সৌভাগ্যক্রমে আমাদের অতিথি এক বর্ণও মিশরীয় ভাষা জানে না। রাজা এবং রানির এই সংলাপ বিনিময়ের পরেই উপস্থিত সবার মাঝে হাসির ঝড় বয়ে গেল। তবে কারণটা বুঝতে না পারায় সিমাশকি তাদের উদ্দেশ্যে হাতের পেয়ালাটা উঁচু করল কেবল, তারপর বিভ্রান্ত ভঙ্গিতে বাকি সবার সাথে হাসিতে যোগ দিল।
তেহুতির একটা নিজস্ব নিয়ম আছে। সেটা হলো প্রতি সন্ধ্যায় দুই পেয়ালার বেশি মদ খায় না সে। তার ভাষ্য মতে, আমার মন ভালো করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট আবার এত বেশিও নয় যে বিছানা পর্যন্ত যাওয়ার জন্য দুজনের বেশি পরিচারিকার সাহায্য লাগবে।
তবে সেই দিন সন্ধ্যায় ভোজসভার হইচই আর হট্টগোলের মাঝে সুযোগ বুঝে নিয়ে তার মদের পরিমাণ চার থেকে পাঁচ পেয়ালায় বাড়িয়ে দিলাম আমি। যতবারই সে আমার দিক থেকে অন্যদিকে তাকাল বা স্বামীকে চুমু খেতে গেল ততবারই নিজের পেয়ালা থেকে ওর পেয়ালায় মদ ঢেলে দিলাম। সুতরাং শেষ পর্যন্ত যখন তেহুতি সবার কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিল তখন উঠে দাঁড়ানোর জন্য আমার হাত ধরতে হলো তাকে। পরিচারিকাদের বিদায় করে দিলাম আমি, তারপর কোলে করে নিয়ে এলাম ওপর তলার শোবার ঘরে। দুই হাতে আমার গলা জড়িয়ে ধরে খিলখিল করে হাসতে লাগল তেহুতি।
ওর পোশাক খুলতে সাহায্য করলাম আমি, তারপর সেই ছোটবেলায় যখন সে ছোট্ট একটা মেয়ে ছিল তখনকার মতো বিছানায় শুইয়ে চাদর দিয়ে ঢেকে দিলাম। তারপর ওর পাশে বিছানার ওপর বসলাম আমি। আরো কিছুক্ষণ চলল আমাদের গল্প আর হাসিঠাট্টা। কিন্তু এর মাঝেই অত্যন্ত সতর্কতার সাথে
আমাদের আলাপকে নির্দিষ্ট একটা দিকে নিয়ে যেতে লাগলাম আমি। আচ্ছা বেকাথার তো চার সন্তান। অথচ তোমার মাত্র একটা। তাও অনেক দিন পরে হয়েছে। কারণটা কী বলো তো? সুযোগ বুঝে প্রশ্ন করলাম একসময়।
এর উত্তর বোধ হয় বিচক্ষণ দেবতারাই কেবল বলতে পারবেন, জবাব দিল তেহুতি। গত ত্রিশ বছরে এমন কোনো রাত বোধ হয় খুব কমই আছে যখন আমি আর জারাস কিছু করিনি। এমনকি আমার লাল নিশান যখন দেখা দেয় তখনো। জারাসের ক্ষুধা রাক্ষুসে, আর আমিও কিছু কম যাই না। কী তীব্রভাবেই যে একটা বাচ্চা চাইতাম আমি! আর ওদিকে তুমি যেমন বললে, আমার ছোট বোন বেকাথা একের পর এক বাচ্চা বের করে যাচ্ছিল, ঠিক যেভাবে গরম রুটি বের করে রাঁধুনি। মাঝে মাঝে প্রায় ঘৃণাই করে বসতাম ওকে এর জন্য। প্রতি রাতে জারাস আমার বিছানায় আসার আগে শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার দেবী তাওয়েরেতের কাছে প্রার্থনা করতাম আমি, পুজো দিতাম তাকে। কিন্তু কোনো কাজ হচ্ছিল না, বলে একটু হাসল সে। যে দেবীকে দেখতে দুই পায়ে সোজা হয়ে দাঁড়ানো জলহস্তীর মতো লাগে, তাকে কীভাবে বিশ্বাস করা যায় বলো? আমার সব পুজো নির্লজ্জের মতো গ্রহণ করছিল সে, কিন্তু কোনো জবাব দিচ্ছিল না। আমার নিজের কোনো বাচ্চা হোক এটা কখনোই বোধ হয় চায়নি সে।
তো তখন তুমি কী করলে? প্রশ্ন করলাম আমি। কিন্তু জবাব না দিয়ে হঠাৎ প্রসঙ্গ বদলে ফেলল তেহুতি।
ব্যাপারটা নিয়ে একটু চিন্তাভাবনা করতে করতে যদি প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিই আমি তাহলে নিশ্চয়ই তুমি কিছু মনে করবে না, টাটা? বিছানা থেকে নেমে কামরার এক কোণে রাখা বিশেষ পাত্রটার ওপর উবু হয়ে বসে পড়ল সে। কয়েক মুহূর্ত আমরা দুজনই চুপচাপ তার শরীর থেকে বেরিয়ে আসা তরল পদার্থের মিষ্টি শব্দটা শুনলাম। তারপর তেহুতি জানতে চাইল, তোমাকে যদি বলি তবে তুমি কাউকে বলবে না তো? অতিরিক্ত মদ খেয়ে ফেলায় খুব সামান্য জড়িয়ে গেছে ওর কণ্ঠস্বর।
এমন কাজ যদি কখনো করি তবে যেন দেবতাদের অভিশাপ নেমে আসে আমার ওপর, সাথে সাথে জবাব দিলাম আমি। আঁতকে উঠল তেহুতি।
এমন অলক্ষুনে কথা বলতে হয় না টাটা। এখনই ফিরিয়ে নাও কথাটা। দেবতাদের এভাবে খোঁচানো কখনোই উচিত নয়! অশুভ দৃষ্টি এড়ানোর জন্য বাতাসে একটা চিহ্ন আঁকল ও।
ইচ্ছে করেই ওর সাবধানবাণী অগ্রাহ্য করার সিদ্ধান্ত নিলাম আমি। কামরার অন্ধকার কোণে বসে যেসব অমর দেবতা এখন আমাদের কথা শুনছে বা যাদের শোনার সম্ভাবনা আছে তাদের উদ্দেশ্যে বলে উঠলাম, খবরদার হে বুড়ো দেবতাগণ, আমার গায়ে কেউ হাত দেবে না। তাহলে রানি তেহুতি উঠে এসে তোমাদের সবার কানের ফুটোয় মুতে দেবে!
আবার হাসিতে ফেটে পড়ল তেহুতি। এটা কিন্তু ঠিক হচ্ছে না। কোনোমতে নিজের হাসি থামানোর চেষ্টা করতে করতে বলে উঠল সে। দেবতাদের নিয়ে কখনো ঠাট্টা করা উচিত নয়। তাদের রসবোধ খুবই কম, নেই বললেই চলে। আমাদের নিয়ে তারা কৌতুক করতে পারে ঠিকই; কিন্তু তাদের ব্যাপারে কেউ কিছু বললেই খেপে যায়।
ঠিক আছে, আর কোনো ঠাট্টা করছি না, বললাম আমি। তবে এখন এটা বলো যে গর্ভবতী হওয়ার জন্য কী করেছিলে তুমি। কথাটা শোনার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি আমি। আর এটাও বলছি যে, কাউকে কিচ্ছু বলব না।
কাজটা আসলে একদম শুরুতেই করা উচিত ছিল আমার, বুঝলে? একজন দেবতার কাছে প্রার্থনা করেছিলাম আমি, কোনো দেবীর কাছে নয়। তার নামে একটা ষাঁড় উৎসর্গ করে মাঝরাত পর্যন্ত হাঁটু গেড়ে বসে প্রার্থনা করেছিলাম। তোমার স্বামী রাজা হুরোতাসের এ ব্যাপারে কী মতামত?
