পূজারিনি মা! প্রধান পূজারিনির সামনে এসে হাঁটু ভাজ করে সম্মান দেখাল সে। আমার বাবার দুর্গে আপনাকে স্বাগতম।
প্রিয় রাজকুমারী, তোমার জন্য দেবী আর্টেমিসের কাছ থেকে শুভেচ্ছা এবং একটি সংবাদ নিয়ে এসেছি আমি। তুমি কি তা গ্রহণ করতে প্রস্তুত? যদি তাই হয় তাহলে আমার সামনে হাঁটু গেড়ে বসো, জবাব দিল ভগিনী হ্যাগনে। সোনালি ধনুক ভগিনীসংঘের প্রধান পূজারিনি মাতা সে। সোনালি ধনুক হচ্ছে দেবী আর্টেমিসের অনেকগুলো প্রতাঁকের একটা।
এবার রাজা হুরোতাস সামনে এগিয়ে আসতে শুরু করল, চেহারা গম্ভীর হয়ে আছে। চোখগুলো জ্বলছে রাগে। ওসব সংবাদের নিকুচি করি আমি… বলতে শুরু করল সে। কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে তখন আমি তার কাছেই দাঁড়িয়ে ছিলাম। খপ করে তার নগ্ন বাহুটা চেপে ধরলাম। একটু আগের পাঞ্জা লড়াইয়ের কারণে এখনো ঘামে ভিজে জবজবে হয়ে আছে সেটা।
নিজেকে সামলাও, জারাস, ফিসফিস করে বললাম আমি, যাতে সে ছাড়া আর কেউ কথাটা শুনতে না পায়। তার আগের নামটা ব্যবহার করার মাধ্যমে তার ওপর আমার অনেক আগের সেই কর্তৃত্বটা আবার বিস্তার করতে চাইলাম। সাথে সাথেই নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনল সে, সরে এলো এক পাশে। সেই মুহূর্তে বিরাজমান কড়া ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের কারণে আমাদের দুজনের এই সামান্য নাটকটুকু কারো চোখে পড়ল না।
বাধ্যগত মেয়ের মতো হ্যাগনের সামনে বসে পড়ল সেরেনা। এবার ওর কপালে তর্জনীর সাহায্যে সোনালি ধনুকের চিহ্ন আঁকল পূজারিনি। তারপর এমন গম্ভীর আর ভারী গলায় কথা বলতে শুরু করল যে, এমনকি আমারও গায়ের লোম সব দাঁড়িয়ে গেল সড়সড় করে। দেবী আর্টেমিস তোমাকে তার রক্ত এবং মাংসের বোন হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন…
স্বামীর হাত চেপে ধরে দাঁড়িয়ে থাকা তেহুতির দিকে একবার না তাকিয়ে পারলাম না আমি। আমার মতোই সে নিজেও রাগ চেপে রাখার যথাসম্ভব চেষ্টা করছে। আমি তার দিকে তাকানোর সাথে সাথে সেও তাকাল আমার দিকে, দৃষ্টি বিনিময় হলো আমাদের মাঝে। তার পরেই তার চেহারা লাল হয়ে উঠল, নামিয়ে নিল চোখ। আমাদের দুজনেরই মনে পড়ে গেছে সেই অদ্ভুত প্রায় বাস্তব স্বপ্নের কথা, একমাত্র সন্তানের জন্মের গল্প বলতে গিয়ে যার কাহিনি আমাকে শুনিয়েছিল তেহুতি। তার পরেই আবার প্রধান পূজারিনির দিকে তাকালাম আমি। উপস্থিত আর সবার মতোই আমিও অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি সে কী বলে তা শোনার জন্য।
সমগ্র নারী জাতির সম্মান এবং অবস্থানকে আরো উঁচুতে নিয়ে যাওয়ার জন্য আজ তুমি যে কাজ করেছ তার আন্তরিক প্রশংসা করেছেন দেবী আর্টেমিস। তুমি প্রমাণ করেছ যে পুরুষরা আমাদের দাবিয়ে রাখতে চাইলেও আমরা আসলে তাদের চাইতে কোনো অংশে কম যাই না। দেখলাম এই কথা শোনার সাথে সাথে প্রতিবাদ করার জন্য মুখ খুলল হুরোতাস। তবে ওর মুখ থেকে যেন কোনো ধর্মদ্রোহী কথা বের না হয় সে জন্য কিছু বলার আগেই দড়াম করে ওর পায়ে লাথি মারল তেহুতি। নিশ্চয়ই খুব জোরে লেগেছিল আঘাতটা, কারণ এমনকি আমি নিজেও ওটার শব্দ শুনতে পেলাম। আর ব্যথায় ককিয়ে উঠল হুরোতাস।
আরে! আমাকে জন্মের জন্য খোঁড়া বানানোর মতলব করেছ নাকি?
কিন্তু একই সাথে আমি নিজেও চেঁচিয়ে উঠলাম, আর হুরোতাসের তুলনায় আমিই ছিলাম পূজারিনির অপেক্ষাকৃত কাছাকাছি। ফলে আমার কণ্ঠস্বরের আওয়াজে ঢাকা পড়ে গেল হুরোতাসের গলা। আমাদের রাজার জীবন বাঁচিয়েছে এই মেয়ে!
বলে উঠলাম আমি। বাকি ষোলো রাজাও সাথে সাথে যোগ দিল আমার সাথে। আমাদের রাজার জীবন বাঁচিয়েছে রাজকুমারী সেরেনা! তার জয় হোক!
প্রশংসা শুনে দারুণ খুশি হলো প্রধান পূজারিনি। যদিও তার নাম হ্যাগনে, যার অর্থ হচ্ছে বিশুদ্ধ; সন্দেহ নেই যে নামটা তার সাথে একেবারেই খাপ খায় না। কাজল দিয়ে চোখের চারপাশে কালো করে রাখলেও যখন প্রথমবারের মতো রাজা বের আর্গোলিদের ওপর পড়ল তার দৃষ্টি তখন তার চোখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠার ব্যাপারটা আমার নজর এড়াল না।
*
দেবী আর্টেমিস একজন চিরকুমারী; কোনো পশু, মানুষ অথবা দেবতার অনুমতি নেই তার সতীত্বের ওপর আক্রমণ করার। তিনি এবং তার শরীর উভয়ই চিরপবিত্র। কোনো পুরুষ যদি তার সাথে দৈহিক মিলনে রত হওয়ার চেষ্টা করে তাহলে তিনি চরম প্রতিশোধ নেন। তবে আর্টেমিসের পূজারিনিদের অন্যতম প্রধান একটি দায়িত্ব হচ্ছে তাদের প্রিয় দেবীর প্রতিভূ বা বিকল্প হিসেবে কাজ করা। দেবীর অনুমতিক্রমে তারা পৃথিবীর যেকোনো প্রাণীর সাথে যৌন মিলনে লিপ্ত হতে পারে, তা সে পুরুষ, মহিলা, মানুষ, পশুপাখি, মাছ বা অন্য যা কিছু হোক না কেন। এ থেকে তারা যে দৈহিক আনন্দ পায় তা সরাসরি পৌঁছে যায় আর্টেমিসের কাছে। কিন্তু দেবী আর্টেমিসের প্রতিভূরা যতই বিকৃত মিলনে লিপ্ত হোক না কেন, তিনি নিজে চিরকাল পবিত্রই রয়ে যান। এবং বলতে দ্বিধা নেই, এ ব্যবস্থাটা বরাবরই আমাকে বেশ আশ্চর্য করে তুলেছে। এমনকি আমার মতো দৈহিক আনন্দ থেকে বঞ্চিত মানুষও এমন ব্যবস্থায় নিজের সামনে অনেকগুলো পথ খুঁজে পেতে পারে।
প্রধান পূজারিনিকে অনুসরণ করে বাকি পঞ্চাশ পূজারিনির সবাই দুর্গের প্রধান। কক্ষে এসে পৌঁছাল। এমনিতে তাদের সবাইকে ভদ্র শান্তই মনে হছে; কিন্তু ভেতরে ভেতরে এমন কিছু একটা রয়েছে, যা আমাকে নীলনদের পানিতে রক্তের গন্ধ পাওয়া রাক্ষুসে মাছের দলের কথা মনে করিয়ে দিল। ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই দেখা গেল একটু আগের সেই ভদ্রতা এবং একই সঙ্গে পরনের কাপড়চোপড়ের সিংহ ভাগ; উভয়ই বিসর্জন দিয়েছে তারা। নাচের মুদ্রাগুলো দেখলে যে কারো কাছে মনে হতে পারে তা যৌন মিলনের অপর নাম। তবে এটা আমি স্বীকার করছি যে, একেবারে শেষ মুহূর্তে হলেও পাশের ছোট ঘরগুলোতে সবার চোখের আড়ালে চলে যাওয়ার মতো ভদ্রতা লক্ষ্য করেছি জুটিদের মাঝে।
