এই কথা বলার সাথে সাথে সেরেনা আমার কথার প্রতিবাদ করে বসল। আমি তো আকাশে চাঁদ এবং সূর্যকে একই সাথে একই সময়ে আলাদা আলাদাভাবে দেখেছি। তাহলে তারা এক হয় কীভাবে? এমনভাবে প্রশ্নটা ছুড়ল ও, যেন এই এক কথাতেই সব বিতর্কের অবসান করে ফেলেছে।
নিজের ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরলাম আমি, ফলে সেরেনাও একই কাজ করতে বাধ্য হলো। তোমার হাতটা মুঠি পাকাও, সেরেনা, ওকে বললাম আমি। কিন্তু কথাটা বললাম তেনমাস ভাষায়। ও যখন আমার কথা অনুযায়ী কাজ করল তখন বললাম, এবার তোমার হাতটা সূর্যের দিকে তুলে ধরো।
এই যে, এভাবে? তেনমাসেই জিজ্ঞেস করল ও। প্রতিটা শব্দ ও নিখুঁতভাবে উচ্চারণ করছে; কিন্তু নিজেই বুঝতে পারছে না যে কথাগুলো অন্য এক ভাষায় বের হচ্ছে ওর মুখ দিয়ে।
এবার তোমার পায়ের কাছে, মাটির দিকে তাকাও। কী দেখতে পাচ্ছ? প্রশ্ন করলাম আমি।
কেবল আমার নিজের ছায়া দেখতে পাচ্ছি, আর কিছুই না, তেনমাসে জবাব দিল ও, কিছুটা বিভ্রান্তি ফুটেছে চেহারায়।
ওই গোলাকার ছায়াটা কীসের? ঘোড়ার পিঠ থেকে একটু ঝুঁকে এসে প্রশ্ন করলাম আমি।
আমার হাতের ছায়া।
তার মানে তুমি বলতে চাইছ আমরা একই সঙ্গে তোমার হাত এবং হাতের ছায়াটা দেখতে পাচ্ছি, ঠিক যেভাবে মাঝে মাঝে সূর্য এবং তার ছায়া অর্থাৎ চাঁদকে দেখতে পাওয়া যায়? প্রশ্ন করলাম আমি। আরো তর্ক করার জন্য সুন্দর মুখটা খুলল সেরেনা, তারপর কী ভেবে বন্ধ করে ফেলল আবার। নীরবে পথ চলতে লাগলাম আমরা। অদ্ভুত হলেও সত্যি, সেদিনের পর থেকে আর চাঁদ এবং সূর্য নিয়ে কথা হয়নি আমাদের মাঝে।
তবে আমরা যখন একা থাকতাম তখন প্রায়ই তেনমাসে কথা বলতাম, যদিও সেরেনা বুঝতে পারত না যে অপরিচিত এক ভাষা ব্যবহার করছি আমরা। কাজটা করতে পেরে দারুণ খুশি হলাম আমি, কারণ এতে করে স্পষ্ট প্রমাণ মিলে গেল যে সত্যিই সেরেনা দেবত্বের অধিকারী।
*
এই পৃথিবীতে একজনই আছে, যে আমাকে এই অলৌকিক জন্মের কথা খুলে বলতে পারে। তাকে এ ব্যাপারে কীভাবে প্রশ্ন করব সেটা নিয়ে দীর্ঘ সময় চিন্তা করতে হলো আমাকে। এই নাটকের প্রধান চরিত্রের সাথে আমার সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ, তা সত্ত্বেও এভাবে সরাসরি জিজ্ঞেস করার অধিকার আমার নেই। এই প্রেক্ষাপটে আমার সম্পূর্ণ বুদ্ধিমত্তা আর চালাকি কাজে লাগিয়ে সত্যি কথাটা বের করতে হবে, এমন কোনো ঝুঁকি নেওয়া যাবে না যাতে পরে বিপদ হতে পারে। একবার এমনকি এটাও ভাবলাম যে, সত্যি কথাটা খুঁচিয়ে বের করার কোনো দরকার নেই। আমি শুধু এটাই পরিষ্কার করে বলে দিতে চাই যে, ব্যাপারটা নিছক আমার কৌতূহলের বশে নয় বরং চারপাশের সবার মঙ্গলের জন্যই কাজটা করতে হয়েছিল আমাকে।
প্রথম যখন তেহুতি আর তার বোন বেকাথাকে আমি আঙুরের মোহনীয় রসের স্বাদ নেওয়ার অনুমতি দিই তখন তাদের বয়স ছিল পনেরো কী মোলো বছর। অনেক আগের কথা সেটা। মিশর থেকে তাদের ক্রিটে নিয়ে যাচ্ছিলাম আমি, মিনোসের সাথে বিয়ে দেওয়ার জন্য। দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার পথে ওরা প্রায়ই মিনতি করত যে এই বিয়ে করার থেকে আত্মহত্যা করাও ভালো। তখনই ওদের কষ্ট লাঘব করার জন্য মদ খাওয়ার অনুমতি দিই আমি। তাতে কাজ হয়েছিল, কারণ আমার জানা মতে এরপর আর কখনো আত্মহত্যার কথা চিন্তা করেনি ওরা। ল্যাসিডিমনে ওদের সাথে আবার দেখা হওয়ার পরে আমি দেখেছি, এই দীর্ঘ সময়ে দ্রাক্ষারসের প্রতি আগ্রহ তো কমেইনি, বরং আরো বেড়েছে। তবে তফাত শুধু এটাই যে, এখন ওরা নিজেদের রুচির ব্যাপারে আরো বেশি খুঁতখুঁতে আর জেদি। কেবল প্রাসাদের আঙুর বাগান থেকে সাবধানে বাছাই করা আঙুরের তৈরি মদেই চুমুক দেয় ওরা, যদিও সেটা ওদের অধিকারও বটে।
শিকারের পানি খেতে আসার জায়গায় শিকারি যেমন ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করে তেমনি আমিও সঠিক সময়ের অপেক্ষায় রইলাম। তারপর একদিন পুবের এক দূর রাজ্যের রাজা এলো ল্যাসিডিমনে। বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার করার ছুতোয় এসেছে সে, যদিও সবাই জানে যে তার আসল উদ্দেশ্য রাজকুমারী সেরেনাকে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া। সেরেনার সৌন্দর্যের খ্যাতি ইতোমধ্যে দূর দূরান্তে ছড়িয়ে পড়েছে। তবে তার বাগদান যে হয়ে গেছে এটা অনেকেই এখনো জানে না।
ল্যাসিডিমনে আমিই একমাত্র ব্যক্তি যে পারসিয়ান ভাষা জানে। এ কারণে আমার ওপরেই দায়িত্ব পড়ল রাজা সিমাশকি অর্থাৎ সেরেনার পাণিপ্রার্থীকে জানানো যে তার পছন্দের মেয়েটি ইতোমধ্যে আরেকজনের বাগদত্তা হয়ে গেছে। কথাটা শুনে এমন সুন্দর কাব্যিক ভাষায় সে দুঃখ প্রকাশ করল যে, পানি চলে এলো সেরেনার চোখে। তারপর সেরেনা এবং রামেসিস দুজনের গালেই চুমু খেয়ে তাদের জন্য শুভকামনা জানাল রাজা সিমাশকি। হবু দম্পতির সুখী জীবন কামনা করে তাদের বিয়ের উপহার হিসেবে তার নিজের আঙুর বাগান থেকে তৈরি বড় বড় বিশ পাত্রভর্তি লাল মদ উপহার দিল সে।
এই মদে প্রথম চুমুকটা দেওয়ার পরে তেহুতি তার স্বামীর কাছে মন্তব্য করল, এমন সুস্বাদু মদ যদি আরো বিশ পাত্র পাই তাহলে আমি সিমাশকিকে বিয়ে করতে রাজি আছি।
নিজের পেয়ালায় একটা চুমুক দিল রাজা হুরোতাস, তারপর মদটা মুখের ভেতর নেড়েচেড়ে স্বাদ পরীক্ষা করে মাথা ঝাঁকাল। আর আরো বিশ পাত্র পেলে আমিও তোমাকে তার হাতে তুলে দিতে রাজি আছি।
