দুই পা হারিয়ে দড়াম করে মাটিতে আছড়ে পড়ল শূকরটা। মাথাটা পড়ল প্রথমে, তারপর ডিগবাজি খেয়ে মাটিতে পিঠ দিয়ে উল্টে পড়ল। ভারসাম্য ফিরে পাওয়ার প্রাণান্তকর চেষ্টায় গলাটা লম্বা করে দিল কাদামাটিতে ভরা জমিনের ওপর। গলা তো নয় যেন প্রাচীন কোনো গাছের গুঁড়ি। এবার ওর সামনে এসে দাঁড়াল সেরেনা। দুই হাতে তলোয়ারের বাঁট চেপে ধরল শক্ত করে, তারপর মাথার ওপর তুলেই বাতাসে অর্ধবৃত্ত এঁকে এক টানে নামিয়ে আনল। মৃদু শিস কেটে নেমে এলো তলোয়ার, এত জোরে আঘাত করেছে সেরেনা। মনে হলো যেন শূকরের বিশাল মাথাটা এক লাফ দিয়ে আলাদা হয়ে এলো শরীর থেকে। মুখটা খুলে গেল হাঁ হয়ে, ধপ করে মাটিতে পড়ার সাথে সাথে একটা ভীতিকর শব্দ বেরিয়ে এলো- একই সাথে মরণ চিৎকার এবং তীব্র ক্রোধের গর্জন। কাটা গলা থেকে ফিনকি দিয়ে ঝরনার মতো বেরিয়ে এলো তাজা রক্ত, সেরেনার পোশাকের নিচের অংশ ভিজিয়ে দিল। বিজয়ীর ভঙ্গিতে গর্বের সাথে মাথা উঁচু করে দাঁড়াল ও।
বুনো আনন্দে চিৎকার করে উঠলাম আমি। সাথে সাথে আরো শ খানেক গলার চিৎকার যোগ দিল আমার সাথে। দৌড়ে এগিয়ে এসে দারুণ স্বস্তির সাথে ওকে জড়িয়ে ধরল রামেসিস। নিজের পায়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল তেহুতি। মচকানো কবজিটা বুকের সাথে চেপে ধরে রেখেছে; কিন্তু এবার তার ব্যথা অগ্রাহ্য করে দৌড়ে মেয়ের দিকে এগিয়ে গেল সে। অ্যাডমিরাল হুইয়ের নেতৃত্বে বিদেশি রাজা এবং সেনাপতিরা সবাই সামনে এগিয়ে এলো, সেরেনার সাহস এবং দক্ষতার প্রশংসা করছে সবাই শত মুখে। এক এক করে প্রত্যেকেই ওর সামনে হাঁটু গেড়ে বসল, তারপর প্রশংসা আর স্তুতি গাইতে গাইতে ফেনা তুলে ফেলল মুখে। অল্প কথায় সবাইকে ধন্যবাদ জানাল সেরেনা, তারপর তেহুতির কাঁধে ভর দিয়ে এগিয়ে গেল সেদিকে, যেখানে ওর বাবা রাজা হুরোতাস এখনো অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে।
তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই জ্ঞান ফিরে এলো তার, ঝাপসা চোখে এদিক-ওদিক তাকাল সে। কেবল তখনই আমার প্রিয় দুই নারী, যাদের এই পৃথিবীর সব কিছুর চাইতে বেশি ভালোবাসি আমি, একই সাথে ফিরে তাকাল আমার দিকে। ভিড় আর কোলাহলের মাথার ওপর দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে হাসল
তারা, কৃতজ্ঞতার হাসি। আর এতেই সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট বোধ করলাম আমি।
*
হুরোতাসের করদ রাজাদের মাঝে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং শক্তিশালী হচ্ছে থিবিসের বোয়েশিয়া থেকে আগত বের আর্গোলিদ। দারুণ ভারী একটা তলোয়ার ব্যবহার করার কারণে যার আরেক নাম বীরবাহু। নিজের চ্যালাদের সে নির্দেশ দিয়েছিল তার সিংহাসনটা শিকারে নিয়ে আসতে। অজুহাত দেখিয়েছিল যে কাজটা আরামের জন্যই করেছে সে; কিন্তু আসল উদ্দেশ্য হচ্ছে সবাইকে নিজের গুরুত্ব বোঝানো। তবে এখন সে শূকর শিকারে সেরেনা যে বীরত্বের পরিচয় দিয়েছে তার স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে নিজের সিংহাসনে বসাতে চায় সে। বাকি রাজারাও পিছিয়ে থাকতে চাইল না, সেরেনাকে সিংহাসনে বসিয়ে সেটা পালাক্রমে বহন করল তারা। প্রতিবারে আটজন করে সেরেনাকে সিংহাসনসহ কাঁধে তুলে নিল, তারপর তার প্রশস্তি গাইতে গাইতে ট্যাগেটাস পর্বতমালা থেকে এগিয়ে চলল দুর্গের দিকে।
এই বীরত্বপূর্ণ শিকার অভিযানের গল্প ইতোমধ্যে মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে আমার কাছে মনে হলো যেন পুরো ল্যাসিডিমনের সবাই এসে জড়ো হয়েছে পথের পাশে, চিৎকার করে উৎসাহ দিচ্ছে সেরেনাকে, সেইসাথে ফুলের পাপড়ির বৃষ্টি বইয়ে দিচ্ছে তার ওপর। ওর বাম পাশে হাঁটছি আমি, যেটা হচ্ছে সম্মানের জায়গা। স্বভাবজাত সৌজন্যবোধের কারণে এত সামনে আসতে চাইনি আমি; কিন্তু সেরেনা জোর করায় না এসে পারিনি।
এভাবে বাড়ি ফিরতে প্রায় সারা দিন লেগে গেল। সেরেনার সিংহাসন যখন দুর্গের সামনের প্রাঙ্গণে তৈরি করা মঞ্চের ওপর নামিয়ে রাখা হলো তখন সূর্য পশ্চিম দিগন্তে হেলে পড়েছে। তবে এমনকি তখনো সেরেনাকে সিংহাসনের ওপর থেকে নামতে দেওয়া হলো না।
ওর বাবা রাজা হুরোতাস ততক্ষণে শূকরের আক্রমণের ফলে আহত অবস্থা থেকে সম্পূর্ণ সেরে উঠেছে। সদা সুযোগসন্ধানী ব্যক্তি, এই সুযোগটা চিনতে ভুল হলো না তার। ষোলোজন রাজার পক্ষ থেকে স্পার্টান ল্যাসিডিমনের প্রতি আনুগত্যের শপথকে এই সুযোগে আরো শক্তিশালী করে তোলার সিদ্ধান্ত নিল সে। অনুষ্ঠানের গুরুত্ব এবং উত্তেজনা যেন চরমে পৌঁছে গেল। সেরেনার সৌন্দর্যকে আগে যদি বলা যেত চোখ-ধাঁধানো তাহলে অজস্র প্রশংসায় উজ্জ্বল হয়ে ওঠার পর এখন তাকে ভুবনমোহিনী বললেও ভুল হবে না। নারী-পুরুষ, বৃদ্ধ-যুবক, সাধারণ মানুষ বা অভিজাত; কারো পক্ষেই সেই সৌন্দর্যের আকর্ষণকে উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। রাজকীয় অতিথি এবং সেরেনার প্রাক্তন পাণিপ্রার্থী- সবাই যেন সেই সৌন্দর্যের স্রোতে অসহায় হয়ে পড়ল। একই অবস্থা হলো আমাদের সবার।
আহত রানিকে পাশে নিয়ে রাজা হুরোতাস যখন সবার উদ্দেশ্যে বক্তৃতা দেওয়ার জন্য উঠে দাঁড়াল, তার প্রতিটি কথা অখণ্ড মনোযোগর সাথে শুনল সবাই, প্রতিটি বাক্যের শেষে হর্ষধ্বনি করে উঠল। আহত হাতের পরিচর্যা করার পর তা গলায় ঝুলিয়ে নিয়েছে রানি তেহুতি, দারুণ সাহসী আর অভিজাত লাগছে তাকে দেখতে। হুরোতাসের আরেক পাশে দাঁড়িয়েছে তার মেয়ে সুন্দরী সেরেনা। ফলে বক্তৃতার প্রভাবটা আরো ভালোভাবে পড়ল সবার ওপর। ইতোমধ্যে উপস্থিত রাজাদের বেশির ভাগই হুরোতাসের বাগান থেকে তৈরি দারুণ মদের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ গলায় ঢেলেছে এবং আরো ঢালছে। তাদের পেয়ালায় মদের পরিমাণ অর্ধেকে নেমে আসার আগেই আবার পূর্ণ করে দিচ্ছে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ক্রীতদাসরা।
