেহুতি। নিশ্চয়ই দেব তুমি জানো।
ধন্যবাদ, ফিসফিস করে বলল ও। এখন তাহলে তুমি যাও। না হলে হয়তো বোকার মতো ভেউ ভেউ করে কাঁদতে শুরু করব আমি।
আমার দেখা সবচেয়ে সাহসী নারী তুমি তেহুতি।
এখন বেকাথার আমাকে দরকার। ওর কাছে যেতে হবে আমাকে, বলে আমার গালে চুমু খেল ও। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে টেবিলের ওপর রাখা কাপড়টা পরে নিল, দৃঢ় পদক্ষেপে বেরিয়ে গেল কামরা থেকে। কিন্তু আমার মনে হলো দরজাটা বন্ধ করে দেওয়ার সময় একটা মৃদু ফোঁপানির শব্দ শুনলাম আমি। কে জানে হয়তো ভুলও হতে পারে। খুব কম সময়েই কান্নার কাছে আত্মসমর্পণ করতে দেখেছি ওকে।
*
আমি যখন আবার গিথিয়ন বন্দরে পৌঁছলাম তখন সূর্য দিগন্তের ওপাশে উঁকি দিতে শুরু করেছে। দেখলাম হুরোতাস নিজের জাহাজে উঠে পড়েছে। আমি নিজেও যখন ওর সাথে কথা বলার জন্য জাহাজে উঠলাম, দেখলাম মোলোজন করদ রাজার সাথে সবে মাত্র পরামর্শ সেরে উঠছে ও। রাজাদের সবাই নিজেদের শপথের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান ধরে রেখেছে এবং তা পালন করতে বদ্ধপরিকর। একের অপমান এখন প্রত্যেকের অপমান।
পরবর্তী দুই-এক দিনের মধ্যেই নিজ নিজ দেশের উদ্দেশ্যে রওনা দেবে সবাই। দেশে পৌঁছে প্রত্যেকে তাদের সেনাবাহিনীকে প্রস্তুত করবে, কারণ আমাদের সামনে এখন যুদ্ধ আসন্ন। খবরটা সত্যিই উৎসাহ জোগাল আমাদের। ব্যক্তিগতভাবে আমি ভেবেছিলাম আমাদের এই মিত্রদের মাঝ থেকে কমপক্ষে দুই কি তিনজন শপথ ভঙ্গ করবেই, বিশেষ করে যদি কখনো তাদের সাহায্য করার জন্য ডেকে পাঠানো হয়। সুতরাং হুয়োতাস আর হুইকে অভিনন্দন জানালাম আমি। এটাও জানালাম যে, সেরেনার অপহরণ আর পালমিসের খুন সম্পর্কেও তাদের প্রিয় স্ত্রীদের জানানোর কাজ শেষ হয়েছে। আমার প্রতি ওরা দারুণ কৃতজ্ঞ বোধ করল এবং একই পরিমাণে লজ্জিত হলো নিজেদের কথা চিন্তা করে। এটাই অবশ্য স্বাভাবিক বলে আশা করেছিলাম আমি। দুজনের কেউই তাদের স্ত্রীর সামনে দুঃসংবাদ নিয়ে দাঁড়াতে সাহস পায়নি, শোকের প্রথম ধাক্কাটা সামলানোর মতো শক্তিও খুঁজে পায়নি বুকের ভেতর।
