ওয়েনেগের কাছ থেকে আরো জানা গেল, লুক্সর থেকে ভাটিতে নীলনদের বুকে একটা দ্বীপে নিজের জন্য এক বিশাল মন্দির নির্মাণ করছে ফারাও উটেরিক বুবাস্টিস। এই বিশাল কর্মযজ্ঞে সেই দশ লাখ রৌপ্যখণ্ডের প্রায় পুরোটাই খরচ করছে সে, যেগুলো মেসি বিজয়ের পর খামুদির কাছ থেকে তাকে এনে দিয়েছিলাম আমি।
এর অল্প সময় পরেই জানা গেল গিথিয়ন বন্দরে মেমনন নামের সেই রণতরীর অবস্থানের কথা জেনে গেছে ফারাও উটেরিক বুবাস্টিসের গুপ্তচররা, যাতে করে মিশর থেকে পালিয়ে এসেছিলাম আমি আর রামেসিস। ওয়েনেগ জানিয়েছে ফারাওয়ের নৌ সেনাপতিদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে জাহাজটিকে পুনরুদ্ধার করে লুক্সরে ফিরিয়ে আনতে। তাদের ওপর আরো নির্দেশ আছে জাহাজ নিয়ে ফিরে আসার সময় তাতে যেন বিশ্বাসঘাতক টাইটাও উপস্থিত থাকে। শিকলে বেঁধে নিয়ে আসতে হবে তাকে। আমার মাথার ওপর পঞ্চাশ হাজার রৌপ্যখণ্ডের পুরস্কার ঘোষণা করেছে ফারাও। বোঝা যাচ্ছে আমাকে এখনো ভুলে যায়নি সে ক্ষমা করা তো দূরে থাক।
ইদানীং নিজের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়ে বেশ উদাসীন হয়ে পড়েছি আমি। ভেবেছিলাম এই দুর্গে আরাম-আয়েশে দিন কাটিয়ে দিতে পারব, নিরাপত্তার কোনো অসুবিধা হবে না। কিন্তু এই বিশেষ খবরটা শুনে আমার বুকের ভেতর কেঁপে উঠল। এখন পর্যন্ত গিথিয়ন বন্দরের ঠিক মাঝখানে মেমননকে নোঙর করে রাখতে নির্দেশ দিয়েছে রামেসিস, এবং নামে মাত্র কিছু নাবিক রাখা হয়েছে জাহাজে। ফলে জাহাজটা যে কারো চোখেই খুব সহজে ধরা পড়বে। এবার আমার নির্দেশে তাকে বন্দরের প্রাচীরের পাশে নিয়ে আসা হলো এবং পানির নিচে দিয়ে তার খোল বেঁধে রাখা হলো বন্দরের পাথুরে কাঠামোর সাথে। আমার কবজির সমান মোটা দড়ি ব্যবহার করা হলো এই কাজে। প্রতি মুহূর্তে বিশজন সশস্ত্র নাবিক পাহারা দিতে লাগল জাহাজটাকে, এবং প্রতি ছয় ঘণ্টা পর পর তাদের বদল করা হতে লাগল। মেমনন যেখানে নোঙর করা আছে সেখান থেকে মাত্র ত্রিশ কদম দূরে একটা পাথরের বাড়িতে আরো পঞ্চাশজন লোককে মোতায়েন রাখা হলো সব সময়ের জন্য। শত্রুদের কোনো দলকে তীরে উঠতে দেখলেই মুহূর্তের মধ্যে আক্রমণ চালাতে পারবে তারা।
দুই সপ্তাহের মধ্যেই লুক্সরে অবস্থানরত ওয়েনেগের কাছ থেকে আরো একটা পায়রা পেলাম আমি। পাখিটা যে খবর নিয়ে এসেছে তাতে জানা গেল পনেরো থেকে বিশজন লোকের একটা ছোট দল নীলনদের মুখ থেকে সাগর অভিমুখে রওনা দিয়েছে। ছোট একটা মাছ ধরার নৌকা নিয়ে গেছে তারা, যেটা দেখে কিছু সন্দেহ করবে না কেউ। আন্দাজ করলাম মেমননকে দখল করে ফিরিয়ে নিয়ে যেতেই আসছে ওরা। এই অভিযানের দায়িত্বে থাকা লোকটার নাম জানিয়েছে ওয়েনেগ। পানমাসি নামে মহা ধূর্ত এক লোক। রামেসিস এবং আমি দুজনই তাকে আগে দেখেছি। এই মুহূর্তে সে উটেরিকের প্রিয় ব্যক্তিদের একজন। বয়স সবে পঁচিশ; কিন্তু ইতোমধ্যে শক্তপাল্লার লোক বলে খ্যাতি অর্জন করে নিয়েছে। ডান গালে একটা কাটা দাগ, খোঁড়াননা দেখে তাকে চেনা যায়। যুদ্ধে আহত হয়েছিল সে, ফলে ডান পা একটু টেনে টেনে হাঁটতে হয় তাকে।
এর কয়েক দিন পরেই ট্যাগেটাস পর্বতমালায় অবস্থিত পাহারাদারদের মারফত জানা গেল গিথিয়ন উপসাগরে একটা সন্দেহজনক চেহারার মাছ ধরার নৌকা দেখা গেছে। দেখে মনে হচ্ছিল জাল ফেলায় ব্যস্ত; কিন্তু সময়টা তখন প্রায় সন্ধ্যা এবং দূরত্বটা অনেক বেশি হওয়ায় নিশ্চিতভাবে কিছু বোঝা যায়নি। দুর্গে বসে এই খবর শোনার সাথে সাথেই আমি আর রামেসিস ঘোড়া নিয়ে পূর্ণ গতিতে বন্দরে এসে পৌঁছলাম। মেমননের পাহারায় নিয়োজিত লোকগুলো জানাল সব ঠিকই আছে। তার পরও ওদের সম্পূর্ণ সতর্ক থাকতে নির্দেশ দিলাম আমি। তারপর নিজেরাও নির্দিষ্ট অবস্থানে চলে এলাম, অপেক্ষা করতে লাগলাম এরপর কী ঘটে দেখার জন্য। আমি প্রায় নিশ্চিত যে মেমননকে দখল করার জন্য ভোরের ঠিক আগের সময়টা বেছে নেবে পানমাসি, কারণ সে আশা করবে যে ওই সময়টাতেই আমাদের প্রহরীদের শক্তি এবং উৎসাহ সবচেয়ে কম থাকবে। বরাবরের মতোই এ ব্যাপারেও আমার ধারণা সঠিক প্রমাণিত হলো। ভোরের প্রথম আলো ফোঁটার ঘণ্টাখানেক আগে পাশের জঙ্গল থেকে একটা রাতচরা পাখির কর্কশ ডাক ভেসে এলো আমার কানে, অথবা বলা যায় কেউ একজন অপটু গলায় পাখিটার ডাক নকল করার চেষ্টা করল। পাখিটা আমার অন্যতম প্রিয় পাখিগুলোর একটা, ফলে নকল গলাটা বোকা বানাতে পারল না আমাকে। নিঃশব্দে খবর ছড়িয়ে দিলাম আমি, প্রস্তুত হয়ে গেল সবাই।
কিছুক্ষণ নীরবে কাটল। পরে জেনেছিলাম এই সময়টায় পানমাসির সঙ্গীরা বন্দরের দরজায় নিয়োজিত প্রহরীদের পেছন থেকে এসে এক এক করে তাদের চুপ করিয়ে দিচ্ছিল। কারো গলায় ছুরি চালানো হয়, কারো মাথায় মারা হয় মুগুরের বাড়ি। তার পরেই বন্দরের মালপত্র রাখার ঘরগুলোর মাঝ থেকে প্রায় নিঃশব্দে বেরিয়ে এলো কিছু ছায়ামূর্তি। অস্ত্র বাগিয়ে ধরে এক দৌড়ে বন্দরের পাথুরে মেঝে পেরিয়ে মেমননের দিকে এগিয়ে এলো তারা, যেখানে জাহাজটা নোঙর করা রয়েছে। আমার নির্দেশ অনুযায়ী জাহাজের সিঁড়ি আগেই নামিয়ে রাখা হয়েছিল, যেন আগন্তুকদের জাহাজে ওঠার জন্য নীরব আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে।
