*
মিশরের যুবরাজ রামেসিস এবং স্পার্টার রাজকুমারী সেরেনার বিয়ের নির্দিষ্ট তারিখের দিন পনেরো আগে হুরোতাস এবং রামেসিসসহ সব মিলিয়ে আঠারোজন রাষ্ট্রপ্রধান সমবেত হয়েছে দুর্গের মন্ত্রণাকক্ষে।
এর আগের দিন এই পরিষদ নিজেদের মাঝে নির্বাচনের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, উটেরিককে মিশরের ফারাও হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া যাবে না, কারণ হচ্ছে তার উন্মাদগ্রস্ত অবস্থা। উটেরিকের বদলে রামেসিসকে ফারাও হিসেবে নির্বাচন করেছে তারা।
পরিষদের সদস্যরা সবাই আসন গ্রহণ করার পর হুরোতাস তার কথা শুরু করল। এই মুহূর্ত থেকে উত্তরের পরিষদের আলোচনা সভা শুরু হচ্ছে। আমি এই পরিষদের প্রধান সচিব প্রভু টাইটাকে আহ্বান জানাচ্ছি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির শর্তগুলো পড়ে শোনাতে, যা ক্যালিপোলিসের রাজা টিন্ডারকাস আমাদের সামনে উত্থাপন করেছেন।
পরিষদের সদস্যদের মাঝে কেবল টিল্ডারকাস, রামেসিস এবং রাজা হুরোতাস পড়তে পারে। আর আমি একমাত্র ব্যক্তি যাকে কোনো কিছু পড়ার সময় ঠোঁট নাড়তে হয় না। সে জন্যই টিন্ডারকাসের মাধ্যমে চুক্তি উত্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে হুরোতাস, আমাকে দায়িত্ব দিয়েছে সেটা সবাইকে পড়ে শোনানোর। চুক্তিতে খুব বেশি হলে শ পাঁচেক শব্দ আছে। কিন্তু তাতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে উত্তর পরিষদের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর কোনো একটির সার্বভৌমত্ব বা তার নাগরিকদের ওপর যদি কোনো বাইরের শক্তির আক্রমণ ঘটে তাহলে বাকি সদস্য রাষ্ট্রগুলো তার সাহায্যে এগিয়ে আসতে বাধ্য থাকবে।
চুক্তিনামা পড়ে শোনানোর পর কিছু টুকটাক আলোচনা চলল সবার মাঝে। তবে শেষ পর্যন্ত সবাই চুক্তির শেষে স্বাক্ষর করল অথবা নিজেদের চিহ্ন এঁকে দিল। পরিষদের সদস্যদের সবার মাঝেই বেশ হালকা মেজাজ বিরাজ করছে। কক্ষের ভেতরের কাজ শেষ হতে রাজা হুরোতাসের সাথে বাইরের প্রাঙ্গণে এসে দাঁড়াল সবাই। এখানে আগেই বেঁধে রাখা হয়েছে একটা শক্তিশালী কালো ঘোড়া।
সদস্যদের প্রত্যেকের হাতে একটা করে রুপার পেয়ালা তুলে দেওয়া হলো। ঘোড়ার চারপাশে জড়ো হলো সবাই। এবার নিজের যুদ্ধ কুঠারটা তুলে ধরে গায়ের জোরের ঘোড়ার খুলির ওপর একটা কোপ মারল হুরোতাস। সাথে সাথে মারা গেল ঘোড়াটা। এবার এক এক করে সমস্ত শাসক এবং রাজারা সামনে এগিয়ে এলো, হাতের পেয়ালাটা ধরল ঘোড়ার খুলি থেকে ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে আসা রক্তের সামনে। উষ্ণ রক্তভর্তি পেয়ালা মাথার ওপর তুলে ধরে তারা শপথ করল, যদি আমি এই পবিত্র শপথ ভঙ্গ করি তাহলে যেন আমার রক্তও একইভাবে প্রবাহিত হয়। এই কথা বলে এক চুমুকে পেয়ালা খালি করে ফেলল সবাই। কয়েকজন উচ্চ স্বরে হেসে উঠল ঠিকই তবে কাঁচা রক্তের স্বাদে অনেকেরই বমি আসার জোগাড় হলো। আমি নিশ্চিত, ওদের মাঝে কেউই ভাবেনি যে এই মাসটা শেষ হওয়ার আগেই শপথের শর্ত অনুযায়ী কাজে নামতে হবে ওদের।
*
রামেসিস এবং সেরেনার বিয়ের দিন যত ঘনিয়ে এলো ততই বাড়তে শুরু করল উৎসবের তীব্রতা। বিয়ের ঠিক চৌদ্দ দিন বাকি থাকতে হুরোতাস ঘোষণা করল এবার ল্যাকোনিয়ান শূকর শিকার করার সময় হয়েছে। এই বিশেষ প্রাণীটার ইতিহাস অনেক পুরনো, এবং একই সঙ্গে হুরোতাসের পুরনো শত্রুও বটে।
জারাস এবং তেহুতি যখন বহু বছর আগে ল্যাসিডিমনে এসে পৌঁছাল এবং জারাস পরিণত হলো রাজা হুরোতাসে; তার অনেকগুলো কাজের মাঝে একটা ছিল প্রথম আঙুরের চাষ করা। সেই আঙুর বাগান থেকে এই দ্বীপের প্রথম মদ তৈরি করেছিল সে।
কিন্তু তার পরেই একটা বড় ভুল করে বসে রাজা হুরোতাস। আঙুর বাগানের নিরাপত্তা এবং সমৃদ্ধি কামনা করে সে সব দেব-দেবীর পুজো দেয় ঠিকই; কিন্তু সেই তালিকায় দেবী আর্টেমিসের নাম যোগ করতে ভুলে যায়। আর্টেমিসের অনেকগুলো দায়িত্বের মাঝে একটা হলো, তিনি সমস্ত অরণ্য এবং বুনো প্রাণীর দেবীও বটে। আঙুর বাগানের জন্য জায়গা করতে গিয়ে প্রচুর পরিমাণে জঙ্গল কেটে সাফ করে ফেলে হুরোতাস। যে সমস্ত প্রাণী তার বাগানের ক্ষতি করতে পারে, যেমন বুনো শূকর, তাদের সবাইকে তাড়িয়ে দেয় জঙ্গল থেকে। বুনো শূকর হচ্ছে দেবী আর্টেমিসের অন্যতম প্রিয় একটা প্রাণী। স্বভাবতই হুরোতাসের এই উদ্ধত ব্যবহারে দারুণ রেগে যান তিনি।
তখন হুরোতাসকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য, সেইসাথে তার আঙুরের বিশাল বাগান মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়ার জন্য ল্যাকোনিয়ান শূকরকে পাঠান দেবী আর্টেমিস। স্বাভাবিক কোনো বুনো শূকর নয় ওটা। কেবল দেহে রাজরক্ত বইছে এমন কেউ অথবা দেবত্বের অধিকারী কারো পক্ষেই সম্ভব এই শূকরকে হত্যা করা, এবং সেটাও নেহাত সহজে নয়। যতবারই এই ল্যাকোনিয়ান শূকরকে হত্যা করা হোক না কেন, দেবী আর্টেমিস প্রত্যেক বছর এর পুনর্জন্ম ঘটানোর ব্যবস্থা করেন। প্রতিবছর ওটা হুরোতাসকে জ্বালাতে ফিরে আসে। আর প্রতিবছর দেবীর পাঠানো এই প্রাণীর চেহারা হয় আগের বছরের চাইতে আরো বিশাল, একই সাথে আরো বেশি ভয়ংকর আর হিংস্র।
হুরোতাসকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য শেষবার দেবী আর্টেমিস যে শূকরটাকে পাঠিয়েছিলেন সেটার কাঁধ বরাবর উচ্চতা ছিল প্রায় ছয় কিউবিট, যা একজন পূর্ণবয়স্ক পুরুষের উচ্চতার সমান। ওজন ছিল পাঁচ শ ডেবেন, অর্থাৎ বড়সড় একটা ঘোড়ার সমান।
