আঙুর বাগান যেখান থেকে শুরু হয়েছে আর যেখানে জঙ্গলের শেষ; সেখানে ধীরে ধীরে গাছপালার আড়াল থেকে উঁকি দিল একটা বিশাল চারকোনা মাথা। মনে হলো যেন পুরাণ থেকে উঠে এসেছে কোনো কাল্পনিক প্রাণী। কোঁকড়ানো কুচকুচে কালো পশমে ঢেকে আছে পুরো মাথাটা। বিশাল সুচাল কানগুলো খাড়া হয়ে আছে। চোখগুলো কুতকুতে জ্বলজ্বল করে জ্বলছে। চ্যাপ্টা নাকটা এখন সমান হয়ে আছে, ফুটোগুলো আমাদের গন্ধ পেয়েছে আগেই। গজদাঁতগুলো এত লম্বা আর বাঁকানো যে, ক্ষুরের মতো ধারালো শেষ প্রান্ত দুটো প্রাণীটার বিশাল মাথার ওপর গিয়ে শেষ হয়েছে, প্রায় ছুঁই ছুঁই করছে পরস্পরকে।
আরো একবার সিংহের মতো একটা গর্জন বেরিয়ে এলো প্রাণীটার গলা থেকে। এবার আমি বুঝতে পারলাম এটা প্রকৃতির সৃষ্টি কোনো স্বাভাবিক প্রাণী নয়, বরং সত্যিই একজন দেবীর খেয়ালের ফসল। এই দানব যদি ঈগলের মতো তীক্ষ্ণ গলায় ডেকে ওঠে বা ছাগলের মতো ম্যা-ম্যা করে ওঠে তাহলেও আমি অবাক হব না। জঙ্গলের গাছগুলোকে অবহেলায় ঠেলে সরিয়ে দিয়ে বা কোনোটাকে উপড়ে ফেলে সামনে এগিয়ে এলো প্রাণীটা, খোলা জায়গায় এসে দাঁড়াল। পেছনের অংশটা পুরু পেশিতে ভর্তি পিঠের ওপর দুই কাঁধের মাঝখানে ঠেলে উঠেছে ঘন লোমে ঢাকা কুজ। খুর দিয়ে মাটি খুঁড়তে শুরু করল এবার, রাগের চিহ্ন। নীলনদে বেশ কয়েকবার বুনো মহিষ শিকার করেছি আমি; কিন্তু এর খুরগুলো সেই মহিষের চাইতেও কয়েক গুণ বড়। মাটি থেকে এবার বাদামি ধুলোর মেঘ উঠল, ঢেকে ফেলল শূকরটাকে। তাতে যেন আরো ভয়ংকর অপার্থিব হয়ে উঠল ওটার ভয়াবহতা। তারপর হঠাৎ করেই আঙুর বাগানের মাঝ দিয়ে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে তীব্র গতিতে দৌড়ে নেমে আসতে শুরু করল প্রাণীটা, চোখ হুরোতাসের দিকে। যেন এক মুহূর্তেই চিনে নিয়েছে। যে কে তার মালকিন আর্টেমিসের প্রধান শত্রু।
সাথে সাথে বর্শাটা তাক করে ধরল হুরোতাস, ঘোড়া ছুটিয়ে এগিয়ে গেল শূকরটার মুখোমুখি হতে। গলা চিরে যুদ্ধ হুংকার বেরিয়ে এলো তার, যদিও প্রাণীটাকে ভয় দেখাতে নাকি নিজেকে সাহস জোগাতে চিৎকার করল সে, বলা মুশকিল। প্রাণীটাও পাল্টা একটা রক্ত হিম করা চিৎকার ছেড়ে জবাব দিল হুরোতাসের হুংকারের।
ঢাল বেয়ে নেমে আসতে থাকায় আক্রমণের পূর্ণ সুবিধা পাচ্ছে আর্টেমিসের শূকর। পুরো দেহটাকে ভূমিকম্পের ফলে পাহাড়ি ঢাল বেয়ে নেমে আসা পাথরের স্রোতের মতো ব্যবহার করছে সে। কাছাকাছি আসতেই রেকাবে পায়ের ভর রেখে দাঁড়িয়ে গেল হুরোতাস, ভারী বর্শাটা মাথার ওপর তুলল। বহু যুদ্ধের অভিজ্ঞতায় শক্তিশালী ডান হাতের সমস্ত শক্তি ব্যবহার করে বর্শাটা ছুঁড়ে মারল সে। একেবারে নিখুঁতভাবে উড়ে গেল বর্শা, প্রাণীটার ভারী চামড়া আর পুরু লোমের আস্তরণ ভেদ করে প্রায় সম্পূর্ণ দৈর্ঘ্যের প্রায় অর্ধেকের মতো ঢুকে পড়ল বুকের ভেতর। আমার মনে হলো নিশ্চয়ই হৃৎপিণ্ডসহ অন্তত কয়েকটা গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ জখম হয়েছে বর্শার আঘাতে।
কিন্তু হুরোতাসের কাছ থেকে এমন ভয়াবহ প্রাণঘাতী আঘাতের পরও শূকরটার মাঝে সামান্যতম প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না। একটুও হোঁচট খেল না, এক পলকের জন্য শিথিল হলো না ছুটে আসার গতি। অদম্য ভঙ্গিতে ছুটে এলো সে, তারপর আরো একবার ক্রুদ্ধ কান ফাটানো তীক্ষ্ণ গর্জন ছেড়ে এমনভাবে মাথা ঝাঁকাল, ঠিক যেভাবে অপরাধীর শিরচ্ছেদ করার জন্য এক টানে কুড়াল চালায় জল্লাদ। বিশাল বাঁকানো গজদাঁতগুলো ঝলসে উঠল আলোয়, তারপর ঢুকে গেল হুরোতাসের ঘোড়ার পাঁজরের ভেতর। একটা মাত্র ভয়ংকর আঘাত, সাথে সাথে চামড়া, মাংস আর হাড় ভেদ করে ভেতরে ঢুকে গেল দাঁতগুলো, পাঁজরের সবকটা হাড় চুরমার করে দিল। সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ আর নাড়িভুঁড়ি খোলা জায়গা দিয়ে বেরিয়ে এলো সাথে সাথে। তার পরেই পেছনের পা দুটো যেখানে জোড়া লেগেছে সেখানকার হাড় ভেঙে দিয়ে বেরিয়ে এলো দাঁতগুলো। দুই পা আলাদা হয়ে যাওয়ায় হুড়মুড় করে মাটিতে পড়ে গেল ঘোড়াটা। এই আঘাতের ফলে হুরোতাসেরও একটা পা হারানো উচিত ছিল; কিন্তু আঘাতের প্রথম ধাক্কাতেই ঘোড়ার পিঠ থেকে উড়ে গিয়ে মাটিতে পড়েছে সে। তার পরেই দুটুকরো হয়ে গেছে তার ঘোড়া। নিরাপদ দূরত্বেই পড়েছে হুরোতাস। কিন্তু মাথার ওপর ভর দিয়ে পড়ার কারণে শিরস্ত্রাণ থাকার পরেও অজ্ঞান হয়ে গেছে সে।
মাটিতে পড়ে যাওয়া ঘোড়াটার ওপর এবার চড়াও হলো আর্টেমিসের শূকর, প্রচণ্ড ক্রোধের সাথে ছিন্নভিন্ন করে দিতে লাগল প্রাণীটার শরীর। খাড়া ঢাল বেয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য প্রাণপণে নিজের ঘোড়াকে তাড়া দিলাম আমি। কিন্তু তেহুতি ইতোমধ্যে আমার অনেক সামনে চলে গেছে, নিজের নিরাপত্তার জন্য কণামাত্র তোয়াক্কা না করে আক্রমণ চালাতে যাচ্ছে বিশাল শূকরটার ওপর। আমাদের দুজনের মাঝামাঝি জায়গায় রয়েছে সেরেনা আর আর্টেমিস। সবাই চিৎকার করছে পাগলের মতো। হুরোতাস মারা গেছে ভেবে তীব্র স্বরে শূকরটাকে শাপশাপান্ত করছে তেহুতি, ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করার হুমকি দিচ্ছে। একই সাথে সেই নীল তলোয়ার তুলে ধরে রেখেছে মাথার ওপর। ওদিকে যুদ্ধের উন্মাদনা পেয়ে বসেছে রামেসিস আর সেরেনাকে, প্রচণ্ড উত্তেজনায় একে পরস্পরকে উৎসাহ দিতে দিতে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে তারা। এখন দুজনের কারো মাথাতেই তিল পরিমাণ যুক্তি কাজ করবে না। ওদের তিনজনকে সাবধান করার জন্য গলা ফাটিয়ে চেঁচাচ্ছি আমি, বলছি যে শূকরটার ভার আমার ওপর ছেড়ে দিতে। কিন্তু বরাবরের মতো এবারও আমার কথায় কর্ণপাত করার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না কারো মধ্যে।
