ঘোড়া নিয়ে সরাসরি শূকরটার পেছনে চলে এলো তেহুতি, তারপর ঘোড়ার পিঠ থেকে ঝুঁকে পড়ে তলোয়ার ধরা হাত চালাল শূকরের পেছনের পায়ের রগ কেটে দেওয়ার জন্য। কিন্তু সেই একই মুহূর্তে তীব্র গতিতে পা ছুড়ল প্রাণীটা, ফলে তেহুতির তলোয়ার ধরা হাতের কবজিতে গিয়ে লাগল শক্ত খুরের লাথি। কবজি মচকে গেল, সাথে সাথে তলোয়ারটা হাত থেকে ছুটে গিয়ে উড়ে অন্য পাশে পড়ল। তেহুতি নিশ্চয়ই প্রচণ্ড ব্যথা পেয়েছে, কারণ ঘোড়ার পিঠে বসে থাকতে পারল না সে, টলে উঠে পড়ে গেল নিচে। বলা যায় খ্যাপা শূকরটার প্রায় পিঠের ওপরই পড়ল সে, আহত হাতের কবজি চেপে ধরে আছে আরেক হাত দিয়ে। তবে রামেসিস ঠিক তার পেছনেই ছিল। তেহুতির বিপদ বুঝতে পেরে দ্রুত সামনে এগিয়ে গেল সে, তারপর নিজের ঘোড়ার পিঠ থেকে ঝুঁকে এলো নিচে। নিজের গতিবেগকে ব্যবহার করে ছোঁ মেরে তেহুতিকে ঘোড়ার পিঠে তুলে নিল সে, তারপর শূকরটার ধারালো দাঁত আর শক্ত খুরের নাগালের বাইরে চলে গেল।
ওদিকে মায়ের বিপদ দেখে মুহূর্তের জন্য অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল সেরেনা। শূকরটা যখন ওর ঘোড়াকে দেখে তেড়ে এলো তখন ভয় পেয়ে লাফ দিয়ে উঠল ঘোড়াটা। ফলে ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়ে গেল ও। যদিও দুই পায়ের ওপর ভর দিয়েই নামতে পারল মাটিতে; কিন্তু ওর হাতে যে বর্শাটা ছিল সেটা ছুটে গেল হাত থেকে। আরেকটা অস্ত্রের খোঁজে, অথবা আসন্ন বিপদের হাত থেকে বাঁচার জন্য মরিয়া হয়ে এদিক-ওদিক তাকাল ও।
ছেঁড়া আঙুরলতা আর ঝোঁপের ভেতরে কাদার মাঝে নীল তলোয়ারটা কোথায় পড়েছে সেটা আমার চোখ এড়াতে পারেনি। তলোয়ারের রুপালি ফলায় রোদ ঝিলিক দিচ্ছে, যেন সদ্য ধরা পড়া টুনা মাছ। তাই দেখেই অস্ত্রটা চিনে নিয়েছি আমি।
ঘোড়ার পেটে হাঁটু দিয়ে পুঁতো দিলাম এবার, তীরগতিতে এগিয়ে গেলাম তলোয়ারটা লক্ষ্য করে। ঘোড়ার গতি না কমিয়েই ঝুঁকে এসে হাত বাড়িয়ে দিলাম। রত্নখচিত হাতলটার ওপর চেপে বসল আমার আঙুলগুলো। ঘোড়ার। পিঠে আবার সোজা হয়ে বসেই চিৎকার করে ডাক দিলাম আমি সেরেনা! হইচই আর চেঁচামেচির আওয়াজ ছাপিয়ে গেল আমার কণ্ঠ, আর্টেমিসের পাঠানো বিশাল শূকরের খুরের শব্দ আর গর্জন ছাপিয়ে পৌঁছে গেল সেরেনার কানে।
আমার কণ্ঠস্বর অনুসরণ করে ঘাড় ঘোরাল সেরেনা। নীল তলোয়ারের হাতল ধরে একবার মাথার ওপর ঘোরালাম আমি। এই যে, সেরেনা! ধরো! তারপর শরীরে সমস্ত শক্তি দিয়ে অস্ত্রটা ছুঁড়ে দিলাম ওর দিকে। শূন্যে একবার চক্কর কেটে সেরেনা যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল সেদিকে এগিয়ে গেল অস্ত্রটা। সাবলীল ভঙ্গিতে শরীর মুচড়ে সেটাকে এগিয়ে আসতে দিল সেরেনা, তারপর খপ করে চেপে ধরল হাতল। অসাধারণ অস্ত্রটা এখন একজন শোভা পাচ্ছে। একজন অর্ধ-দেবীর ডান হাতে, আর্টেমিসের পাঠানো বিপদের যেন এবার অবসান হতে যাচ্ছে। শূকরের পরবর্তী আক্রমণের মুখোমুখি হতে সামনে ছুটে গেল সেরেনা। কম্পিত বুকে তার ছুটে যাওয়া দেখলাম আমি, একই সাথে দুলছি গর্ব আর আতঙ্কের দোলায়। গর্বিত ওর সৌন্দর্য আর সাহস দেখে, আর আতঙ্ক ওর বিপদের ভয়াবহতা বুঝতে পেরে।
শূকরটা নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছে যে সেরেনা এগিয়ে আসছে, কারণ এবার ঘোড়ার মৃতদেহকে ছেড়ে ঘুরে দাঁড়াল সে, সেরেনার মুখোমুখি হলো। আক্রমণকারীর ওপর কুতকুতে চোখগুলো স্থির হওয়া মাত্রই লাফ দিল প্রাণীটা, দ্রুতবেগে এগিয়ে আসতে শুরু করল। আচমকা থমকে দাঁড়াল সেরেনা, পায়ের আঙুলের ওপর ভর দিয়ে ভারসাম্য রক্ষা করল। মনে হলো যেন বিশাল শূকরের সামনে পড়ে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাবে ওর শরীর; কিন্তু একেবারে শেষ মুহূর্তে অপূর্ব দক্ষতায় সরে গেল এক পাশে। পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় সেই ভয়াবহ গজদাঁতগুলো আবার চালাল প্রাণীটা, যেগুলো দিয়ে একটু আগেই রাজা হুরোতাসের ঘোড়ার পেট চিরে দিয়েছে। সেরেনার টিউনিকে আটকে গেল একটা দাঁতের মাথা। কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে সেরেনার ভারসাম্যের কোনো ক্ষতি না করেই কাপড় ছিঁড়ে বের হয়ে গেল আবার।
তারপর প্রাণীটা ওর পাশ কাটানো মাত্রই নীলচে-রুপালি তলোয়ারের ফলা দিয়ে ওটার পেছনের পায়ে আঘাত করল সেরেনা। উজ্জ্বল ফলাটা শূকরের পেছনের দিকের পায়ের গোড়ায় আটকে গেল, এবং পরিষ্কারভাবে দুই ভাগ করে ফেলল সাথে সাথে। কেটে আলাদা হয়ে যাওয়া পা-টা কাদায় গেঁথে যাওয়ায় খাড়া হয়ে রইল। চামড়ার ভেতরে পেশিগুলো দেখা যাচ্ছে পরিষ্কার, থরথর করে কাঁপছে আর ঝাঁকি খাচ্ছে।
তবে চার পায়ে শূকরটা যেমন ভয়ংকর ছিল, তিন পায়েও যেন তার সেই ভয়াবহতার একটুও কমতি হলো না। পেছনের এক পায়ে ভর করেই চরকির মতো ঘুরে দাঁড়াল ওটা। এখন আর গর্জন করছে না, শুধু চোয়ালে চোয়ালে বাড়ি দিচ্ছে, ফলে গজদাঁতগুলো পরস্পরের সাথে বাড়ি খেয়ে ভীতিকর খটাখট আওয়াজ তুলেছে। এবারও প্রাণীটাকে আক্রমণ শানিয়ে কাছে আসার সুযোগ করে দিল সেরেনা, তারপর আগের মতোই একেবারে শেষ মুহূর্তে এক পাশে সরে গেল। ওর হাতের তলোয়ারটা যেন পারদের লম্বা একটা রেখায় পরিণত হলো, কোপ মারল শূকরটার সামনের ডান পায়ের হাঁটুর কাছে। পা-টা এমনভাবে আলাদা হয়ে গেল যেন হাড় বলতে কিছু ছিল না ওখানে, স্রেফ মাংস।
