আমাদের কাছে খাবার বা পানি কিছুই নেই, অনুনয় জানাল পানমাসি। ক্ষুধা তৃষ্ণায় মারা যাব আমরা সবাই। দয়া করো, হে টাইটা। তোমার কাছে ভিক্ষা চাইছি আমি।
তোমাকে বড়জোর কিছু উপদেশ দিতে পারি আমি। কিন্তু খাবার এবং পানি দেওয়া সম্ভব নয়, কারণ ওগুলোর দাম বেশি, আর আমাদের কাছে খুব অল্প পরিমাণেই আছে। তবে প্রস্রাব ঠাণ্ডা করে রাখতে পারো। ওভাবে খেতে অনেক বেশি ভালো লাগে, বন্ধুত্বপূর্ণ গলায় তাকে বললাম আমি। চব্বিশ ঘণ্টার সময় দেওয়া হচ্ছে তোমাদের। তার পরই তোমাদের উৎসাহ দেওয়ার জন্য একটা রণতরী পাঠিয়ে দেব আমি। বিদায়, পানমাসি। মিশরে পৌঁছানোর পর ফারাও উটেরিককে আমার শুভেচ্ছা জানিও- অবশ্য যদি কোনো দিন পৌঁছতে পারো আর কি। এই বলে আমার লোকদের উদ্দেশ্যে মাথা ঝাঁকালাম আমি। এতক্ষণ বন্দিদের পাহারা দিচ্ছিল ওরা, আমার ইশারা পেয়ে এবার ঘোড়া থেকে নেমে নৌকাটাকে সৈকত থেকে সাগরে ঠেলে নামানোর প্রস্তুতি নিতে লাগল। কিন্তু সেই মুহূর্তে একটা সুরেলা গলার চিৎকারে থমকে দাঁড়াতে বাধ্য হলো তারা।
দাঁড়াও টাইটা! এখনই যেতে দিও না ওদের! একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘুরে দাঁড়ালাম আমি। দেখলাম ল্যাসিডিমনের রাজকুমারী সেরেনা এগিয়ে আসছে আমার দিকে। তার পেছনে রয়েছে ছয়টা মালবাহী ঘোড়া, প্রত্যেকটার পিঠে বোঝাই খাবারের ঝুড়ি আর পানির মশক। জঙ্গলের মাঝ থেকে বেরিয়ে সৈকতের বালি পেরিয়ে এদিকেই আসছে তারা। ওদের কি খাবার বা পানির দরকার হবে না, বোকা কোথাকার? কাছে এসে আমাকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠল ও। মিশরে পৌঁছানোর আগেই তো খিদে তেষ্টায় মারা যেত সবাই!
আমি তো সেটাই আশা করছিলাম, বিড়বিড় করে বললাম আমি। কথাটা শুনেও না শোনার ভান করল সেরেনা। পরিস্থিতি আরো বিব্রতকর হয়ে উঠল যখন দেখলাম খাবার আর পানি ছাড়াও হুরোতাসের ভাড়ার থেকে বড় বড় দুই মশক ভর্তি সবচেয়ে ভালো লাল মদও নিয়ে এসেছে ও। আমার কাছে এটা একেবারেই বোকামি বলে মনে হলো।
তাড়াতাড়ি এগিয়ে এসে সেরেনার পায়ের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ল পানমাসি, তার সৌন্দর্য, মহানুভবতা আর দয়ার প্রশংসা করতে লাগল প্রাণ খুলে। সকল দেবতার আশীর্বাদ কামনা করল সে সেরেনার ওপর। কিন্তু ব্যাটা চোখের কোণ দিয়ে সেরেনার দিকে কীভাবে তাকাচ্ছে সেটা আমার চোখ এড়াল না, এবং বেশ অস্বস্তিতে পড়ে গেলাম আমি। এগিয়ে গিয়ে দড়াম করে পানমাসির দুই নিতম্বের মাঝ বরাবর একটা লাথি কষলাম। উল্টে পড়ে গেল লোকটা। বললাম, এবার ভাগ এখান থেকে, ব্যাটা ধাড়ি ছুঁচো কোথাকার। আর কখনো যেন এই দিকে না দেখি তোকে, তাহলে মাটিতে পুঁতে রেখে দেব। চিরকাল তখন এখানেই থাকতে হবে তোকে!
পাছা ডলতে ডলতে তাড়াতাড়ি নৌকার দিকে ফিরে গেল পানমাসি, চিৎকার করে গালাগালি করছে নিজের লোকদের। দ্রুত দাঁড় বাইতে শুরু করল লোকগুলো, তারপর প্রবালপ্রাচীর পার হয়েই পাল খাটাল নৌকায়। দক্ষিণ দিকে ভেসে চলল তাদের নৌকায়। পানমাসি আর আমি পরস্পরের দিকে তাকিয়েই রইলাম, যতক্ষণ না দূরত্বটা অনেক বেশি হয়ে দাঁড়াল, তারপর ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে প্রিয় রাজকুমারীকে নিয়ে দুর্গ-প্রাসাদে ফিরে এলাম আমি। কেন যেন আমার মনে হতে লাগল ওই ধূর্ত শয়তানটার সাথে এটাই আমার শেষ দেখা নয়, আবারও ওর মুখোমুখি হতে হবে আমাকে।
পরবর্তী দিনগুলোর ব্যস্ততা আর আনন্দও আমার মন থেকে এই আশঙ্কা পুরোপুরি মুছে ফেলতে ব্যর্থ হলো। বেশ কয়েকবার সেরেনাকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভেঙে ফেলতে মন চাইল আমার, ইচ্ছে করল মেমননকে নিয়ে ধাওয়া করি পানমাসির পেছনে, সব ঝামেলা চুকিয়ে দিয়ে আসি। আমি জানি, ইচ্ছে করলে রামেসিসকে আমার সাথে যাওয়ার জন্য রাজি করাতে পারব। কিন্তু প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করার অর্থ হচ্ছে নিজের সম্মানকে বিনষ্ট করা। আমার মুখ দিয়ে একবার যে কথা বের হয় তাকে আমি পবিত্র বলে গণ্য করি।
এখন যখন চিন্তা করি যে ওই একবার যদি আমার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করতাম তাহলে হয়তো সহস্র সাহসী এবং সম্মানিত মানুষের জীবন বেঁচে যেত। সেইসাথে প্রচণ্ড দুশ্চিন্তা আর কষ্ট থেকে বেঁচে যেত আমার কাছের প্রিয় মানুষগুলো। কিন্তু এই চিন্তাতে খুব সামান্যই সান্ত্বনা মেলে।
*
মিশরের যুবরাজ রামেসিস এবং স্পার্টার রাজকুমারী সেরেনার বিয়ের অনুষ্ঠান আয়োজনের প্রায় সম্পূর্ণ দায়িত্ব পড়ল আমারই ঘাড়ে। যার অর্থ হচ্ছে যদি সব কিছু ঠিকভাবে ভালায় ভালোয় শেষ হয় তবে তার সম্পূর্ণ প্রশংসা পাবে স্পার্টার রাজা হুরোতাস এবং রানি তেহুতি। আর যদি কোনো কারণে কোনো বিপদ দুর্যোগ বা ঝামেলা এসে হাজির হয় তাহলে অভিযোগের সবগুলো আঙুল সাথে সাথে তাক করা হবে আমার দিকে।
বিয়ের আসল অনুষ্ঠানের আগে এক মাস ধরে চলবে বিবাহপূর্ব উৎসবের বহর। এবং তার পরের এক মাস চলবে বিবাহ-পরবর্তী উৎসব। রানি তেহুতির অনুরোধ অনুসারে এই সব অনুষ্ঠানই উৎসর্গ করা হবে দেবতা অ্যাপোলোর নামে, যিনি উর্বরতা বা বহু সন্তান জন্মদানের দেবতা, যদিও তার অন্যান্য গুণের মাঝে অবিশ্বস্ততাও রয়েছে।
এই অনুষ্ঠানের মধ্যে প্রধান অংশ হিসেবে থাকবে ভোজ এবং আনন্দ উৎসব, দেড় শ প্রধান প্রধান দেবতা এবং দেবীর পুজো, রথের দৌড় এবং নৌকাবাইচ, নাচগান, প্রচুর পরিমাণে মদপান, কুস্তি; গান, বক্তৃতা এবং ধনুর্বিদ্যার প্রতিযোগিতা, ঘোড়দৌড় ইত্যাদি। সবগুলো অনুষ্ঠান এবং প্রতিযোগিতাতেই থাকবে বিজয়ীদের জন্য সোনা এবং রুপোর প্রচুর পরিমাণে পুরস্কারের ব্যবস্থা।
