রায় শোনার জন্য সকল বন্দিকে উঠে দাঁড়াতে নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে, বলল সে। অপরাধীরা সবাই উঠে দাঁড়াল, তবে এখনো সবার চোখ মাটির দিকে। আমার ধারণা হুরোতাসের মুখ থেকে উচ্চারিত হওয়ার আগেই তাদের কী শাস্তি হতে যাচ্ছে এ সম্পর্কে নিঃসন্দেহ হয়ে গেছে সবাই।
আজ থেকে ষাট দিন পর আমার মেয়ে সেরেনার সাথে বিয়ে হতে যাচ্ছে মিশরের রাজপরিবারের সদস্য যুবরাজ রামেসিসের। সেই আনন্দঘন উৎসবের দিনে আমার মেয়ের সুখ-শান্তিকে নিশ্চিত করার জন্য বিবাহ এবং বৈবাহিক সম্পর্কের অভিভাবক দেবী হেরার নামে এই ষোলোজন বন্দিকে উৎসর্গ করা হবে। প্রথমে মাছ ধরার বড়শির সাহায্যে বন্দিদের নাড়িভুড়ি তাদের পেছন দিক থেকে বের করে আনা হবে। তারপর তাদের শিরচ্ছেদ করা হবে। সব শেষে তাদের মৃতদেহকে আগুনে পুড়িয়ে সেই ছাই ভাটার সময় সমুদ্রের পানিতে ছুঁড়ে দেওয়া হবে। এই সময় দেবী হেরার পূজারিনিরা আমার মেয়ের ভবিষ্যৎ সুখ কামনা করে প্রার্থনা সংগীত গাইবে হেরাকে উদ্দেশ্য করে।
রাজা হুরোতাসের রায়ে সন্তুষ্ট হয়ে মাথা ঝাঁকালাম আমি। অপরাধীদের অপরাধের মাত্রা বিচার করলে কোনো সন্দেহ নেই যে সঠিক শাস্তিই দেওয়া হয়েছে তাদের।
না!
জোর গলায় বলে ওঠা কথাটা শুনে সবাই চমকে উঠল, এমনকি আমি এবং রাজা হুরোতাসও। সবগুলো মাথা একই সাথে ঘুরে গেল রাজকুমারী সেরেনার দিকে, সবার মুখে একই রকম হতচকিত ভাব। ওদিকে সেরেনা তখন তার বাবার বিরোধিতা করতে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে।
না! আবার বলে উঠল ও। এক শ বার না!
এই অভাবনীয় আক্রমণের মুখোমুখি হওয়ার পর সম্ভবত সবার আগে হুরোতাসই প্রাথমিক চমকটা কাটিয়ে উঠল। সেরেনা তার একমাত্র সন্তানই শুধু নয়, বরং একমাত্র দুর্বলতাও বটে। না কেন প্রিয় কন্যা আমার? প্রশ্ন করল সে। আমি ঠিকই বুঝতে পারলাম নিজের মেজাজকে সামলে রাখতে বেশ কষ্ট করতে হচ্ছে তাকে। এই কাজ তো আমি তোমার সুখ নিশ্চিত করার জন্যই করছি।
আমি তোমাকে অত্যন্ত ভালোবাসি বাবা। কিন্তু এক সারিতে শুইয়ে রাখা ষোলোটা মাথাবিহীন লাশ দিয়ে আমাকে সুখী করা যাবে, এমনটা ভাবলে ভুল ভেবেছ তুমি।
ওদিকে প্রাঙ্গণে উপস্থিত আর সবার মতোই পানমাসি আর তার লোকেরাও প্রথমবারের মতো মাথা তুলে সোজা হয়ে দাঁড়িয়েছে, তাকিয়ে আছে রাজকুমারীর দিকে। এবার তাদের চেহারায় আশার আলো ফুটতে দেখলাম আমি। কিন্তু তার চাইতেও বেশি স্পষ্ট হয়ে যেটা ফুটেছে সেটা হলো সেরেনার সৌন্দর্য দেখে তাদের অবিশ্বাস মেশানো বিস্ময়। তার ওপর এখন প্রচণ্ড উত্তেজিত হয়ে আছে সেরেনা, ফলে তার টুকটুকে লাল গাল জ্বলজ্বলে চোখ আর ঈষৎ কাঁপতে থাকা সুন্দর ঠোঁট জোড়া- এগুলোকে যেন আরো বেশি সুন্দর লাগছে। ওর কণ্ঠস্বর যেন কোনো স্বর্গীয় বাদ্যযন্ত্রের সুমধুর বাজনা, সম্মোহিত করে রেখেছে শ্রোতাদের। এমনকি ওর কণ্ঠস্বর শুনে অভ্যস্ত আমিও যেন বিমোহিত হয়ে পড়েছি।
তাহলে এই দস্যুদের নিয়ে কী করা উচিত বলে তোমার মনে হয়? হতাশামাখা গলায় প্রশ্ন করল হুরোতাস। ইচ্ছে করলে ওদেরকে রণতরীর দাঁড় বাওয়ার কাজে লাগিয়ে দিতে পারি আমি, অথবা তামার খনিতে পাঠাতে পারি শ্রমিক হিসেবে…
মিশরে ওদের স্ত্রী এবং পরিবারের কাছে পাঠিয়ে দাও সবাইকে, তাকে বাধা দিয়ে বলে উঠল সেরেনা। যদি তুমি দয়াপরবশ হয়ে এই কাজটুকু করো তাহলে অনেক মানুষ খুশি হবে। এবং আমিও আমার বিয়ের দিনে সুখী হব, বাবা।
কিছু একটা বলার জন্য মুখ খুলল হুরোতাস। দেখলাম রাগে জ্বলে উঠল তার চোখ জোড়া। তার পরেই হঠাৎ মুখ বন্ধ করে ফেলল সে। উভয় সংকটে পড়লে তা থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য অনেকেই যে কাজটা করে হুরোতাসও সেই একই কাজ করল। অসহায় চোখে আমার দিকে তাকাল সে। হা হা করে হেসে উঠতে ইচ্ছে করল আমার। যুদ্ধের ময়দানে অভিজ্ঞ সেনানীকে সামান্য এক তরুণীর হাতে নাস্তানাবুদ হতে দেখলে হাসি পাওয়ারই কথা।
বহুদিন আগেই আমি হুরোতাসকে ঠোঁটের নড়াচড়া দেখে কথা পড়তে শিখিয়েছিলাম। এবার নিঃশব্দে দুটো শব্দ উচ্চারণ করল আমার ঠোঁট। মেনে নাও! ওকে উপদেশ দিলাম আমি।
গম্ভীর চেহারায় সেরেনার দিকে ফিরল হুরোতাস। এটা কিন্তু একেবারেই বোকামি, কড়া গলায় মেয়েকে উদ্দেশ্য করে বলল সে। আমি আর এ ব্যাপারে কিছু বলতে চাই না। এই দস্যুদেরকে তোমার বিয়ের উপহারের অংশ হিসেবে দান করা হলো। এবার তুমি ওদের নিয়ে যা খুশি তাই করতে পারো।
দ্বীপের অন্য প্রান্তে সৈকতের কাছাকাছি খোঁজাখুঁজি করতেই সেই ছোট্ট মাছ ধরার নৌকাটা পাওয়া গেল, যাতে করে নীলনদের মুখ থেকে এ পর্যন্ত এসেছিল পানমাসি আর তার লোকেরা। নৌকাটা টেনে তীরে উঠিয়ে শুকনো পাতা আর শেওলা দিয়ে ঢেকে রেখেছিল তারা। নৌকাটা দেখতে যেমন নড়বড়ে মনে হয় আদতে নিশ্চয়ই তার চাইতে অনেক বেশি শক্তিশালী। তা না হলে এত অল্প সময়ে এতগুলো লোক নিয়ে এই দূরের পথ পাড়ি দিতে পারত না। রাজকুমারী সেরেনার ইচ্ছে অনুযায়ী আমার লোকেরা পানমাসি এবং তার অবশিষ্ট সঙ্গীদের নৌকায় তুলে দিল। তবে অস্ত্র বা খাবারদাবার কিছুই দেওয়া হলো না তাদের। এবার দক্ষিণ দিকে নীলনদের অববাহিকা বরাবর আঙুল তুলে দেখিয়ে দিলাম আমি।
