রাজা হুরোতাস এবং রানি তেহুতির আমন্ত্রণে আনন্দ উৎসবে যোগ দিতে আসছে তাদের মোলোজন করদ রাজা এবং তাদের পরিবার। উপরোক্ত কাজগুলোর দেখাশোনার সাথে সাথে তাদের উপযুক্ত বাসস্থান নির্মাণের তদারকিও করতে হবে আমাকে।
হুরোতাসের সাথে এসব রাজাদের সম্পর্কটা একটু বুঝিয়ে বলা দরকার। প্রায় ত্রিশ বছর আগে ক্রিট থেকে তেহুতিকে নিয়ে পালানোর পর হুয়োতাস পৃথিবীর বুকে এক টুকরো জায়গা খুঁজছিল, যেখানে সে রাজ্য বিস্তার করতে পারে, হয়ে উঠতে পারে শক্তিশালী। গিথিয়ন বন্দরে প্রথমবারের মতো নোঙর করার পর তৎকালীন রাজা ক্লাইডিসের কাছ থেকে তার রাজ্য দখল করে নেয় সে, বর্তমানে যার নাম ল্যাসিডিমন। কাজটা করার জন্য বেশি পরিশ্রম করতে হয়নি তাকে, স্রেফ রাজার অসন্তুষ্ট প্রজাদের বিদ্রোহ করতে উৎসাহ দিয়েছে, তারপর হুরোতাস নদীর তীরে তিন দিন ধরে চলা এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে পরাজিত করেছে রাজাকে।
রাজ্যের উত্তরে আরো তিনটি রাজ্যের রাজাদের নিজের মিত্র হিসেবে পেয়েছিল ক্লাইডিস। তারা তিনজনই যুদ্ধে ক্লাইডিসের পক্ষে লড়তে গিয়ে মৃত্যুবরণ করে। তবে তাদের বড় ছেলেরা নতুন রাজা হুরোতাসের কর্তৃত্ব মেনে নেয়। তবে তাদের মৃত্যুদণ্ড দেয়নি হুরোতাস, অথচ সেটাই ছিল স্বাভাবিক। তার বদলে তিনজনের কাছ থেকে আনুগত্যের শপথ দাবি করে সে। বলা বাহুল্য, তিনজনই অত্যন্ত আগ্রহের সাথে সেই প্রস্তাব মেনে নেয়, কারণ তারা ভেবেছিল মরণই তাদের কপালে লেখা আছে। তারপর তাদের ট্যাগেটাস পর্বতমালার অপর পাশে নিজ নিজ রাজ্যে ফিরে যেতে অনুমতি দেয় হুরোতাস। রাজ্যগুলো ইতোমধ্যে তার দখল চলে এলেও তিন পুত্রকে স্বাধীনভাবে রাজ্য চালানোর অনুমতি দেয় সে, নিজের জন্য রাখে কেবল ক্লাইডিসের রাজ্যটুকু।
স্বাভাবিকভাবেই এরপর আজীবন নিজ নিজ রাজ্যের আয় থেকে বেশ বড় অঙ্কের একটা অংশ হুরোতাসকে দিতে আগ্রহী হয় সেই তিনজন। তাদের উত্তরাধিকারীদের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম চালু করা হয়। এমন এক ব্যবস্থা, যাতে সবাই লাভবান হচ্ছে, কেউ বেশি আর কেউ একটু কম- এই যা।
তিন রাজাকে তাদের জীবন এবং রাজ্য দুটোই নিজেদের দখলে রাখার অনুমতি দেয় হুরোতাস। ওদিকে তার নিজেরও তিন-তিনটে রাজ্যের অসংখ্য বর্বর গোত্রের অধিবাসীকে সামলানোর ঝামেলায় যাওয়া লাগছে না, যাদের আনুগত্য বা আত্মসমর্পণের অর্থ সম্পর্কে কোনো ধারণাই নেই। পরবর্তী বছরগুলোতে আশপাশের দ্বীপগুলোর মোলোজন রাজার সবাই হুরোতাসের আধিপত্য মেনে নেয় একই শর্তে: হয় আনুগত্য না হয় মৃত্যু। একমাত্র হুরোতাসই সবগুলো গোত্রের প্রধানকে একই হাতের শাসনের নিচে রাখার মতো বুদ্ধি এবং যোগ্যতা রাখে। সবাইকে শাসন করার জন্য যদি সে না থাকত তাহলে পরস্পরের মাঝে চিরন্তন বিবাদে লিপ্ত থাকত রাজ্যগুলো। তবে এখন তাদের নিজেদের মাঝে কিছুটা ঠাণ্ডা সম্পর্ক বিদ্যমান থাকলেও কেউ যুদ্ধে নামতে সাহস পায় না। আর হুরোতাসের প্রতি তাদের সম্মান এবং ভয়ের পরিমাণ এত বেশি যে, তার কোনো নির্দেশ কখনো অমান্য করার কথা চিন্তাও করে না কেউ। এবং একই সাথে নির্দিষ্ট তারিখের অনেক আগেই তার প্রাপ্য কর দিয়ে দেয় সবাই।
এবং এরই ধারাবাহিকতায় আজ তিন দশকেরও বেশি সময় পর হুরোতাস তার ষোলোজন করদ রাজাকে অথবা তাদের উত্তরাধিকারীকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে তার মেয়ের বিয়েতে। আর আমার দায়িত্ব পড়েছে এই সব ঝামেলা সামলানোর।
শোমু ঋতু শুরু হওয়ার ঠিক ত্রিশ দিন আগেই সব কিছু প্রস্তুত করে রাখতে হবে। নীলনদের পানি যখন কমে যায় এবং আমাদের মিশরে গ্রীষ্মকাল নেমে আসে সেই সময়কে বলা হয় শোমু। ল্যাসিডিমন আলাদা একটি রাজ্য হলেও এখানে এখনো যথাযথভাবে মিশরের দিনপঞ্জি মেনে চলা হয়, কারণ হুরোতাস আর তার স্ত্রী তেহুতির জন্ম সেখানেই। এ ছাড়া তাদের মাতৃভাষাও মিশরীয়। বিয়ের কনের লাল চাঁদ শেষ হওয়ার দিনটি খুব সাবধানতার সাথে হিসাব করার পর তার সাথে আরো দশ দিন যোগ করেছে রাজকুমারী সেরেনা এবং রানি তেহুতি। কনে যেন বিয়ের প্রথম রাতেই স্বামীকে বিছানায় সঠিকভাবে স্বাগতম জানাতে পারে সেটা নিশ্চিত করার জন্যই এই আয়োজন। এই হিসাবে শোমুর প্রথম দিনকে বিয়ের দিন হিসেবে ঠিক করা হয়েছে।
এর অর্থ হচ্ছে শোমুর আগের মাস থেকেই বিয়ের অতিথিরা সবাই এসে পৌঁছতে শুরু করবে এবং উৎসবও তখন থেকেই শুরু হবে। সেই মাসটার নাম হচ্ছে রেনওয়েত, নীলনদে বেশি পানি থাকার শেষ মাস।
চাবুক খাওয়া ক্রীতদাসের মতো খেটে চললাম আমরা সবাই, কারণ হাতে সময় খুব কম। তার ওপর আবার আমার দুই প্রিয় নারী তেহুতি এবং সেরেনার মাথায় কিছুক্ষণ পরপরই অতিথিদের আপ্যায়নের জন্য নতুন নতুন সব বুদ্ধি আসছে, এবং প্রতিটি বুদ্ধিই তার আগেরটার চাইতে বেশি জটিল এবং কঠিন।
আমরা তো জানি, এসব করতে তোমার কোনো কষ্টই হবে না, টাটা। তুমি তো বুদ্ধিতে সবার সেরা। তুমি পারবে না এমন কোনো কাজ নেই। আমাকে নিরাশ করবে না তুমি, আমি জানি। হাজার হোক সেরেনার বিয়ের অনুষ্ঠান বলে কথা, প্রতিবার নতুন আবদার নিয়ে আসার পর আমার গালে চুমু খেয়ে এই কথা বলে সান্ত্বনা দিচ্ছে তেহুতি।
