ট্যাগেটাস পর্বতমালার উঁচুতে ঘন জঙ্গলে বাস করে ওটা, শুধু রাতের বেলায় নিচে নেমে আসে উপত্যকায় বাস করা লোকগুলোর ফসলের ক্ষেতে তাণ্ডব চালাতে। ফলে খুব কম মানুষই ওটাকে নিজের চোখে দেখেছে। এক রাতের মাঝেই পাঁচ থেকে ছয়জন ক্ষুদ্র কৃষকের চাষ করা ফসল সাবাড় করে দেয় প্রাণীটা, যা খেতে পারে না সেগুলো মাটির সাথে মিশিয়ে নষ্ট করে দিয়ে যায়। শূকরটার গজদাঁতগুলো যুদ্ধের তলোয়ারের সমান লম্বা। ওই দাঁতগুলোর সাহায্যে বিদঘুঁটে আকৃতির মাথাটা একবার দুলিয়েই একটা ঘোড়ার নাড়িভুড়ি সব বের করে দিতে পারে। প্রচণ্ড পুরু আর শক্ত চামড়া, তার ওপর তারের মতো শক্ত আর ঘন লোমের আবরণ। ফলে একমাত্র সুদক্ষ হাতের প্রচণ্ড শক্তিশালী বর্শা ছাড়া আর সব কিছুর আঘাত প্রতিহত করতে পারে ওই চামড়া। খুরে প্রচণ্ড ধার, এক লাথি মেরে ফুটো করে দিতে পারে যুদ্ধের ঘোড়ার পেট। তাই সেরেনার দুই প্রাক্তন পাণিপ্রার্থী যখন শিকারে যোগ। দেওয়ার আমন্ত্রণ ফিরিয়ে দিল তখন আমরা কেউ খুব একটা অবাক হলাম না। একজন অজুহাত দেখাল যে এসবের পক্ষে তার বয়স অনেক বেশি, আরেকজন বলল ইদানীং নাকি তার শরীর ভালো যাচ্ছে না। তবে দুজনই দূর থেকে অথবা গাছের ওপর বসে শিকার অনুষ্ঠান দেখার আমন্ত্রণ খুশি হয়েই গ্রহণ করল।
যারা যারা শিকারে যাচ্ছে তাদের সবার মাঝে কিছুটা উদ্বেগ মেশানো উত্তেজনা কাজ করছে। ঘোড়ায় চড়ে ওই দানবকে শিকার করতে চলল সবাই।
স্বাভাবিকভাবেই সবার সামনে থাকল রাজা হুরোতাস এবং তার ডান পাশে রইল তার প্রিয় সঙ্গী অ্যাডমিরাল হুই। কয়েক দিন আগেই লুক্সরে হিকসস বাহিনীর বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ হয়েছিল তাতে আমাকে লড়াই করতে দেখেছে হুরোতাস, ফলে আমাকে যখন সে তার বাম পাশে রাখল তখন কেউ অবাক হলো না।
নিজের প্রিয় স্ত্রী এবং একই রকম প্রিয় কন্যাকে সবার পেছনে পেছনে আসতে নির্দেশ দিল হুরোতাস, এবং যুবরাজ রামেসিসকে তাদের প্রধান রক্ষাকর্তা হিসেবে তাদের সাথে সাথেই আসতে বলল। অবশ্য কাজটা করার আগে যদি আমার সাথে একটু কথা বলে নিত সে তাহলে একটা বিব্রতকর পরিস্থিতি থেকে বেঁচে যেতে পারত। কিন্তু সেটা হুরোতাসের কপালে ছিল না বোধ হয়। কারণ এই নির্দেশ দেওয়ার সাথে সাথে স্বাভাবিকভাবেই সেরেনা তেহুতি এবং রামেসিস তীব্র আপত্তি জানাল। ঝানু উকিলের দক্ষতা নিয়ে স্বামীর মুখোমুখি হলো তেহুতি। তা ছাড়া ত্রিশ বছরের বিবাহিত জীবনে সে যে প্রাধান্য অর্জন করেছে সেটার গুরুত্বও নেহাত কম নয়।
প্রথম কবে যেন তোমার জীবন বাঁচিয়েছিলাম আমি, প্রিয়তম? মিষ্টি গলায় হুরোতাসকে জিজ্ঞেস করল সে। তখন তো এমনকি আমাদের বিয়েও হয়নি, তাই না? হ্যাঁ এবার মনে পড়েছে। তখনো তুমি সেই সামান্য ক্যাপ্টেন, যার নাম ছিল জারাস। আল হাওয়াসাওয়ি নামের সেই ডাকাত, যে আমাকে অপহরণ করেছিল, তার হাত থেকে আমাকে উদ্ধার করতে এসেছিলে তুমি আর টাইটা। কিন্তু নিজের মহান দায়িত্ব পালন করার আগেই ওই ডাকাতের হাতে পেটে ছুরি খেয়ে বসো তুমি। শেষ পর্যন্ত আমি আর টাইটা মিলে তোমাকে উদ্ধার করি! উদ্ধার কথাটার ওপর সে এত বেশি জোর দিল যে রাগে ফ্যাকাশে হয়ে গেল হুরোতাসের চেহারা। এমনকি তেহুতির মুখ থেকে সেই ঘটনার এমন রং চড়ানো বিবরণ শুনে আমি নিজেও অবাক হয়ে গেলাম। কিন্তু আমাদের দুজনের মাঝ থেকে কেউ প্রতিবাদ করে কিছু বলার আগেই আবার বলতে শুরু করল তেহুতি, আর সেটা ছিল কেবল প্রথমবার, এর পরেও আরো বহুবার তোমার জীবন বাঁচিয়েছি আমি… এই বলে আরো কয়েকটা ঘটনার কথা হুরোতাসকে মনে করিয়ে দিল সে।
এবার সেরেনা সামনে এগিয়ে এলো। মায়ের কথার খেই ধরে এত নিখুঁতভাবে সে নিজের কথা শুরু করল যে, মনে হতে পারে তারা দুজন আগে থেকে সব অনুশীলন করে রেখেছিল। বলল, আর মা এবং আমার মাঝে একটা চুক্তি আছে, যেখানে তার ভাইয়ের দেওয়া নীল তলোয়ারটা আমরা দুজন মিলে ব্যবহার করব বলে ঠিক করেছি। ইচ্ছে করেই আবেগপূর্ণ কাঁপা কাঁপা গলায় কথা বলছে ও। এখন এই শিকারে যদি আমরা একসাথে না থাকি তার অর্থ হবে যে আমাদের কোনো একজনের কাছে ওই অস্ত্রটা থাকবে না। অথচ সেটা থাকলে হয়তো তার জীবন বেঁচে যাবে। বলা যায় না, তাতে তোমারও প্রাণ বেঁচে যেতে পারে বাবা। ওই ভয়ংকর প্রাণীটার সামনে আমাদের এভাবে নিরস্ত্র অবস্থায় নিশ্চয়ই ছেড়ে দেবে না তুমি, বাবা? বলো? স্ত্রীর কথার কোনো জবাব না দিয়েই মেয়ের দিকে ঘুরে তাকাল হুরোতাস। কিন্তু আরো একবার তার কথায় ছেদ পড়ল, কারণ এবার যুবরাজ রামেসিসের প্রতিবাদ জানানোর পালা।
সেরেনা আমার ভবিষ্যৎ স্ত্রী। ওকে যেকোনো বিপদ থেকে রক্ষা করা আমার অবশ্য কর্তব্য মহামান্য রাজা। ওই শূকরটা যখন আমাদের সামনে পড়বে তখন আমি ওর পাশে থাকতে চাই।
তিনজনের দিকে জ্বলন্ত চোখে চেয়ে রইল রাজা হুরোতাস। কিন্তু সেরেনা, তেহুতি আর রামেসিসও কাঁধে কাঁধ ঠেকিয়ে তাকিয়ে রইল তার দিকে, কেউ পিছু হঠতে রাজি নয়। সমর্থনের আশায় এদিক-ওদিক তাকাল হুরোতাস। এবার একটু পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা আমার ওপরেই চোখ পড়ল তার। টাইটা, এই বোকাদের বোঝাও যে আমরা কত বিপজ্জনক একটা শিকারে নামতে যাচ্ছি। ওই শূকরের সামনে পড়লে সবার জন্যই অনেক বড় বিপদ নেমে আসবে।
