উপস্থিত সমস্ত রাজা, গোত্রপ্রধান এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের উদ্দেশ্য করে হুরোতাস জানাল, তাদের সবাইকে সে আপন ভাইয়ের মতো দেখে। সে জানে, আজ পারস্পরিক সমঝোতা এবং সম্মানের ভিত্তিতেই সবাই একত্র হয়েছে। এই কথার জবাবে আগের চাইতেও জোরাল গলায় হর্ষধ্বনি উঠল উপস্থিত দর্শকের মাঝে। উল্লসিত চিৎকারের শব্দ ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে আসতে এবার রাজা বের আর্গোলিদ উঠে দাঁড়াল। হুরোতাসের আড়ম্বরপূর্ণ বক্তৃতার কাছে কিছুতেই হার মানতে রাজি নয় সে, নিজের কথায় সবাইকে তাক লাগিয়ে দেবে বলে ঠিক করেছে।
এই মুহূর্ত থেকে আমাদের একজনের প্রতি অপমানের অর্থ হবে আমাদের সবার অপমান, চেঁচিয়ে উঠল সে। এসো সবাই হাতে হাত রেখে পারস্পরিক প্রতিরক্ষার শপথ নিই!
কে সাক্ষী হবে আমাদের শপথের? জানতে চাইল হুরোতাস।
পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরী নারী আমাদের মাঝে উপস্থিত থাকতে আর কারো দরকার আছে কি? জবাব দিল বের আর্গোলিদ। পৃথিবীর সবচেয়ে সাহসী নারী, যে ল্যাকোনিয়ান শূকরকে বধ করেছে; সেই সাক্ষী হবে আমাদের শপথের।
সুতরাং এক এক করে ষোলোজন রাজার সবাই সামনে এগিয়ে এলো, তারপর রাজকুমারী সেরেনার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে শপথ নিল। এরপর শুরু হলো উৎসব এবং উদ্যাপন চলল অনেক রাত পর্যন্ত। কারো কারো কাছে মনে হতে পারে যে সারা দিনের পরিশ্রমের পর সবার এখন ক্লান্ত হয়ে পড়ার কথা। কিন্তু না, এটা ছিল কেবল শুরু। নাচ-গান, মদপান আর আনন্দ কেবল শুরু হয়েছে। আর সবার মাঝে সেরেনার উৎসাহই যেন সবচেয়ে বেশি। সকল রাজার সাথে পালা করে নাচল ও, সেইসাথে ওর বাবা এবং রামেসিসের সাথেও, যে এখনো রাজা হয়নি। এমনকি আমার সাথেও একাধিকবার নাচতে এলো সেরেনা, এবং নাচ শেষে জানাল যে, যাদের সাথে এ পর্যন্ত নেচেছে তাদের মাঝে আমিই সবচেয়ে ভালো নাচতে পারি, শুধু রামেসিস বাদে। কিন্তু রামেসিসের সাথে যেহেতু ওর বাগদান হয়েছে, সেহেতু এই কথা তো ওকে বলতেই হবে, তাই না?
হুরোতাস যখন এক দফা পাঞ্জা লড়াইয়ের জন্য বীরবাহু বের আর্গোলিদকে আহ্বান জানাল তখন দেরি না করে নাচের মঞ্চ থেকে নেমে এলো সবাই, লড়াইয়ের ফলাফলের ওপর বাজি ধরতে শুরু করল। প্রচুর পরিমাণে অর্থ বাজি ধরা হলো এক একজনের পক্ষে। একই পরিমাণে উত্তেজনা নিয়ে সবাই তারস্বরে চিৎকার করে নিজ নিজ খেলোয়াড়কে উৎসাহ দিতে লাগল। এক টুকরো নেংটি বাদে সব কাপড় খুলে ফেলল দুই প্রতিযোগী, তারপর ভোজসভার জন্য রাখা ওক কাঠের টেবিলটার দুই পাশে বসে পড়ল। কয়েক মুহূর্তের মাঝেই নানা রকম কর্কশ আওয়াজ বেরিয়ে আসতে লাগল দুজনের গলা দিয়ে, মনে হলো যেন পাঞ্জা লড়ছে না বরং পরস্পরের কাঁধ থেকে হাতটা খুলে আনতে চাইছে।
দুই প্রতিযোগী এবং তাদের সমর্থকদের হইহল্লা ভেদ করে অন্য কিছু শুনতে পাবে এমন তীক্ষ্ণ কান আমি বাদে আর কারো আছে বলে মনে হয় না। কিন্তু ধীরে ধীরে আমি বুঝতে পারলাম, দুর্গ-প্রাচীরের ওপাশ থেকে খুব আস্তে আস্তে ভেসে আসছে মিষ্টি সুরেলা গলার গান।
প্রতিযোগিতার জায়গা থেকে সরে এলাম আমি, তারপর বাইরের দুর্গ-প্রাচীরের ওপর উঠে পড়লাম। ওপাশে উঁকি দিয়ে দেখলাম, পঞ্চাশেরও বেশি মহিলা সারি বেঁধে এগিয়ে আসছে সেখানে। সবার পরনে গোড়ালি পর্যন্ত লম্বা সাদা পোশাক। মুখেও একই রকম সাদা রং করা, কেবল চোখের চারপাশে কাজল দিয়ে কালো রং করা হয়েছে। এই মুহূর্তে দুর্গের প্রধান ফটকের সামনের সিঁড়ি বেয়ে উঠছে তারা। প্রত্যেকের হাতে একটা করে জ্বলন্ত বাতি, মুখে দেবী আর্টেমিসের প্রশস্তি গান। তাদের চেহারা এবং পোশাক দেখে এক মুহূর্তেই বুঝে নিলাম এরা হচ্ছে দেবীর পূজারিনি। এবং এটাও বুঝতে পারলাম যে, হুরোতাস আর তার সঙ্গীরা দারুণ খেপে যাবে যদি তাদের উৎসবের মাঝখানে আর্টেমিসের পূজারিরা এসে তাদের প্রিয় শূকরের মৃত্যু নিয়ে শোক করতে শুরু করে। তাই দ্রুত নিচে নেমে এলাম আমি, ইচ্ছে যে প্রধান ফটকে দাঁড়ানো প্রহরীদের সাবধান করে দেব যেন ওদের ঢুকতে না দেয়। কিন্তু এসে দেখলাম ইতোমধ্যে অনেক দেরি করে ফেলেছি। পূজারিনিদের চিনতে পেরেছে প্রহরীরা এবং তাদের স্বাগত জানিয়ে খুলে দিয়েছে দরজা।
দরজা থেকে দুর্গের ভেতর পর্যন্ত পথটা ইচ্ছে করেই অত্যন্ত সরু করে বানানো হয়েছে, যাতে সম্ভাব্য শত্রুকে বাধা দিতে সুবিধা হয়। এখন সেই পথে ভিড় করে রয়েছে আর্টেমিসের পঞ্চাশজন পূজারিনি, সেইসাথে তার প্রায় দ্বিগুণ সংখ্যক সশস্ত্র প্রহরী। তাদের অগ্রযাত্রার মুখে পড়ে পিছিয়ে আসতে বাধ্য হলাম আমি, আরো একবার সেই প্রাঙ্গণে এসে দাঁড়ালাম। এখানে হুরোতাস আর তার বন্ধুরা অর্থাৎ সেই করদ রাজাদের মাঝে এসে পড়তে হলো আমাকে, যাদের নেতৃত্ব দিচ্ছে বেন আর্গোলিদ। সবাই চেঁচাচ্ছে এবং তাদের সাথে সাথে আমিও। কিন্তু কেউই কারো কথা শুনছে না।
তারপর হঠাৎ করে অপেক্ষাকৃত পরিষ্কার সুরেলা একটা গলা ভেসে এলো হইচই ছাপিয়ে। গলাটা এত সুন্দর যে প্রায় সাথে সাথেই নীরব হয়ে গেল সবাই। প্রত্যেকটা মাথা ঘুরে গেল শব্দের উৎস লক্ষ্য করে। ভিড়ের মাঝ বরাবর ফাঁকা হয়ে গেল, একটা পথ তৈরি করে দিল সবাই। সেই পথ দিয়ে এগিয়ে আসতে দেখা গেল রাজকুমারী সেরেনার অনিন্দ্যসুন্দর অবয়বকে।
