ও কিছুই জানতে পারেনি। সে সময় প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে যুদ্ধ করতে ব্যস্ত ছিল আমার স্বামী। আর বাড়ি ফেরার পরেও ওকে কিছু বলিনি আমি। সেই দেবতা কি তোমার প্রার্থনা মঞ্জুর করেছিলেন?
আমি যখন ঘুমিয়ে পড়লাম তখন তিনি আমার স্বপ্নে দেখা দিয়েছিলেন, গলা খাদে নেমে এলো তেহুতির, লাল হয়ে উঠল গালগুলো। চোখগুলো নামিয়ে ফেলে বলল, ওটা স্রেফ একটা স্বপ্ন ছিল টাইটা। শপথ করে বলছি। আমি কখনো অন্য পথে পা বাড়াইনি। জারাস আমার স্বামী, সব সময় ওর প্রতি বিশ্বস্ত ছিলাম আমি।
সেই দেবতা কে ছিলেন? তোমাকে নিজের পরিচয় জানিয়েছিলেন তিনি? প্রশ্ন করলাম আমি। সাথে সাথে আরো লজ্জা পেয়ে গেল তেহুতি, মাথা নামিয়ে ফেলল। আমার চোখে চোখ রাখতে পারছে না। কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল সে, তারপর এত আস্তে আস্তে কথা বলল যে, আমি কিছুই শুনতে পেলাম না। জোরে বলো তেহুতি। কে ছিলেন তিনি? আবার জানতে চাইলাম আমি।
এবার আমার দিকে মুখ তুলে তাকাল তেহুতি। পরিষ্কার গলায় বলল, সেই দেবতা বলেছিলেন যে তিনি অ্যাপোলো। উর্বরতা, সংগীত, সত্য এবং আরোগ্যের দেবতা। তার কথা বিশ্বাস করেছিলাম আমি, কারণ তিনি ছিলেন অত্যন্ত সুদর্শন।
চিন্তিত ভঙ্গিতে মাথা আঁকালাম আমি। দেবতার যে গুণগুলোর কথা তেহুতি বলেছে তার সাথে আরো কিছু গুণের কথা যোগ করতে পারি আমি। অসংখ্য গুণ এবং দোষ আছে তার, এবং এগুলোর পাশাপাশি অ্যাপোলো কাম এবং ক্রোধ, মদ এবং মাতলামি, অসুখ এবং মিথ্যার দেবতাও বটে।
তার মানে অ্যাপোলোর সাথে শারীরিক মিলন হয়েছিল তোমার, কথাটা প্রশ্ন নয় বরং মন্তব্যের সুরে বললাম আমি; যেন এটাই নির্ভেজাল সত্যি কথা। সাথে সাথে কাগজের মতো সাদা হয়ে গেল তেহুতির মুখ।
তুমি কি বুঝতে পারছ না টাইটা, ওটা স্রেফ একটা স্বপ্ন ছিল? উঁচু গলায় জিজ্ঞেস করল সে। পুরোটাই ছিল মায়া। সেরেনা আমার স্বামীর ঔরসজাত কন্যা, আমি আমার স্বামীর বিশ্বস্ত স্ত্রী। স্বামীকে ভালোবাসি আমি, ভালোবাসি আমার মেয়েকে। অলিম্পাস বা অন্য কোনো পৃথিবী থেকে নেমে আসা কোনো অস্তিত্ব আমার ভালোবাসা পেতে পারে না।
চোখে নীরব ভালোবাসা আর মায়া নিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে রইলাম আমি। লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল তেহুতি, দৌড়ে চলে এলো আমার কাছে। আমার পায়ের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে দুই হাতে আমার হাঁটু চেপে ধরল, মুখ ডোবাল আমার কোলে।
আমাকে ক্ষমা করে দাও প্রিয় টাটা, আমার কোলের মাঝে মুখ চেপে ধরে থাকায় অস্পষ্ট শোনাল তার কণ্ঠস্বর। পুরোটাই ছিল একটা স্বপ্ন, এবং যা ঘটেছিল তার ওপর আমার কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না। সবই ছিল জাদুবিদ্যা, ডাইনির মায়া। ঝড়ের মাঝে উড়ে যাওয়া পালকের মতো অবস্থা হয়েছিল। আমার। একই সঙ্গে ভয়ানক এবং অসাধারণ এক অভিজ্ঞতা ছিল সেটা। আমার দেহ আর মনের প্রতিটা অংশ তিনি একই সাথে তীব্র ব্যথা আর তীব্র আনন্দ দিয়ে পূর্ণ করে দিয়েছিলেন। চোখ ধাঁধানো সোনালি আলো আর নিশ্চিদ্র শূন্যতার অন্ধকারে একই সাথে ঢেকে গিয়েছিলাম আমি। তার সৌন্দর্য একই সাথে যেমন শ্বাসরুদ্ধকর, তেমনি আবার পাপের মতোই ভয়ংকর বীভৎস। পুরো ব্যাপারটা যেন এক লহমায় শেষ হয়ে গিয়েছিল, আবার স্থায়ী হয়েছিল হাজার বছর ধরে। সেরেনা নামের অলৌকিক সত্তাকে তিনিই আমার গর্ভে স্থাপন করেছিলেন এবং তাতে অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছিলাম আমি। কিন্তু এটা তো বাস্তব ছিল না। আমার এই দুষ্টুমির জন্য তুমি আমাকে ক্ষমা করবে না টাইটা?
ধীরে ধীরে ওর রেশমি চুলে হাত বুলিয়ে দিলাম আমি। ফিসফিস করে বললাম, এখানে ক্ষমা করার কিছু নেই তেহুতি। তোমার স্বামী আর তোমার মেয়ে এরাই কেবল বাস্তব। বাকি সব তো ছায়ার খেলা মাত্র। ওদের দুজনকে তোমার হৃদয়ের কাছাকাছি ধরে রেখো, ভালোবেসো। আর তোমার এই অদ্ভুত স্বপ্নের কথা আর কোনো মানুষকে বলার দরকার নেই। এমনকি আমাকে যে বলেছ এটাও ভুলে যাও।
হুরোতাস যতটা ভেবেছিল, রামেসিস আর তেহুতির বিয়ের আয়োজন করতে তার চাইতেও বেশি সময় লেগে গেল। এই সময়ের মাঝে ছোট ছোট; কিন্তু অনাকাঙ্ক্ষিত দুটো যুদ্ধে লড়াই করতে হলো আমাদের। হুরোতাস আর হুইয়ের ইচ্ছে হলো সাইক্লেডস এবং দক্ষিণ ইজিয়ান সাগরের সকল দ্বীপ এবং দেশকে নিজেদের দখলে রাখবে তারা। কিন্তু ত্রিশ বছর ধরে প্রায় সার্বক্ষণিক যুদ্ধের পরেও এই কাজের অর্ধেকও এখনো শেষ হয়নি। একটা দ্বীপপুঞ্জ যদিও বা দখলে এলো সাথে সাথে হয়তো রাজা হুরোতাসের সাম্রাজ্যের অপর প্রান্তে আরেকজন বিদ্রোহ করে বসল। তার ওপর আছে পারসিয়ানরা, যারা সেই শুরু থেকেই পুরো ব্যাপারটার ঝামেলা আরো বাড়িয়ে চলেছে। কোথাও কোনো দুর্বলতা পেলেই চোরের মতো ঢুকে পড়ে তারা, কিছু মানুষকে খুন করে জাহাজভর্তি লুটের মাল নিয়ে আবার চোরের মতোই পালিয়ে যায়। পৃথিবীর পুব প্রান্তে তাদের বিশাল এবং রহস্যময় সাম্রাজ্য, সেখানে একবার চলে গেলে তাদের আর খুঁজে বের করার উপায় থাকে না।
এরা সব অশিক্ষিত বর্বর আর রক্তপিপাসু জলদস্যুর দল, খ্যাপা গলায় আমাকে জানাল হুরোতাস।
কে জানে, আমাদের ব্যাপারেও হয়তো ওরা একই কথা বলে, শান্ত গলায়
জবাব দিলাম আমি। আমরা ওদের পথপ্রদর্শক, নতুন সাম্রাজ্যের নির্মাতা, গর্বে বুক ফুলিয়ে বলে উঠল হুরোতাস। আমাদের কাজই হচ্ছে যে সত্যিকারের দেব-দেবীদের আমরা উপাসনা করি, তাদের নামে এই পৃথিবীকে শাসন করা, সভ্যতার আওতায় নিয়ে আসা।
