শেষ পর্যন্ত প্রায় প্রত্যেক দিক থেকে দিগন্তে দেখা দিতে শুরু করল আমাদের অতিথিদের জাহাজ। গিথিয়ন উপসাগরের দিকে এগিয়ে আসছে তারা, যেখানে সামরিক বাহিনীর সদস্যরা তাদের নিজ নিজ সেনাপতির সাথে অপেক্ষা করছে। তাদের স্বাগত জানানোর জন্য। তীরে নামার পর হুরোতাস নদীর তীর ধরে তাদের নিয়ে আসা হবে দুর্গ-প্রাসাদে, যেখানে সবার জন্য বিলাসবহুলভাবে থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। পুরো ব্যাপারটা সামলানো বেশ জটিল হয়ে দাঁড়াল, বিশেষ করে একসাথে একের বেশি জাহাজ তীরে এসে যখন থামল। নিজেদের প্রাধান্যের বিচারে আমাদের অতিথিরা খুবই স্পর্শকাতর। প্রয়োজন হলে দাঁত খিঁচিয়ে খোলা তলোয়ার হাতে নিয়ে কে আগে এসেছে তার ফয়সালা করবে তারা। দুই পক্ষকেই বুঝিয়ে-শুনিয়ে সামলে রাখতে গিয়ে নিজের কুটনৈতিক জ্ঞানের সবটুকু প্রয়োগ করতে হলো আমাকে।
তবে শেষ পর্যন্ত আমার কারিশমায় মুগ্ধ হয়ে সবাই শান্ত হয়ে তীরে নামতে পারল। সব কিছু গুছিয়ে নেওয়ায় আমার দক্ষতার কারণেই দাঙ্গা-হাঙ্গামা। থেকে বেঁচে গেলাম আমরা।
তীরে নামার সাথে সাথেই প্রধান প্রধান অতিথি এবং তাদের স্ত্রী ও রক্ষিতাদের তুলে দেওয়া হলো অপেক্ষমাণ রথ বাহিনীর জিম্মায়। তাদের সাথে থাকল অশ্বারোহী সৈন্যদের সারি, সেইসাথে বাদকদের দল। উল্লসিত জনতা ভিড় করে দাঁড়িয়ে রইল পথের দুই পাশে, তাদের সাথে আরো থাকল নৃত্যরত মেয়ের দল। গিথিয়ন বন্দর থেকে শুরু করে দুর্গ-প্রাসাদের প্রধান দরজা পর্যন্ত পুরো পথ ঢেকে দেওয়া হলো নানা রকমের ফুল দিয়ে।
দুর্গে অতিথিদের স্বাগত জানানোর জন্য অপেক্ষা করছিল রাজা হুরোতাস এবং রানি তেহুতি। তাদের সাথে যুবরাজ রামেসিস এবং তার হবু স্ত্রীও ছিল। উপস্থিত অতিথিদের মাঝে খুব কম ব্যক্তিই এর আগে সেরেনাকে সচক্ষে দেখেছে। যদিও তার অপার্থিব সৌন্দর্যের কথা কারো অজানা নয়; কিন্তু তাকে সামনাসামনি দেখার জন্য বোধ হয় কেউই প্রস্তুত ছিল না। এমনকি এর আগে যারা সেরেনাকে বিয়ের প্রস্তাব দিতে ল্যাসিডিমন এসেছিল তারাও যেন সেরেনার সৌন্দর্যের কথা ভুলে গেছে, কারণ একই রকম বজ্রাহত চেহারা হলো তাদেরও। এক এক করে এলো তারা, আর সেরেনার সৌন্দর্য দেখে বিস্ময়ে বাক্যহারা হয়ে হাঁ করে তাকিয়ে রইল কেবল। কিন্তু কয়েক মিনিটের মাঝেই সেরেনার উষ্ণ এবং সহজ ব্যবহার আর উজ্জ্বল হাসি তাদের সবাইকে এই সম্মোহিত অবস্থা থেকে বের করে আনল।
সেরেনার অনেকগুলো গুণের মাঝে এটাও একটা; নিজের সৌন্দর্য সম্পর্কে যেন কোনো ধারণাই নেই ওর। একটুও অহংকার কখনো দেখা যায় না ওর মাঝে। এতে যে ওর আকর্ষণ আরো বাড়ে তাতে অবশ্য কোনো সন্দেহ নেই। ভিড়ের মাঝেও ওর অবস্থান খুব সহজেই চিহ্নিত করা যায় জনতার মাঝে ছড়িয়ে পড়া উত্তেজনার জোয়ার দেখে। ও যেখানেই যায় সেখানেই ওর চারপাশের সবাই উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে, ওর সৌন্দর্যের সুধা পান করতে চায় প্রাণ ভরে। সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপারটা হলো, অন্য মেয়েদের মাঝে কখনো সেরেনাকে নিয়ে হিংসার চিহ্নমাত্র দেখা যায় না। তাদের কেউই যেন সেরেনার সাথে পাল্লা দেওয়ার কথা চিন্তাও করতে পারে না; সেরেনার সৌন্দর্য যেন ধূমকেতুর মতোই সবার ধরাছোঁয়ার বাইরে। মেয়েরা বরং নিজেদের মাঝে সেরেনাকে নারীসুলভ সৌন্দর্যের উৎকৃষ্ট নিদর্শন বলে ধরে নেয়, ওকে নিয়ে গর্ব করে। সেরেনার মোহনীয়তা মেয়েদের সবার মাঝে প্রতিফলিত হয়, আর এ জন্যই তারা ওকে আরো বেশি ভালোবাসে।
এভাবেই রাজকীয় বিবাহের সব আয়োজন শুরু হলো। বিয়ের দিন যত কাছে ঘনিয়ে এলো অতিথিদের উত্তেজনার পারদও তত চড়তে লাগল। আনন্দমুখর পরিবেশে অপেক্ষা করতে লাগল সবাই। মনে হতে লাগল যেন প্রকৃতিও এই অনুষ্ঠানের গুরুত্ব বুঝতে পেরেছে, তাই অনুষ্ঠান যাতে সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয় সে জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। বৃষ্টি হতে লাগল; কিন্তু শুধু রাতের বেলা। ছাদের ওপর বৃষ্টির সেই শব্দ শুনলেই ভালো হয়ে যায় মন। ভোর হওয়ার সাথে সাথে পরিষ্কার হয়ে যেতে লাগল আকাশ, সমস্ত দিন বিরাজ করতে লাগল সূর্যের কোমল আলো। দক্ষিণ দিক থেকে মৃদুমন্দ বাতাস বইতে লাগল। পানিতে হালকা ঢেউ উঠতে লাগল সেই বাতাসে, এবং শেষ অতিথিদের জাহাজগুলোও ধীরে ধীরে এসে ভিড়ল গিথিয়ন বন্দরে।
উৎসবমুখর এই পরিবেশে এখন শুধু একটাই আশঙ্কা কালো মেঘের মতো জমে আছে মাথার ওপর। সেটা হলো ফারাও উটেরিকের চরদের দ্বারা মেমননকে গিথিয়ন বন্দর থেকে চুরি করে নিয়ে যাওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা। এর ফলে যুবরাজ রামেসিস এবং তার হবু স্ত্রীর ওপর বিপদের আশঙ্কা কেউ অস্বীকার করতে পারছে না।
ইতোমধ্যে সভ্য পৃথিবীর সবাই জেনে গেছে যে ফারাও উটেরিক এক বদ্ধ উন্মাদ, যার হাতের মুঠোয় রয়েছে এক শক্তিশালী সেনাদল ও নৌবাহিনী। সবাই এটাও বুঝতে পারছে যে, সামান্য কোনো ছুতো পেলেই এগুলো ব্যবহারে কোনো দ্বিধা করবে না সে।
যদিও রাজা হুরোতাস তার মেয়েকে সত্যিই অনেক ভালোবাসে এবং বিয়ের এই উৎসব শুধু তার সম্মানেই আয়োজন করা হচ্ছে; তবু এই সময়ে রাষ্ট্রীয় দায়িত্বগুলো এগিয়ে রাখার সুযোগটাকেও অবহেলা করল না সে। প্রতিদিন দুপুরে তার মন্ত্রণাকক্ষে বন্ধ দরজার ওপাশে গোপন অধিবেশনের আয়োজন করতে লাগল হুরোতাস, যেখানে উপস্থিত থাকল ল্যাসিডিমনে আগত সকল করদ রাজা এবং গোত্রপ্রধান। ইচ্ছে করেই দিনের এই সময়টা বেছে নেওয়া হয়েছে অধিবেশনের জন্য। কারণ দিনের শেষ দিকে অর্থাৎ বিকেল থেকে যখন উৎসবের নানা আয়োজন শুরু হয় সেইসাথে সবাই গলায় ঢালে রাজা হুরোতাসের আঙুর বাগান থেকে তৈরি করা উৎকৃষ্ট মদ, তখন আসলে রাষ্ট্রীয় প্রতিরক্ষার ব্যাপারগুলো আলোচনা করার সময় নয়।
