কিন্তু তুমি এবং তোমার লোকরা তো ওই বর্বরদের মতোই যুদ্ধ ভালোবাসে, জবাব দিলাম আমি। তুমি নিজেই সে কথা বলেছ আমাকে।
আমার লোকেরা লড়াইয়ের চাইতে বেশি ভালোবাসে শুধু একটা জিনিস, সম্মতি জানাল হুরোতাস। আর সেটা হচ্ছে কোনো উৎসব। তাই আমি ঠিক করেছি ওদের এমন এক বিবাহ উৎসব উপহার দেব, যা হবে ওদের দেখা সবচেয়ে বড় উদ্দাম আর বিখ্যাত বিয়ে। এমন উৎসবের কথা কেউ কোনো দিন স্বপ্নেও চিন্তা করতে পারবে না। জীবিত প্রত্যেকটা মানুষ চাইবে এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে।
মাথা ঝাঁকালাম আমি। তারপর তোমার অতিথিরা যখন ভালো মদ আর ভারি খাবারের ঘোরে সম্পূর্ণ আচ্ছন্ন হয়ে থাকবে সেই সুযোগে তাদের রাজ্যগুলো দখল করে নেবে তুমি।
প্রিয় টাইটা, তোমার রাজনৈতিক বুদ্ধির প্রশংসা না করে থাকতে পারছি না। দাড়িতে হাত বুলিয়ে উদাস ভঙ্গিতে হাসল হুরোতাস।
আমি বলে চললাম, তোমার সুন্দরী কন্যা সেরেনা যদি কোনো এক দ্বীপের প্রধানকে স্বামী হিসেবে বেছে নিত তাহলে বাকি পনেরোজনই তোমার শত্রুতে পরিণত হতো। কিন্তু এখন ওই ষোলোজনের সবাই তোমার মিত্র এবং অধীন হিসেবে থাকবে। সেরেনার বয়স হয়তো কম; কিন্তু বুদ্ধিতে ও অনেক বৃদ্ধ ব্যক্তিকেও হার মানিয়ে দিতে পারবে।
তোমার সম্পর্কে শেষ যে কথাটা বললাম সেটাই আরো একবার বলতে ইচ্ছে করছে আমার, হাসিটা ধরে রেখেই বলল হুরোতাস। ভবিষ্যতে কী হবে সেটা পরিষ্কারভাবে দেখতে কখনোই অসুবিধা হয়নি তোমার।
যদিও এখানে আমরা দুজন ছাড়া আর কেউ নেই তবু গলা নামিয়ে আনলাম আমি। ফলে আমার কথা শোনার জন্য সামনে ঝুঁকে আসতে হলো হুরোতাসকে। এই ষোলোজন মিত্র যদি তোমার সাথে থাকে, বললাম আমি, সে ক্ষেত্রে আমাদের প্রিয় মিশরকে সর্বনাশের হাত থেকে রক্ষা করা এবং স্বৈরাচার উটেরিক টুরোকে শাস্তি দেওয়াটা কিন্তু মোটেই অসম্ভব কিছু নয়।
স্বীকার করছি এমন সম্ভাবনার কথা আমার মাথাতেও এসেছে। কিন্তু লুক্সর থেকে উটেরিককে সরানোর পর ফারাও পদে কাকে বসাতে চাইছ, টাইটা?
নিঃসন্দেহে তুমি, কোনো দ্বিধা না করেই জবাব দিলাম আমি। কিন্তু মুচকি হাসল হুরোতাস।
স্থায়ীভাবে মিশরে ফিরে যাওয়ার কোনো ইচ্ছেই নেই আমার। ল্যাসিডিমনে এই নতুন প্রাসাদে বেশ সুখেই আছি আমি। এটা গড়ে তুলতে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে আমাকে। তা ছাড়া মিশরের সাথে আমার যে স্মৃতিগুলো জড়িয়ে আছে সেগুলোকে সুখের স্মৃতি বলা যায় না। কিন্তু কাজটা করতে পারে এমন যোগ্য ব্যক্তি আর কে আছে? প্রশ্ন করল সে। এক মুহূর্ত তার প্রশ্নটা নিয়ে চিন্তা করলাম আমি।
ফারাও রামেসিস নামটা শুনতে বেশ ভালোই লাগে, কী বলো? হঠাৎ করেই বলে উঠলাম আমি। হুরোতাসের মুখের ভাব বদলে গেল, কিছুটা যেন বিভ্রান্ত হয়ে উঠল সে। ভুলটা বুঝতে পারলাম আমি এবং সহজেই শুধরে নিলাম। অন্যদিকে আমি যত দূর জানি মিশরে কখনো কোনো নারী শাসক ছিল না। কিন্তু ফারাওইন সেরেনা নামটা শুনতে আরো বেশি অভিজাত এবং সুন্দর লাগছে আমার কানে। এবার আবার হাসি ফুটল হুরোতাসের মুখে। ইচ্ছে করলে ওরা যুগ্ম শাসক হিসেবেও দেশ শাসন করতে পারে। আমার এই কথা শুনে এবার হাসিতে ফেটে পড়ল হুরোতাস।
তোমার কথাগুলো শুনতে এত মজা লাগে, টাইটা। এসব চিন্তা কোথা থেকে আসে তোমার মাথায়? ঠিক আছে, যুগ্ম শাসকই হবে ওরা।
ল্যাসিডিমনে আমি এসে পৌঁছেছি মাত্র কয়েক মাস হলো; কিন্তু ইতোমধ্যে আমার উপস্থিতি এখানে অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। ত্রিশ বছর আগে আমার কাছ থেকে বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষা নিত হুরোতাস। এই সময়ের মাঝে তার কোনো পরিবর্তন হয়নি বললেই চলে। তফাত শুধু এটাই যে, এখন আমার শিক্ষাগুলোকে কূটনৈতিক শিষ্টাচার মেনে পরামর্শ বলে ডাকা হয়।
এই পর্যায়ে এসে হুই এবং তার ছেলেদের ওপরে অবস্থান দেওয়ার জন্য খুব বেশি তাড়াহুড়ো করা যাবে না। তবে বুদ্ধি খাঁটিয়ে ওকে ল্যাসিডিমনের সামরিক এবং নৌবাহিনী নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ঠিক মাঝখানে রাখার ব্যবস্থা করলাম আমি। এ ছাড়া মেমনন নামের সেই শক্তিশালী যুদ্ধজাহাজের নিয়ন্ত্রণ এখনো ওর হাতেই আছে, যাতে করে আমরা মিশর এবং উটেরিকের কাছ থেকে পালিয়ে এসেছিলাম এখানে। কাগজে-কলমে এখন রামেসিসের পদবি হচ্ছে সহকারী অ্যাডমিরাল, অর্থাৎ অ্যাডমিরাল হুইয়ের ঠিক নিচে। রাজকীয় বংশধারা এবং রাজকুমারী সেরেনার সাথে বাগদান হওয়ায় এখন বেশ উঁচুতে ওর অবস্থান। কিন্তু বয়স কম হলেও এখনই যে এই উঁচু অবস্থানের সুবিধা নেওয়া ঠিক হবে না এটা রামেসিস ঠিকই বোঝে। ইতোমধ্যে হুইয়ের পরিবারে সবার প্রিয় হয়ে উঠেছে সে। প্রায়ই ওকে দাওয়াত দেয় বেকাথা, খাওয়ার টেবিলে নিজের পাশে বসিয়ে খাওয়ায় পেট পুরে। রামেসিসকে রামি সোনা বলে ডাকে সে। তার ছেলেরাও ওকে নিজেদের পরিবারের একজন বলে ধরে নিয়েছে, কারো মাঝে কোনো হিংসা বা বিদ্বেষের চিহ্নমাত্র নেই। হুইয়ের নাতি নাতনিরা আরো একটা চাচা পেয়ে খুব খুশি,কারণ ইচ্ছেমতো জ্বালানোর জন্য আরো একটা মানুষ পেয়ে গেছে তারা। রামেসিসকে দেখলেই গল্প শোনার জন্য ঘিরে ধরে সবাই, ওর কাঁধে আর পিঠে উঠে বসে থাকে।
রাজা হুরোতাস আর রানি তেহুতিও এটা ভেবে খুব খুশি যে, সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়ে গেলেই রামেসিসের মাধ্যমে তাদের নিজেদের ঘরেও কিছু নাতি নাতনি আসবে। তার জন্য দুর্গে আমার ঘরে পাশেই আরেকটা কামরার ব্যবস্থা করা হয়েছে, যদিও সেটা সেরেনার কামরা থেকে সবচেয়ে দূরের কামরাগুলোর একটা। রাজকুমারীকে যারা পাহারা দিয়ে রাখে তাদের সংখ্যা খুব সতর্কতার সাথে দ্বিগুণ করে দেওয়া হয়েছে, যেন সেরেনার কুমারীত্ব রক্ষার জন্য আমার নিজের সতর্ক চোখের পাহারাদারি যথেষ্ট নয়।
