পালমিস, হুই এবং বেকাথার ছোট ছেলে। সারা শরীরে একটা সুতোও নেই। জবাই করার আগে ওকে নিয়ে নিষ্ঠুরভাবে খেলেছে খুনির দল। পেট চিরে ভেতর থেকে বের করে এনেছে নাড়িভুড়ি। গোপনাঙ্গ কেটে ফেলেছে, কোটর থেকে তুলে নিয়েছে দুই চোখ। আগের সেই সুদর্শন চেহারার কিছুই আর অবশিষ্ট নেই এখন। ওর বাবা-মায়ের জন্য হঠাৎ প্রচণ্ড করুণা হলো আমার।
আবার উঠে দাঁড়িয়ে এদিক-ওদিক তাকালাম আমি। এবার বুঝতে পারলাম, কেন পালমিসের সাথে এই নিষ্ঠুর আচরণ করা হয়েছে। জীবন দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু মরার আগে লড়াই করে মরেছে ও। চার আক্রমণকারীর লাশ ছড়িয়ে পড়ে আছে পথের পাশে জন্মানো ঝোঁপগুলোর মাঝে। মৃত্যু-পরবর্তী দুনিয়ায় আনুবিসের কাছে যাওয়ার জন্য যে পথে গেছে পালমিস তাতে ওর সাথী হয়েছে এই লোকগুলো।
মনের সব ঝাল ঝেড়ে গালিগালাজ করলাম আমি; কিন্তু মুখের কথায় মৃত ব্যক্তির কিছুই আসে-যায় না। এবার আমার মনোযোগ ফিরল জীবন্তদের দিকে অবশ্য যদি কেউ থেকে থাকে আর কি। আক্রমণকারীদের সংখ্যা কত ছিল? মনে মনে ভাবলাম আমি। এখন কিছুই বোঝার উপায় নেই, অনেকগুলো পায়ের চাপে পথের ওপর থেকে সব চিহ্ন মুছে গেছে। আন্দাজ করলাম পালমিসের হাতে খুন হওয়া চারজনসহ কমপক্ষে ত্রিশজন তো হবেই।
কিন্তু আমার মাথার ভেতর আর সব চিন্তার ওপর প্রাধান্য বিস্তার করে আছে সেরেনার জন্য দুশ্চিন্তা। ওর সাথে কেমন আচরণ করেছে আততায়ীরা? ওর কাপড় ছিঁড়ে ফেলার পর সেই নগ্ন সৌন্দর্য দেখে কেউ কি সামলাতে পেরেছে নিজেকে? মনে হলো যেন সেরেনার ওপর অত্যাচার করার সময় খুনিগুলোর পৈশাচিক উল্লাসের শব্দ নিজের কানে শুনতে পাচ্ছি আমি। অনুভব করলাম রাগ, ভয় আর করুণায় মিশ্রিত অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে আমার গাল বেয়ে। তাড়াতাড়ি ঘোড়ায় উঠে বসলাম আমি, তারপর আবার চলতে শুরু করলাম নীল খালের দিকে এগিয়ে যাওয়া পথ ধরে।
পথের ওপর ছড়িয়ে পড়ে থাকতে দেখা গেল আরো সাতটা মৃতদেহ। সবগুলোই পুরুষ এবং সবার ওপরেই মরার আগে ভয়াবহভাবে নির্যাতন চালানো হয়েছে। রামেসিস যাদেরকে রেখে গিয়েছিল সেরেনাকে পাহারা দিতে এরা তারাই। এবার আর থেমে ওদের পরীক্ষা করার জন্য সময় নষ্ট করলাম না। মনের ভেতর ক্ষীণ একটু আশা জেগে আছে, কারণ এখনো সেরেনা বা তার দুই পরিচারিকার কারো কোনো চিহ্ন দেখা যায়নি। হয়তো আততায়ীরা মেয়েদের বাঁচিয়ে রেখেছে। হয়তো ওরা জানত যে অত্যাচার করে খুন করার চাইতে সেরেনাকে অক্ষত অবস্থায় বাঁচিয়ে রাখলে অনেক বেশি মুক্তিপণ পাওয়া যাবে।
জঙ্গলের মাঝ থেকে সৈকতের কিনারায় বেরিয়ে এলাম আমি এবং এসেই থমকে দাঁড়ালাম। দিনের আলো দ্রুত কমে আসছে। তবে আবছা আলোতেও সোনালি সমুদ্রতটের ওপর আততায়ীদের রেখে যাওয়া পদচিহ্ন ঠিকই চোখে পড়ল আমার, এগিয়ে গেছে পানির কিনারার দিকে। কিন্তু আমার চোখের সামনে দ্রুত আঁধার হয়ে আসছে দিগন্তরেখা, ফলে সেখানে যদি কোনো অচেনা জাহাজ বা নৌকা থেকেও থাকে তার অস্তিত্ব বোঝার কোনো উপায় নেই। প্রথমে মনে হলো ঘোড়া নিয়ে পানির কিনারে এগিয়ে যাই। কিন্তু তার পরেই নিজেকে সামলে নিলাম, কারণ জানি যে এই কাজ করলে আমার ঘোড়ার পায়ের ছাপে দুবৃত্তদের চিহ্ন নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
ঘোড়া থেকে নেমে পড়লাম আমি, লাগাম ধরে একটা গাছের মোটা ডালের সাথে বেঁধে রাখলাম। তারপর বালির ওপর তৈরি হওয়া ছাপগুলোকে অনুসরণ করতে শুরু করলাম, যেন নষ্ট না হয়ে যায় সে জন্য নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখছি। কিছু দূর যাওয়ার পরেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা জিনিস ধরা পড়ল আমার চোখে। অনেকগুলো পায়ের ছাপ বিক্ষিপ্তভাবে তৈরি হয়েছে বালির ওপর কিন্তু তার মাঝেও একটা ছাপ স্পষ্ট চেনা যাচ্ছে। পা টেনে টেনে হেঁটেছে এই ছাপের মালিক। ছাপগুলো চিনতে একটুও বেগ পেতে হলো না আমাকে।
*
এর আগে আমার ধারণা হয়েছিল যে আততায়ীরা নিশ্চয়ই কোনো জলদস্যুর দল হবে, হুট করেই যারা সেরেনা আর তার সঙ্গীদের খোঁজ পেয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এখন আমি বুঝতে পারলাম ঘটনা মোটেও সে রকম কিছু নয়। তবে সেই মুহূর্তে আমার মনোযোগ ছিন্ন হয়ে গেল ঘোড়ার পায়ের শব্দ আর আমার নাম ধরে চিৎকার করে ডাকতে থাকা কিছু কণ্ঠস্বরের আওয়াজে। জঙ্গলের দিক থেকে আসছে শব্দগুলো। রামেসিস আর হুরোতাসের গলা চেনা গেল তাদের মাঝে। এই যে এখানে! চিৎকার করে ওদের ডাক দিলাম আমি।
জঙ্গলের মাঝ থেকে খোলা জায়গায় বেরিয়ে এলো সবাই।
আমাকে দেখার সাথে সাথে সামনে এগিয়ে এলো, যেখানে দাঁড়িয়ে আছি আমি। একের পর এক প্রশ্ন বর্ষিত হচ্ছে আমাকে লক্ষ্য করে।
সেরেনা! পেয়েছ ওকে?
এখানে আছে ও?
না! জবাব দিলাম আমি। এখানে নেই ও। কিন্তু আমার ধারণা আমি জানি যে ও কোথায়।
করুণাময় আর্টেমিস সাক্ষী! ককিয়ে উঠল রামেসিস। ওই শয়তানগুলো যারাই হোক না কেন পালমিস এবং আমাদের অন্য সব লোককে খুন করে রেখে গেছে। ছেলের মৃতদেহের কাছে হুইকে রেখে এসেছি আমরা। একেবারেই ভেঙে পড়েছে সে। তোমার কাছে মিনতি করছি, আমায় দয়া করে এটা নিশ্চিত করো যে আমার সেরেনার সাথেও এমন কিছু ঘটেনি।
রামেসিসের বাম পাশে ঘোড়ার পিঠে বসে আছে হুরোতাস। প্রচণ্ড রাগে থরথর করে কাঁপছে সে, মুখ দিয়ে একের পর এক অশ্রাব্য গালিগালাজ আর শপথের বন্যা ছুটছে। এই অমানুষিক কাজ যারাই করে থাকুক না কেন আমি তাদের খুঁজে বের করব। তাতে যদি আমার বাকি জীবন লেগে যায় তো লাগুক! বলে উঠল সে। একবার যদি ধরতে পারি তাহলে এমন শাস্তি দেব, যা দেখে দেবতাদেরও বুক কেঁপে উঠবে।
