আরো একটা জিনিস লক্ষ্য করে স্বস্তি পেলাম। সেটা হলো, বেকাথা এবং তেহুতি তাদের স্বামী এবং কন্যাদের পুরো সময়টা নিজেদের ঈগল চোখের আওতায় রেখেছে। তবে নিজের চার ছেলের ব্যাপারে বেশ ঢিল দিয়েছে বেকাথা। তাদের মাঝে সবচেয়ে ছোট যে জন তার সাথে সেরেনার কিছু টুকরো টুকরো কথা ঘটনাচক্রে আমার কানে চলে এলো। তখন সবে মাত্র বাইরের ছোট ঘরগুলোর একটা থেকে ফিরেছে সে।
কোথায় গিয়েছিলে পালমিস? কী করছিলে তুমি? জানতে চাইল সেরেনা। আমি তো তোমার সাথে এক দফা নাচতে চেয়েছিলাম।
আর্টেমিসের উদ্দেশ্যে একটু পুজো করতে গিয়েছিলাম, সরাসরি জবাব দিল ছেলেটা।
তাই নাকি? আমি তো ভেবেছিলাম অ্যাপোলো ছাড়া আর কারো পুজো করো না তুমি।
মাঝে মাঝে রথের প্রতিযোগিতায় একই সাথে দুটো রথেও বাজি ধরতে হয়, বুঝলে?
তা ওই পুজোটা কীভাবে করতে হয় আমাকে একটু দেখাবে? দুষ্টুমির ছলে প্রশ্ন করল সেরেনা।
একবার দেখাতে চেয়েছিলাম, মনে আছে? কিন্তু তুমি তখন রাজি হওনি বোকা মেয়ে। এখন তোমার সামনে অপেক্ষা করা ছাড়া কোনো উপায় নেই, অন্তত যত দিন না রামেসিস তোমাকে শিখিয়ে দেয়।
এক মুহূর্তে পালমিসের দিকে তাকিয়ে রইল সেরেনা, কথাগুলো ভেবে দেখছে। তার পরেই বুঝতে পারল, মনে হলো যেন দ্বিগুণ আকার ধারণ করল সবুজ চোখগুলো। তাদের গাঢ়তাও যেন বেড়ে গেল একই পরিমাণে। কী পরিমাণে দুষ্টু হয়ে উঠেছ তুমি পালমিস! বলে উঠল ও। ছোটবেলাতেও দুষ্ট ছিলে আর এখন বুড়ো হতে চললে; কিন্তু তোমার দুষ্টুমির কমতি নেই! বলেই চটাস করে ছেলেটার কানের নিচে একটা চাটি মারল ও। ব্যাপারটা এমন আচমকা ঘটে গেল আর এত জোরে যে যুগপৎ ব্যথা আর বিস্ময়ে চেঁচিয়ে উঠল পালমিস।
তবে সেদিন সন্ধ্যায় কিছু আনন্দের ব্যাপারও ঘটল। প্রধান পূজারিনি হ্যাগনের সাথে কোথায় যেন উধাও হয়ে গিয়েছিল রাজা বেন আর্গোলিদ, স্বাভাবিক সময়ের অনেক পরে আবার সবার সামনে উদয় হলো সে। চেহারায় বিশ্বজয়ের আনন্দ, চোখে পরিতৃপ্তির উজ্জ্বলতা। সরাসরি রাজা হুরোতাসের কাছে চলে এলো সে, জানাল যে হ্যাগনেকে সে বিয়ে করতে চায়। জানা গেল একটু আগেই সোনালি ধনুক ভগিনীসংঘের প্রধান পদ থেকে নিজের নাম প্রত্যাহার করে নিয়েছে হ্যাগনে।
আচ্ছা তুমি যে এর আগে আমাকে বললে, মিনোয়ান রোডসে অর্থাৎ তোমার নিজের দ্বীপদেশে ইতোমধ্যে দশজন সুন্দরী স্ত্রী তোমার অপেক্ষা করছে? দাঁত বের করে হেসে প্রশ্ন করল হুরোতাস।
প্রিয় হুরোতাস, ওদের সংখ্যাটা আসলে তেরোজন। কিন্তু তুমি নিশ্চয়ই জানো সংখ্যাতত্ত্বের অভিধানে এটা হচ্ছে সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক একটা সংখ্যা। অথচ চৌদ্দকে বলা যায় দ্বিগুণ সৌভাগ্যের প্রতীক।
সেই বিকেলেই তাদের দুজনের বিয়ে দিয়ে দিল হুরোতাস। ফলে আরো একবার আনন্দ উৎসবের আয়োজন করার অজুহাত পেয়ে গেল সবাই। যদিও পরের দিন থেকে হিসাব করলে সেরেনা আর রামেসিসের বিয়ের আর তেরো দিন বাকি থাকে; কিন্তু তখন এ ব্যাপারে কোনো চিন্তাই আসেনি আমার মাথায়।
*
পরদিন সকালে আমার ঘুম ভাঙল প্রচণ্ড মাথাব্যথা এবং অদ্ভুত একটা অস্বস্তি নিয়ে। বিছানায় শুয়ে শুয়ে গতকালের চাইতে আজকে আমার মেজাজ এমন বদলে গেল কীভাবে তাই বোঝার চেষ্টা করতে লাগলাম। এক চাকরকে পাঠালাম দেখে আসতে যে গতকাল যাদের বিয়ে হলো সেই রাজা বের আর্গোলিদ আর পূজারিনি মাতা হ্যাগনে কেমন আছে দেখে আসতে। কিন্তু সে ফিরে এসে জানাল তারা দুজন এখনো তাদের শোবার ঘর থেকে বের হয়নি। তবে ভেতর থেকে নানা রকম আনন্দসূচক শব্দ ভেসে আসছে, সেইসাথে মনে হচ্ছে ভারী আসবাব এদিক-ওদিক সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে কেউ অথবা ভেঙে ফেলার চেষ্টা করছে। ফলে বোঝা যায় যে তারা আর যা-ই করুক, ঘুমোচ্ছে না। সেইসাথে রাজকুমারী সেরেনাসহ অন্য সকল নারী ও শিশু ভালো আছে এবং কারো ভাগ্যে কোনো দুরারোগ্য অসুখ বা অন্য কোনো বিপদ দেখা দেয়নি। সত্যি কথা বলতে আমি যখন চাকরের কাছ থেকে এসব কথাগুলো শুনছি ঠিক তখনই আমার জানালার নিচের উঠান থেকে উচ্ছ্বসিত হাসি আর হইচইয়ের শব্দ ভেসে এলো। জানালার কাছে এগিয়ে গিয়ে নিচে তাকালাম আমি।
দেখলাম রামেসিস এবং রাজকুমারী সেরেনা তাদের প্রিয় দুটো ঘোড়ায় বসে আছে। দারুণ স্বস্তি লাগল ওদের দেখে। সাথে আরো রয়েছে সেরেনার ব্যক্তিগত দুই পরিচারিকা এবং রামেসিসের এক দল সশস্ত্র প্রহরী। দুর্গের সদর দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে ওদের দলটা, নিশ্চয়ই বনভোজন বা এমন কোনো অবসর বিনোদনে যাচ্ছে। মৃদু হাসলাম আমি। এখন মনে হচ্ছে ওই অস্বস্তির কারণ আর কিছু নয়, স্রেফ গতকাল সন্ধ্যায় হুরোতাস আমার ইচ্ছের বিরুদ্ধে যে দুই তিন পেয়ালা মদ অতিরিক্ত খেতে বাধ্য করেছিল তার ফলাফল।
দুর্গ থেকে বের হয়ে নদীর কাছে চলে এলাম আমি, নগ্ন হয়ে বেশ কিছুক্ষণ সাঁতার কাটলাম কনকনে ঠাণ্ডা পানিতে। মদের নেশা কেটে যাওয়ার পরবর্তী অস্বস্তি কাটানোর জন্য এর চাইতে ভালো মহৌষধ আর নেই। মাথা এবং মন পরিষ্কার হয়ে আসতে দুর্গে ফিরে এলাম, আবার হুরোতাস আর হুইয়ের সাথে যোগ দিলাম মন্ত্রণাকক্ষে। ষোলো রাজার মাঝে আজ আমাদের সাথে উপস্থিত রইল বারোজন। বাকি চারজন তাদের পক্ষ থেকে দুঃখ প্রকাশ করেছে, বলেছে আজ একটু অসুস্থ থাকায় তাদের পক্ষে আলোচনায় যোগ দেওয়া সম্ভব নয়।
