আমার জন্য যে কামরার ব্যবস্থা করা হয়েছে তা বিলাসব্যসনের দিক দিয়ে প্রায় রাজা-রানির শোবার ঘরের সমান। যদিও আমার ধারণা রানি তেহুতি নিজেই এর জন্য দায়ী। প্রায় প্রতিদিনই আমার খাওয়ার কামরায় এসে হাজির হয় সে, সাথে থাকে মোটামুটি শ খানেক মানুষের উদরপূর্তি করতে পারে এই পরিমাণে খাবার। তার সাথে আরো থাকে প্রচুর পরিমাণে মদ, যা দিয়ে অনায়াসে এক বছর খেতে পারে একজন মানুষ। মাঝরাতের পরে মাঝে মাঝে শোয়ার পোশাক পরেই আমার ঘরে চলে আসে সে, হাতে থাকে মোমবাতি। লাফ দিয়ে আমার বিছানায় উঠে এসে বলে, মাত্র কয়েকটা মিনিট সময় নেব, টাটা। সত্যি কথা বলছি। খুব দরকারি একটা কথা জিজ্ঞেস করা দরকার তোমাকে, এবং সেটা এখনই।
কয়েক ঘণ্টা পর আমি যখন তাকে ঘুমন্ত অবস্থায় কোলে করে তার নিজের বিছানায় রেখে আসি তখন ওর স্বামী গুঙিয়ে ওঠে, তোমার দরজায় তালা লাগিয়ে রাখতে পারো না টাইটা? তাহলেই তো আর ও ঢুকতে পারে না।
ওর কাছে অতিরিক্ত চাবি থাকে।
তাহলে ওকে তোমার কাছেই রেখে দিও।
নাক ডাকে যে?
হতাশ ভঙ্গিতে মাথা নাড়ে হুরোতাস। তোমার কি মনে হয় সেটা আমি জানি না?
তবে যাই হোক না কেন, এই আরামদায়ক কামরায় থাকার বদলে মাঝে মাঝে যদি একটু কম ঘুমাতে হয় তাহলে সেটা খুব বেশি কিছু নয়। বিশাল দুর্গ প্রাসাদের সবচেয়ে ওপরের অংশে অবস্থিত আমার কামরা এখান থেকে তুষার ঢাকা পাহাড়চূড়া আর নিচের সবুজ উপত্যকা দুটোই দেখতে পাই। সেনাবাহিনীর আসা-যাওয়া, বন্দরের কর্মব্যস্ততা কিছুই আমার চোখ এড়ায় না। বুনো পাখিদের খুব ভালোবাসি আমি, প্রতিদিন সকালে বিভিন্ন প্রজাতির পাখির জন্য বারান্দায় খাবার ছড়িয়ে রাখি। ওদের দেখে খুব আনন্দ লাগে আমার। বড় কামরাগুলোর একটাকে আমার গ্রন্থাগার এবং প্রধান কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার করছি। তাকগুলো খুব দ্রুতই ভরে উঠল আমার বিভিন্ন পুঁথি আর প্যাপিরাসে। অতিরিক্ত যা বাকি থাকল সেগুলোকে কামরার কোনায় মাথা সমান উঁচু স্তূপ করে রেখে দেওয়া হলো।
*
উটেরিক টুরোর সেই কুখ্যাত কারাগার এবং ডুগের ভয়াবহ অত্যাচার থেকে আমাকে বাঁচিয়েছিল ক্যাপ্টেন ওয়েনেগ। তার কাছে সত্যিই ঋণী আমি। কিন্তু এখানে এই ল্যাসিডিমনে সে বেশ অস্বস্তিতে ভোগে, কারণ নিজের কোনো অবস্থান সে # খুঁজে নিতে পারছিল না। তাই নিজের অভিজ্ঞতা, পদমর্যাদা এবং দক্ষতার সাথে মানানসই হয় এমন কিছু একটা কাজ খুঁজে দিতে অনুরোধ করেছিল আমাকে। সুতরাং খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ওয়েনেগ এবং তার ছোট্ট দলটিকে গোপনে মিশর ফিরে যাওয়ার ব্যবস্থা করে ফেললাম আমি। সেখানে গিয়ে একটা গুপ্তচর দল গঠন করবে ওরা, এবং ফারাও উটেরিক টুরোর শাসনামলে আমার জন্মভূমি মিশরে কী হচ্ছে না হচ্ছে তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ পাঠাবে আমার কাছে।
ওয়েনেগ যেন তার বন্ধু এবং গুপ্তচরদের খুশি রাখতে পারে সে জন্য তার কাছে যথেষ্ট পরিমাণে রুপার ডেবেন পাঠানোর ব্যবস্থা করলাম আমি। তাদের কাজে লাগানোর জন্য তিনটি ছোট কিন্তু দ্রুতগতির বাণিজ্যতরী কিনলাম। ওরা যখন গিথিয়ন বন্দর থেকে বিদায় নিল তখন সময় মাঝরাতের পরপর। বন্দরে দাঁড়িয়ে ওদের বিদায় জানালাম আমি, দক্ষিণমুখী এই সমুদ্রযাত্রায় ভাগ্য যেন ওদের সহায় থাকে সেই কামনা করলাম।
ছদ্মনাম এবং ঘন কোঁকড়া দাড়ির ছদ্মবেশে নিজের সুদর্শন চেহারা ঢেকে নিয়ে খুব অল্প সময়ের মাঝেই সব ব্যবস্থা করে ফেলল ওয়েনেগ। লুক্সরে উটেরিকের প্রাসাদের ঠিক পাশেই একটা মদের দোকানে নিজের আস্তানা গেড়ে বসল সে। ওর কাছে একগাদা কাঠের বাক্স দিয়ে দিয়েছিলাম আমি। প্রতিটায় ছিল অনেকগুলো পায়রা। সবগুলোর জন্ম হয়েছে ল্যাসিডিমনের রাজপ্রাসাদে, পায়রা রাখার খোপে। রাজা হুরোতাসের কর্মচারীদের ব্যক্তিগত তত্ত্বাবধানে বড় করা হয়েছে তাদের। এই পাখিগুলোকে নিজের সাথে মিশরে নিয়ে গেল ওয়েনেগ। কয়েক মাসের মধ্যেই লুক্সরে নিজের অবস্থান পাকাঁপোক্ত করে নিল সে এবং দক্ষভাবে কাজ শুরু করে দিল। তার পাঠানো পায়রাগুলোর মাধ্যমে উত্তর সাগরের এই পারে বসেও নিয়মিতভাবে খবর পেতে লাগলাম আমি। এই সাহসী পাখিগুলো চার দিনেরও কম সময়ের মাঝে এই লম্বা দূরত্ব পাড়ি দিতে পারে। অনেকগুলো মূল্যবান তথ্য পাওয়া গেল ওদের বদৌলতে।
খবর পাওয়া গেল, উটেরিক তার নাম বদলেছে। এখন তার নাম ফারাও উটেরিক বুবাস্টিস। নিজের দেবত্ব অর্জনকে উদযাপন করার জন্য এই নাম নিয়েছে সে। বুবাস্টিস হচ্ছেন অনেকগুলো গুণের পাশাপাশি পুরুষালি সৌন্দর্য এবং সাহসের দেবতা। পায়রাদের মারফত এই ঘটনা ঘটার প্রায় সাথে সাথেই জেনে গেলাম আমি। তবে দেবতার অজস্র গুণগুলোর মাঝে কেবল একটা গুণকেই আমার হিংসে লাগে। সেটা হচ্ছে দেবতা বুবাস্টিস চাইলেই তার উখিত পুরুষাঙ্গকে এক শ কিউবিট পর্যন্ত লম্বা করতে পারেন, ফলে একবার তার চোখে পড়ে গেলে খুব কম নারীই রেহাই পায়।
দেবতা বুবাস্টিসকে প্রায়ই দেখানো হয় একটা পুরুষ অথবা মেয়ে বিড়াল হিসেবে। এর কারণ হলো তিনি ইচ্ছে করলে নিজের লিঙ্গও পরিবর্তন করতে পারেন। এবং সম্ভবত এ কারণেই এই বিশেষ দেবতাকে বেছে নিয়েছে উটেরিক।
