একটু পরেই রামেসিস একা একা ফিরে এলো দুর্গে। আমাদের সাথে যুদ্ধের প্রস্তুতি বিষয়ক আলোচনায় যোগ দিতে এলো সে।
তাকে দেখার সাথে সাথে আমি প্রথম যে প্রশ্নটা করলাম সেটা হচ্ছে, রাজকুমারী সেরেনা কোথায়?
উত্তরের সৈকতে রেখে এসেছি ওকে, নীল খালের কাছে।
জায়গাটা খুব ভালো করেই চিনি আমি। নিশ্চয়ই একা রেখে আসোনি ওকে?
একাই বলতে পারো, হতাশ ভঙ্গিতে আমার দিকে তাকাল রামেসিস। সাথে আছে কেবল ওর দুই পরিচারিকা আর আমার লোকদের মাঝে সবচেয়ে দক্ষ আটজন। আশা করি আগামী কয়েক ঘণ্টার জন্য ও নিরাপদই থাকবে। আমার মনে হয়েছিল যুদ্ধে আমার জাহাজ এবং লোকদের কাজ এবং অবস্থান সম্পর্কে তোমার সাথে আলোচনায় বসা উচিত আমার। তা ছাড়া তোমার এটাও মনে রাখা উচিত যে, সেরেনা এখন আর শিশু নয়। নিজের দিকে খুব ভালোভাবেই খেয়াল রাখতে পারে ও। আমাকে বলেছে দুপুরের চার ঘণ্টা পরেই ফিরে আসবে এখানে।
রামেসিস ঠিকই বলেছে, ওদিকে হুরোতাসও আমাদের আলোচনায় যোগ দিল। সেরেনার নিরাপত্তার জন্য যথেষ্ট ব্যবস্থা করা হয়েছে।
এই পর্যায়ে এসে হুইও তার লম্বা নাকটা আমাদের আলোচনার মাঝে গলিয়ে দেওয়া একান্ত কর্তব্য বলে বোধ করল। তা ছাড়া ওর দেহরক্ষীদের মাঝে আমার ছোট ছেলে পালমিসও রয়েছে। ছোট হলে কী হবে, সাহসে আর শক্তিতে মোটেই কম যায় না, বড়াই করল সে।
অনুভব করলাম আবার সেই অস্বস্তিটা ফিরে আসছে আমার মাঝে। কিন্তু বাকিরা ব্যাপারটাকে পাত্তা না দিয়ে নিজেদের আলোচনায় ব্যস্ত হয়ে পড়ল আবার। আমি যখন একটু আলাদা হয়ে থাকতে চাইলাম তখন আমাকে খোঁচানো শুরু করল, বলল যোগ দিতে। সবাইকে অগ্রাহ্য করা বেশ কঠিন হয়ে দাঁড়াল। একসময় নিজের অজান্তেই ওদের কথায় আগ্রহী হয়ে উঠলাম আমি, আলোচনায় যোগ দিলাম। এবং পুরো ব্যাপারটা এমন জটিল যে, কথায় কথায় কতটা সময় পার হয়ে গেল তার কোনো হিসাবই থাকল না মাথার ভেতর।
একসময় দুই দাসী ঢুকল মশাল নিয়ে, তেলের প্রদীপগুলো এক এক করে জ্বালিয়ে দিতে শুরু করল। এই দেখে বেশ অবাক হয়ে গেলাম আমি। জানালা দিয়ে বাইরে তাকাতে দেখলাম অসাধারণ এক রূপ নিয়েছে ট্যাগেটাস পর্বতমালা। পাহাড়ের আঁকাবাঁকা শিখরের ওপাশে অস্ত যাচ্ছে জ্বলন্ত সূর্য।
জিউসের কসম! অবাক হয়ে বলে উঠলাম আমি, লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছি একই সঙ্গে। এখন বাজে কয়টা?
দ্রুত উঠে দাঁড়িয়ে টেবিলের অন্য পাশে রাখা পানিঘড়ির দিকে এগিয়ে গেল হুই। সেটার ওপর আঙুল দিয়ে একটা টোকা দিল সে। এই ঘড়িটায় নিশ্চয়ই কোনো সমস্যা আছে। পানি খুব বেশি তাড়াতাড়ি পড়ে যাচ্ছে। এতে বলছে দুপুরের পরেও আরো আট ঘণ্টা পার হয়ে গেছে। এতটা নিশ্চয়ই হতে পারে না?
জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখো। সূর্যের কখনো ভুল হয় না, বললাম আমি। তারপর ফিরলাম রামেসিসের দিকে। সেরেনা আর বাকিদের ফেরার কথা ছিল কখন?
তীব্র অপরাধবোধ ফুটে উঠল রামেসিসের চেহারায়। উঠে দাঁড়াল সেও। বলল আমি নিশ্চিত যে ওরা ইতোমধ্যে দুর্গে ফিরে এসেছে। কয়েক ঘণ্টা আগেই ওদের ফেরার কথা। হয়তো আমাদের বিরক্ত করতে চায়নি সেরেনা। হুরোতাস সবাইকে পইপই করে বলে দিয়েছে…
আর শুনতে ইচ্ছে করল না আমার। ঘুরে দাঁড়িয়েই দৌড় দিলাম আমি। কামরার দরজা দিয়ে বেরিয়ে এসেছি এই সময় পেছন থেকে হুরোতাস ডাক দিল আমাকে। ফিরে এসো টাইটা। যাচ্ছ কোথায়?
প্রধান ফটকে। প্রহরীরা বলতে পারবে যে সেরেনা এখনো ফিরেছে কি না, ঘাড় ঘুরিয়ে চিৎকার করে জবাব দিলাম আমি। নিজের কণ্ঠস্বর শুনে নিজেই অবাক হয়ে গেলাম। ভয়ে তীক্ষ্ণ হয়ে উঠেছে আমার গলা, কানে আঘাত করছে। এত অস্থির হচ্ছি কেন আমি জানি না; কিন্তু হঠাৎ করেই যেন সারা দিনের যত অস্বস্তি ছিল সব শকুনের পাখায় ভর করে চক্কর দিতে শুরু করেছে আমার মাথার ওপর। বিপদের তীব্র গন্ধ এসে লাগছে আমার নাকে। শিকারি কুকুরের তাড়া খাওয়া হরিণের মতো দৌড়াচ্ছি আমি। পেছনে শুনতে পাচ্ছি জুতোর আওয়াজ বাকিরাও দৌড়ে আসছে আমার সাথে সাথে। দুর্গের প্রাঙ্গণে বের হয়ে এলাম আমি, এক শ কদম দূরে থাকতেই প্রহরীদের উদ্দেশ্য করে চিৎকার করতে শুরু করলাম। রাজকুমারী সেরেনা কি দুর্গে ফিরেছে? কয়েকবার প্রশ্নটা জিজ্ঞেস করার পর আমার কথা বুঝতে পারল ওরা।
এখনো না প্রভু টাইটা, প্রধান প্রহরী জবাব দিল আমার কথার। আমরা অপেক্ষা করে আছি…
লোকটার কথা আর একটুও শুনতে ইচ্ছা করল না আমার। তার পাশ কাটিয়ে এলাম আমি দৌড়াতে দৌড়াতেই চলে এলাম আস্তাবলের দিকে। হঠাৎ করে মনে পড়ল যে তলোয়ারটা সেই মন্ত্রণাকক্ষের দেয়ালেই ঝুলিয়ে রেখে এসেছি। কিন্তু এখন আর ওটা আনতে ফিরে যাওয়ার সময় নেই। এখন আমি প্রায় নিশ্চিত, ভয়ানক কিছু একটা ঘটেছে সেরেনার ভাগ্যে। এই মুহূর্তে আমাকে দরকার ওর।
প্রিয় ঘোড়াটার মুখে লাগাম পরিয়ে দিলাম আমি। সুন্দর বাদামি রঙের একটা মাদি ঘোড়া, তেহুতি উপহার দিয়েছে আমাকে। তারপর ঘোড়ায় জিন পরানোর জন্য সময় নষ্ট না করে সরাসরি পিঠে উঠে বসলাম, দুই পায়ের গোড়ালি দিয়ে খোঁচা মারলাম প্রাণীটার পাঁজরে।
চল, চল! তাড়া দিলাম আমি। আস্তাবলের দরজা দিয়ে প্রায় উড়ে বেরিয়ে এলাম আমরা, পাহাড় থেকে নেমে আসা পথটার মাঝখান দিয়ে যেই রাস্তাটা সৈকতের দিকে এগিয়ে গেছে সেটা ধরে এগিয়ে চললাম। পেছনে তাকালাম একবার। দেখলাম রামেসিস, হুরোতাস আর হুইয়ের নেতৃত্বে বাকি সবাই এখনো অনেক পেছনে। আমাকে ধরার জন্য প্রাণপণে ঘোড়া ছোটাচ্ছে সবাই। সৈকতের পাশে নীল খালের সামনে আমি যখন পৌঁছলাম তখন দিনের আলো মুছে আসতে শুরু করেছে। তখনো পাগলের মতো ঘোড়াটাকে ছুটিয়ে নিয়ে চলেছি আমি, এই সময় হঠাৎ প্রাণীটা রাস্তা ছেড়ে এমনভাবে লাফিয়ে উঠল যে একটু অনভিজ্ঞ কেউ হলে ঘোড়ার পিঠ থেকে উড়ে দূরে গিয়ে পড়ত। তবে আমি কোনোমতে দুই হাঁটু দিয়ে চেপে ধরলাম ঘোড়াটাকে, তারপর কোনোমতে শান্ত করে একপাশে থামালাম। এবার সেই জিনিসটাকে দেখার ফুরসত মিলল, যেটা ঘোড়াটাকে ভয় দেখিয়েছে। এবং তাকানোর সাথে সাথে বুঝতে পারলাম জিনিসটা আর কিছু নয়, একটা মানুষের মৃতদেহ। ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে পড়লাম আমি, তারপর লাগাম ধরে এগিয়ে এলাম লাশটার দিকে। রক্তে ভিজে আছে মৃতদেহটা। এক হাঁটুতে ভর দিয়ে বসলাম আমি, উল্টে দিলাম সেটাকে। এবং চিনতে পারলাম সাথে সাথেই।
