ঘোড়া নিয়ে আমার পাশে এসে দাঁড়াল দুজন। কে করেছে এই কাজ টাইটা? সবই তো জানো তুমি। ঘোড়া থেকে এক লাফে নেমে এসে আমার কাঁধ চেপে ধরল রামেসিস, পাগলের মতো ঝাঁকাতে শুরু করল।
আমার কাঁধ ছাড়ো রামেসিস, নিজেকে শান্ত করো! ধমকে উঠলাম আমি, তারপর কোনোমতে ছাড়িয়ে নিলাম নিজেকে। এই যে! নিজের চোখেই দেখো! বলে বালির ওপর পড়ে থাকা পায়ের ছাপগুলোর দিকে ইঙ্গিত করলাম আমি।
তোমার কথার কিছু আমার মাথায় ঢুকছে না! হুরোতাসও চোখ রাঙিয়ে চিৎকার করে উঠল। কী দেখাতে চাইছ আমাদের?
ছাপগুলোর একেবারে মাঝখানে যে ছাপটা রয়েছে দেখেছ? বোঝাই যাচ্ছে যে এই ছাপের মালিকের ডান পায়ে সমস্যা আছে। পা টেনে টেনে হাঁটে সে।
পানমাসি! আমার কথার অর্থ বোধগম্য হওয়ার সাথে সাথে উন্মত্ত ক্রোধে চিৎকার করে উঠল রামেসিস। সেই লোক, আমাদের কাছে যার প্রাণভিক্ষা চেয়েছিল সেরেনা! হারামজাদা অকৃতজ্ঞ শূকরটা আবার ফিরে এসেছে এখানে, তারপর সেরেনাকে চুরি করে নিয়ে গেছে উটেরিকের আস্তানায়।
যাই হোক এখন অন্তত এটুকু আমরা নিশ্চিতভাবে জানি যে সেরেনা বেঁচে আছে। এমন মূল্যবান একজন বন্দিকে কিছুতেই খুন করবে না পানমাসি, উটেরিক অনুমতি দেবে না তাকে, হুরোতাস আর রামেসিসকে সান্ত্বনা দিতে চেয়ে বলে উঠলাম আমি।
তোমার কথাই যেন সত্যি হয় টাইটা। কিন্তু এই মুহূর্তে ওদের পিছু ধাওয়া করতে হবে আমাদের। রামেসিসের কথা শুনে মনে হছে যেন ওর ওপর প্রচণ্ড নির্যাতন চালাচ্ছে কেউ। সেরেনাকে ওদের হাত থেকে ছিনিয়ে আনতেই হবে।
আমার মেয়ে আমার একমাত্র সন্তানকে ছিনিয়ে নিয়ে গেছে ওই দস্যুরা। রামেসিস ঠিকই বলেছে। এখনই ওদের পিছু নেওয়া উচিত আমাদের। হুরোতাসও রাগ আর শোকে প্রায় পাগলের মতো হয়ে উঠেছে। দেবতারা সহায় হলে নীলনদের মুখে পৌঁছানোর আগেই ওদের ধরে ফেলতে পারব আমরা। এটা তো নিশ্চিত যে ওখানেই সেরেনাকে নিয়ে যাচ্ছে ওরা।
আমার অবস্থাও ওদের দুজনের চাইতে খুব একটা ভালো নয়; কিন্তু নিজের আবেগকে ওদের চাইতে ভালোভাবে সামলাতে জানি আমি। এখানে দাঁড়িয়ে যত কান্নাকাটি করব ততই আমাদের সময় নষ্ট হবে, কড়া গলায় বললাম আমি। চেষ্টা করছি দুজনের মাথায় কিছুটা বাস্তব বুদ্ধি ফিরিয়ে আনতে। এখান থেকে গিথিয়ন বন্দরে গিয়ে জাহাজ প্রস্তুত করে রওনা দিতে দিতে আমাদের চাইতে প্রায় দশ ঘণ্টার পথ এগিয়ে যাবে পানমাসি। সেইসাথে এটাও মাথায় রাখতে হবে যে ওরা কী ধরনের নৌকা বা জাহাজ ব্যবহার করছে সে সম্পর্কে আমাদের কোনো ধারণা নেই। সৈকতের ওপর তৈরি হওয়া একটা দাগের দিকে ইঙ্গিত করলাম। বোঝা যাচ্ছে যেকোনো জলযানের সামনের অংশ এখানে টেনে তুলে আনা হয়েছিল। এই চিহ্নটা বলছে কোনো একটা ছোটখাটো বাণিজ্যতরী। কিন্তু এখান থেকে মিশর পর্যন্ত সমুদ্রপথের পুরোটা এমন অসংখ্য জাহাজে ভর্তি। এবং আমাদের ওপর চোখ পড়ার সাথে সাথে প্রতিটাই ভাববে যে আমরা জলদস্যু এবং লেজ তুলে পালাবে। যতগুলো জাহাজ চোখে পড়বে তার প্রত্যেকটার পিছু ধাওয়া করতে হবে আমাদের, যা অত্যন্ত কঠিন এবং সময়সাপেক্ষ কাজ। আর ওদিকে পানমাসি তখন জাহাজের প্রত্যেকটা পাল তুলে দিয়ে প্রত্যেকটা দাঁড়ে দ্বিগুণ লোক লাগিয়ে ঊধ্বশ্বাসে ছুটে চলবে নীলনদের মুখের দিকে।
এই কথাগুলো শুনেই দুজনের চেহারায় দুশ্চিন্তার ছাপ ফুটে উঠল স্পষ্টভাবে। পানমাসি যে সরাসরি নীলনদের দিকে নাও যেতে পারে এটা আর ওদের জানানোর প্রয়োজন বোধ করলাম না। এমনও হতে পারে যে উত্তর আফ্রিকার উপকূলে যে অসংখ্য ছোট ছোট বন্দর রয়েছে সেগুলোর কোনো একটায় রথ বাহিনী অপেক্ষা করছে পানমাসির জন্য। সেখানে জাহাজ ভিড়িয়ে বন্দিনীকে নিয়ে লুক্সর পর্যন্ত বাকি রাস্তা স্থলপথে রথের সাহায্যে পাড়ি দিতে পারে সে। এবং পানমাসি যদি একবার মিশর সীমান্তের ভেতর অথবা নীলনদের ভেতরে ঢুকে পড়তে পারে তাহলে তার গায়ে আঙুল ছোঁয়ানোর আর কোনো উপায় থাকবে না আমাদের।
হুরোতাস ঠিকই বলেছে, গলায় যতটা সম্ভব জোর এনে বললাম আমি। এখন প্রতিটা মুহূর্ত আমাদের জন্য মূল্যবান। এই মুহূর্তে গিথিয়ন বন্দরের দিকে রওনা দিতে হবে আমাদের। জাহাজ নিয়ে সাগরে নামব আমরা, বাতাসে একেবারে হারিয়ে যাওয়ার আগেই খুঁজে বের করার চেষ্টা করব পানমাসির গন্ধ।
তবে যতই সাহস বা দর্প দেখাই না কেন চাঁদ ছিল না সে রাতে। ফলে অন্ধকারের মাঝে পথ চলতে গিয়ে অনেক দেরি হয়ে গেল। আমরা যখন গিথিয়ন বন্দরে পৌঁছলাম তখন মাঝরাত পেরিয়ে গেছে।
রামেসিস, হুরোতাস আর হুই মিলে সমুদ্রযাত্রার জন্য জাহাজ প্রস্তুত করতে শুরু করল। আর আমার ওপর পড়ল সেই কঠিন কাজের ভার; তেহুতি আর বেকাথাকে গিয়ে জানাতে হবে তাদের সন্তান হারানোর কথা। যদি বলি যে হুরোতাস এবং হুইয়ের কেউই কাজটা করার মতো সাহস দেখাতে পারল না তাহলে বোধ হয় একটু বেশি নিষ্ঠুরতা দেখানো হয়ে যাবে। তবে ইতোমধ্যে যে ভয়ানক ঘটনাগুলোর সাক্ষী হয়েছি আমি তাতে এখন আর কোনো কিছুই আমাকে বিচলিত করতে পারছে না।
প্রথমেই পালমিসের ক্ষতবিক্ষত লাশ নিয়ে বেকাথার কাছে গেলাম আমি। দাসীরা তাকে ঘুম থেকে ডেকে তোলার পর তাকে দুই হাতে জড়িয়ে ধরে রাখলাম আমি, বলতে চাইলাম যে নিষ্ঠুর ভাগ্য তার ছোট ছেলেকে কেড়ে নিয়ে গেছে। কিন্তু খুব সম্ভব সন্ধ্যার সময় পান করা মদের প্রভাব তখনো সম্পূর্ণ কাটেনি তার। বারবার আমাকে বলতে লাগল পালমিসকে রাতের খাবার খেতে দেখেছে সে। এখন বিছানায় শুয়ে ঘুমাচ্ছে তার ছেলে।
