হে রাজা, প্রতিপক্ষ যখন দলে এবং বুদ্ধিতে ভারী হয় তখন তাদের সাথে কেবল একজন বোকাই তর্ক চালিয়ে যায়। আমি সাক্ষ্য দিতে চাই যে, আপনি তেমন কোনো বোকা নন। তাই বলছি, যা হবেই তাকে মেনে নেওয়াই ভালো, জবাব দিলাম আমি। নীরবে আমার দিকে তাকিয়ে রইল হুয়োতাস, চোখের তারায় একই সাথে খেলা করছে ক্রুদ্ধ দৃষ্টি আর হাসির ঝিলিক। বুঝতে পারছে, এমনকি আমার সমর্থনও নেই ওর পক্ষে। অগত্যা ঘুরে দাঁড়াল সে, দুই পরিচারক যেখানে তার ঘোড়াটা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সেদিকে এগিয়ে গেল। এক লাফে ঘোড়ার পিঠে উঠে বসে লাগামটা চেপে ধরল সে। তারপর জ্বলন্ত চোখে তাকাল আমাদের সবার দিকে।
তাহলে এসো! মরার যদি এতই শখ হয়ে থাকে তো এসো আমার সাথে। আশা করি আর্টেমিস এবং অন্য সকল দেব-দেবী তোমাদের এই বোকামিকে ক্ষমা করবেন, যদিও তার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
.
বিশাল এলাকা জুড়ে অভিযান পরিচালনা করতে হবে, এবং পুরো জায়গাটা উঁচু-নিচু পাহাড় আর ঘন জঙ্গলে ভর্তি। ঢালগুলোর গায়ে পুরু হয়ে জন্মেছে আঙুরলতা। ইচ্ছে করেই দ্রুতগতিতে চলছে হুরোতাস, সম্ভবত স্ত্রী আর কন্যাকে তার নির্দেশ অমান্য করার শাস্তি দেওয়ার জন্য। তবে ওরা খুব সহজেই হুরোতাসের সাথে তাল মিলিয়ে চলেছে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, আমিও শিকারি দলের সামনেই থাকলাম, দুই নারীর ঠিক পেছনে। দলে আরো প্রায় শ খানেক লোক রয়েছে এবং আমাদের পেছনে বেশ কয়েক লিগ জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে তারা। তবে সবাই বেশ খোশমেজাজে আছে, কারণ প্রায় সবারই ধারণা যে প্রাণীটা সম্পর্কে যা কিছু বলা হয়েছে তার বেশির ভাগই বাড়িয়ে বলা। ল্যাকোনিয়ান শূকরটা সম্ভবত স্বাভাবিক কোনো বুনো শূকরই হবে, কিছু তীর আর বল্লমের খোঁচা দিয়েই যাকে শিকার করা সম্ভব। শিকারের চাইতে সবার মাঝে বেশি আগ্রহ দেখা যাচ্ছে হাত থেকে হাতে ঘুরে বেড়ানো মদের পেয়ালার দিকে।
আমরা যারা একেবারে সামনে রয়েছি তাদের চোখে শূকরটার উপস্থিতির প্রচুর চিহ্ন ধরা পড়েছে। কিছুক্ষণ পরপরই অনেকখানি জায়গা জুড়ে আঙুরলতার ঝোঁপ উপড়ে পড়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে। সেচ দেওয়ার জন্য কৃষকরা যে ছোট ছোট নালা কেটেছিল সেগুলো ভেঙে ফেলা হয়েছে। ভাঙা জায়গা দিয়ে পাহাড়ের পাশ ঘেঁষে গড়িয়ে পড়ে যাচ্ছে পানি, যেই নদী থেকে পানি নিয়ে আসার ব্যবস্থা করা হয়েছে সেখানেই গিয়ে মিশে যাচ্ছে আবার। যে লতাগুলো শূকরের আক্রমণ থেকে বেঁচে গেছে সেগুলো শুকিয়ে বাদামি রং ধারণ করেছে, খসে পড়ছে পাতাগুলো। পানির অভাবে মরতে বসেছে সব। যেসব কৃষকের ওপর পানি সরবরাহ ব্যবস্থার দেখাশোনার ভার ছিল তারা সবাই ভয়ে মাঠে কাজ করতে আসাই বাদ দিয়েছে। সবাই এখন ভয়ের চোটে ঘরে বসে ঠকঠক করে কাঁপছে। বোঝা যাচ্ছে যে তারা, এমনকি হুরোতাসের চাইতেও শূকরটাকে বেশি ভয় পায়।
হুরোতাসের আঙুর বাগানে আক্রমণ চালানোর মাধ্যমে তার সাম্রাজ্যের সবচেয়ে দুর্বল এবং দামি জায়গাটার ওপরই নিজের ক্রোধ ফলিয়েছেন দেবী আর্টেমিস। এই বাগান থেকে উৎপন্ন মদকে প্রায় নিজের কোষাগারে রক্ষিত সম্পদের মতোই ভালোবাসে হুরোতাস। লাল মদভর্তি একটা পেয়ালা যখন তার হাতে থাকে আর আরো এক পেয়ালা মদ থাকে তার পেটের ভেতরে, তখন আর কিছু দরকার হয় না তার। যদিও বাগানের পরিচর্যাকারীদের কাছ থেকে ধ্বংসযজ্ঞের কথা আগেই শুনেছে সে; কিন্তু তখনো ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সম্পূর্ণ বুঝে উঠতে পারেনি। অন্য কারো কাছ থেকে এ ব্যাপারে শোনা এক কথা আর নিজের চোখে সেটা দেখা সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাপার।
আমাদের শিকারি দলের সবার সামনে রয়েছে হুরোতাস। হাতে ধরা বিশাল বর্শাটা মাথার ওপর তুলে নাড়ছে সে, একই সাথে দেবী এবং তার পাঠানো প্রাণীটার ব্যাপারে অশ্রাব্য সব গালি ছুড়ছে। গালিগুলোর মাঝে সবচেয়ে সভ্য যেটা তা হলো শয়তান বেশ্যা-বুড়ি। আর সবচেয়ে খারাপ যেটা সেটা হলো দেবীর সাথে তার পাঠানো শূকরের অনৈতিক সম্পর্ক বিষয়ক কিছু একটা। কথাটা শুনে আমার কল্পনার চোখে যে ছবি ভেসে উঠল তাতে প্রায় বমি উঠে আসার জোগাড় হলো আমার। কিন্তু তেহুতি আর তার মেয়ে সেরেনার ভাব দেখে মনে হলো দারুণ মজার কোনো কথা শুনছে তারা।
তারপর হঠাৎ করেই এই হাসিঠাট্টার শব্দকে যেন ছুরি দিয়ে কেটে থামিয়ে দিল কেউ, কারণ অন্য একটা ভয়ংকর, আরো জোরালো শব্দ ভেসে এলো। প্রায় বধির হয়ে গেলাম আমরা। ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরে হতচকিত চোখে এদিক ওদিক তাকাল হুরোতাস। স্বীকার করছি, এমনকি আমি নিজেও দারুণ অবাক হয়ে গেলাম, যদিও আমাকে ভয় পাওয়ানো খুব কঠিন।
এর আগে জীবনে মাত্র একবারই এমন ভয়াবহ শব্দ শুনেছি আমি। সেটা ছিল নীলনদের তীরে, ইথিওপিয়ায়। এমন এক শব্দ, যেটা যেকোনো সাহসী পুরুষের ঘাড়ের চুল খাড়া করে দিতে পারে, এমনকি তার প্রস্রাব আর পায়খানার রাস্তার মুখ ঢিলে করে দিলেও আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। সেটা ছিল কালো-কেশরওয়ালা এক পুরুষ সিংহের গর্জন। এখন যে শব্দটা শুনলাম সেটা সেই গর্জনের চাইতেও কয়েক গুণ বেশি জোরালো। মনে হলো যেন অনেকটা আপনাআপনিই আমার মাথাটা ঝটকা দিয়ে ঘুরে গেল, যেদিক থেকে বজ্রপাতের মতো শব্দটা ভেসে এসেছে সেদিকে তাকালাম আমি।
