এর সাথে সাথে বন্দরের ওপর বেশ কিছু পানির পিপা আর মালভর্তি বাক্সও রেখেছিলাম আমি, যেন সকালবেলা আলো ফোঁটার সাথে সাথেই সেগুলো জাহাজে ওঠানোর কাজ শুরু হবে। এর পেছনে লুকিয়ে বসে ছিল আমাদের তীরন্দাজ আর বর্শাধারী সৈনিকরা। ছায়ামূর্তিগুলোর সামনে তাদের দলনেতা পানমাসিকে চিনতে পারল আমার চোখ। তবে তারা সবাই একেবারে খোলা জায়গায়, জাহাজের সিঁড়ির সামনে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম আমি। যেই দেখলাম ওদের, ওরা এখন যথেষ্ট সামনে চলে এসেছে এবং আমাদের দিকে পেছন ফিরে আছে সাথে সাথে আক্রমণের নির্দেশ দিলাম সৈন্যদের। পিপা আর বাক্সগুলোর পেছনে লুকানোর জায়গা থেকে লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল সবাই। প্রত্যেকে ধনুকে একটা করে তীর জুড়ে ফেলেছে, এবার একই সাথে ছোঁড়া হলো সেগুলো। এত কাছ থেকে লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়ার কোনো সুযোগই নেই, প্রায় প্রতিটা তীরই শত্রুদের দেহে গিয়ে বিঁধল। ব্যথা আর আতঙ্কের চিৎকারে ভরে গেল চারদিক। প্রথম ধাক্কাতেই পানমাসির দলের প্রায় অর্ধেক লোক ভূপাতিত হলো। বাকিরা এবার ঘুরে দাঁড়াল আমাদের মুখোমুখি হতে। কিন্তু ওদেরকে চমকে দেওয়ার সুযোগটা খুব ভালোভাবেই নিতে পেরেছি। আমরা। প্রায় সাথে সাথেই শেষ হয়ে গেল যুদ্ধ। শত্রুদের যারা বেঁচে গেল তারা অস্ত্র ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল মাটিতে, দুই হাত ওপরে তুলে হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে প্রাণভিক্ষা চাইতে শুরু করল। আক্রমণকারীদের সংখ্যা ছিল পঁচিশজন। তীরের আঘাত থেকে বাঁচতে পেরেছে মাত্র ষোলোজন। পানমাসিও বেঁচে যাওয়া লোকগুলোর মাঝে রয়েছে দেখে খুশি হলাম আমি। লোকটার উদ্ধত সাহস এবং বিশ্বাসঘাতকতার জন্য ওকে চরম শাস্তি দিতে চাই আমি। কিন্তু তখনো জানি না যে সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত একটা দিক থেকে আমার এই ইচ্ছে ভেস্তে যাবে পুরোপুরি।
*
বন্দিদের বাঁধার জন্য ক্রীতদাসদের শিকল নিয়ে এলো রামেসিসের লোকেরা। প্রথমে সবার অন্তর্বাস বাদে আর সব পোশাক খুলে ফেলা হলো। তারপর হাতগুলো বাঁধা হলো পিছমোড়া করে, গোড়ালিতেও বেঁধে দেওয়া হলো শিকল। ফলে ছোট ছোট পদক্ষেপে হাঁটা ছাড়া সামনে এগোনোর কোনো উপায় থাকল না কারো। তারপর আবর্জনা ফেলার দুটো বড় গাড়িতে তোলা হলো সবাইকে। একদল ষাড়ের সাহায্যে গাড়ি দুটো নিয়ে যাওয়া হলো দুর্গে।
দস্যুদের ধরা পড়ার খবর জানানোর জন্য কয়েকজনকে আগেই পাঠিয়ে দিলাম আমি। ফলে আমাদের এগোনোর পথের দুই পাশে ভিড় করে দাঁড়িয়ে গেল জনতা, বন্দিদের গায়ে ছুঁড়ে মারতে লাগল কাদামাটি আর বিষ্ঠার দলা। অপরাধীদের কপালে এখন অপেক্ষা করছে বন্দিদশা, কঠোর বিচার এবং নিঃসন্দেহে নিষ্ঠুর শাস্তি।
তিন দিন পর দুর্গের প্রাঙ্গণে বন্দিদের বিচারে বসল রাজা হুরোতাস। অবশ্য বিচার করার মতো তেমন কিছু নেই, কারণ রায় কী হবে তা মোটামুটি সবাই আগে থেকেই জানে। তার পরও বিচার অনুষ্ঠান দেখার জন্য দর্শকের অভাব হলো না। সেই দর্শকদের মাঝে রানি তেহুতি এবং রাজকুমারী সেরেনাও থাকল। মায়ের পায়ের কাছে একটা আসনের ওপর বসল সে।
বিচারে সাক্ষ্য দিলাম আমি এবং বন্দিদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলোর বিরুদ্ধে সাজিয়ে-গুছিয়ে সমস্ত তথ্যপ্রমাণ হাজির করলাম। পানমাসি এবং তার দলের গুণ্ডাগুলোকে শাস্তি দেওয়ার জন্য এটাই যথেষ্ট হলো। ইচ্ছে করলে এগুলো ছাড়াই বিচারের রায় ঘোষণা করতে পারত রাজা হুরোতাস; কিন্তু সে আসলেই একজন দয়ালু মানুষ।
এই দস্যুদলের সবার জন্য শাস্তির বিধান ঘোষণা করা হবে এখন। তার আগে তাদের দলনেতার যদি কিছু বলার থাকে তবে বলতে পারে, ঘোষণা করল সে।
এতক্ষণ ধরে সিংহাসনের সামনে মাটিতে কপাল ঠেকিয়ে উবু হয়ে বসে ছিল পানমাসি। তার লোকেরাও সবাই একই অবস্থানে বসে ছিল। এবার সে উঠে দাঁড়াল। ইতোমধ্যে আমি বলেছি মহা ধূর্ত এক মানুষ সে। কিন্তু এবার সে যে তুখোড় অভিনয় শুরু করল তাতে এমনকি আমি নিজেও অবাক হয়ে গেলাম। প্রথমেই চেহারায় প্রচণ্ড দুঃখ এবং আফসোসের ভাব ফুটিয়ে তুলল সে, যেন নিজের অপরাধার জন্য সত্যিই অনুতপ্ত। খোঁড়া পা ইচ্ছে করেই অনেক বেশি টেনে টেন হাঁটছে, নিঃসন্দেহে উপস্থিত সবার সহানুভূতি কাড়ার জন্য। গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে ময়লা আর অশ্রু থুতনিতে এসে জমা হয়ে ফোঁটায় ফোঁটায় ঝরে পড়ছে নিচে। কাঁপা গলায় মিশরে নিজের ফেলে আসা পরিবারের বর্ণনা দিতে শুরু করল সে। তিন স্ত্রীর কথা বলল, যাদের প্রত্যেকেই গর্ভবতী। বারোটা সন্তান আছে তার, তাদের মাঝে একজন আবার পঙ্গু একটা মেয়ে, যাকে সে অত্যন্ত ভালোবাসে। সে না থাকলে সবাই না খেয়ে মরবে। কথাগুলো এমনই অবিশ্বাস্য যে, অনেক কষ্টে হাসি চেপে রাখলাম আমি। পানমাসি যে লুক্সরের বুকে অন্তত চারটি পতিতালয়ের মালিক, এ কথা নিশ্চিতভাবে জানা আছে আমার। এবং এটাও জানি যে, ওগুলোর সেরা খদ্দের সে নিজেই। শুধু বউদের আর্তনাদ শুনে মজা পাওয়ার জন্যই ওদের ধরে ধরে পেটায় সে। আর তার মেয়েটা পঙ্গু হয়েছে, কারণ সে ভালো করে হাঁটতে শেখার আগেই একবার তার মাথায় কোদাল দিয়ে বাড়ি মেরেছিল পানমাসি। সে যখন এই আবেগঘন বক্তৃতার শেষ পর্যায়ে চলে এলো তখন আমার মতামত জানার জন্য আমার দিকে তাকাল রাজা হুরোতাস। মাথা নাড়লাম আমি। আমার আর তার প্রায় একই রকম, এটা বুঝতে পেরে সন্তুষ্ট হয়ে মাথা ঝাঁকাল হুরোতাস।
