এই আলোচনা এবং বিতর্কগুলোর জন্য বেশ আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করে থাকি আমি। প্রথম দেখা হওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই বুঝতে পারলাম, সেরেনাকে তার মা তেহুতির মতোই ভালোবেসে ফেলেছি। যদিও সে আমার মতামতকে বারবার অস্বীকার করে, কিছুতেই মানতে চায় না যে পৃথিবী আসলে চ্যাপ্টা; এবং জোয়ার-ভাটা হচ্ছে সাগরদেবতা পোসাইডনের অদম্য তৃষ্ণার ফল, যে কিনা প্রতিদিন দুইবার সাগর থেকে গভীর চুমুকে পানি টেনে নেয়। এটাও বিশ্বাস করে না যে, সূর্য আর চাঁদ আসলে একই বস্তু, যা আকাশে ভেসে বেড়াচ্ছে, যেটা এমন এক দাহ্য পদার্থে তৈরি, যেটা দিনের বেলায় দাউদাউ করে জ্বলে উঠে শেষ হয়ে যায় আর রাতে আবার নিজেকে নতুন করে তৈরি করে। এসব ব্যাপারে ওর নিজের কিছু মতামত আছে, যেগুলো এমনই হাস্যকর যে একবারের বেশি দুইবার শুনতে ইচ্ছে করে না। আরে ওর কথা অনুসারে পৃথিবী যদি সত্যিই কুমড়োর মতো গোলাকার হবে, তাহলে ওর নিচে যে মানুষগুলো রয়েছে তারা পড়ে যায় না কেন?
পরবর্তী কয়েক মাসে আমার মাঝে একটা ধারণা ধীরে ধীরে শক্ত রূপ নিতে শুরু করল। সেরেনা খুব সম্ভব কোনো স্বাভাবিক মানব-মানবীর সন্তান নয়, অথবা ওর বাবা-মার মাঝে অন্তত একজনের মাঝে স্বর্গীয় কোনো গুণাবলি ছিল। এমন বুদ্ধি আর সৌন্দর্য এই পৃথিবীর কিছু হতে পারে না। ব্যাপারটা আমি বুঝতে পারলাম, কারণ ইতোমধ্যে আমিও একই পথে হেঁটেছি বা বলা যায় একই আশীর্বাদ পেয়েছি। ব্যাপারটা আর ঠিক কীভাবে বুঝিয়ে বলা যায় আমার জানা নেই।
রাজা হুরোতাসের জন্য আমার মনে যে উঁচু ধারণা, তাতে কোনো খাদ নেই। সে একজন দক্ষ এবং সাহসী যোদ্ধা, পুরনো এবং বিশ্বস্ত বন্ধু। রাজা হিসেবে তার দক্ষতা বরং আরো বেশি, সত্যি কথা বলতে ফারাও টামোসের পরেই রাজ্য শাসনে তাকে এগিয়ে রাখব আমি। কিন্তু স্বাভাবিক মস্তিষ্কের কেউই রাজা হুরোতাসকে দেবতা বলে ভুল করবে না।
তবে সেরেনা কার গর্ভে বেড়ে উঠেছে সেটা নিয়ে অন্তত সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই, কারণ দুজনের মাঝে কেবল একজনেরই ওই ক্ষমতা আছে। তাই এবার আমার মনে সন্দেহ ঢুকল, তেহুতি বোধ হয় সতীত্বের ওই চুলের মতো সরু পথটায় সারা জীবন অবিচল ছিল না।
তবু আমার সন্দেহকে নিশ্চিত করার জন্য সেরেনার এই সম্ভাব্য দেবত্বকে পরীক্ষা করে দেখার সিদ্ধান্ত নিলাম আমি। কিছু কিছু লোক ভাবে আমি সব সময়ই কিছু না কিছু নিয়ে ব্যস্ত থাকি বা থাকার ভান করি। তবে তাদের কথাকে সত্যি প্রমাণিত করতে নয়, বরং আমার চারপাশের যারা আছে তাদের সবার প্রতি ভালোবাসা থেকেই কাজটা করতে হবে আমাকে।
৩. দেবত্বের কিছু নির্ভুল পরীক্ষা
দেবত্বের কিছু নির্ভুল পরীক্ষা আছে, যেগুলো কখনো ব্যর্থ হয় না। তার মাঝ একটা হচ্ছে জাদুকর এবং বিশেষ জ্ঞানে পারদর্শী ব্যক্তিদের গোপন ভাষা বোঝার এবং বলার ক্ষমতা। দেবতা হার্মিস, যার আরেক নাম হচ্ছে মার্কারি; এই ভাষা মানুষের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। হার্মিস হলেন বজ্রদেবতা জিউসের প্রিয় পুত্র, যিনি নিজের ছেলেকে মানবজাতির ইতিহাস এবং বিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করার সুযোগ দিয়েছেন। সেগুলোর মাঝে সবচেয়ে দরকারি কাজগুলো হচ্ছে কথা, ভাষা শিক্ষা এবং বাগ্মিতার সৃষ্টি করা। অন্যদিকে জিউস হার্মিসকে মিথ্যাবাদিতার স্রষ্টা হিসেবেও রেখেছেন, একই সাথে তিনি কথার জালে ভোলানোয় পারদর্শীও বটে। এই নানাবিধ দায়িত্বের অংশ হিসেবেই হার্মিস তৈরি করেছেন দেবতাদের ভাষা, যার নাম তিনি দিয়েছেন তেনমাস।
খুব বেশি অপেক্ষা করতে হলো না আমাকে। বেশির ভাগ সন্ধ্যাতেই রাজপরিবারের নারী সদস্যরা অর্থাৎ তেহুতি, বেকাথা এবং সেরেনা তাদের ঘোড়া নিয়ে লম্বা সময়ের জন্য চলে যায় নদীর পাড় ধরে বেড়াতে। ট্যাগেটাস পর্বতমালার দিকে যায় তারা, অথবা দ্বীপের উত্তর তীরে সোনালি বালিতে ঢাকা বেলাভূমির দিকে। রামেসিস আর আমাকেও তাদের সাথে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয় এখন। আমার মতোই সেরেনাও আমাদের চারপাশে ঘিরে থাকা পানিতে বাস করা নানা প্রাণী নিয়ে দারুণভাবে আগ্রহী। পাহাড় এবং জঙ্গলে বাস করা পাখি আর জীবজন্তু নিয়েও তার আগ্রহ কম নয়। পাহাড় আর জঙ্গলে বাসা বাঁধা পাখিগুলোর ডিম সংগ্রহ করে সে, সমুদ্রতীরে ভেসে আসা শামুক এবং ঝিনুকের খোলস কুড়াতে ভালোবাসে। প্রতিটি প্রজাতিকে একটা করে কাল্পনিক নাম দিয়েছে সে, নতুন কিছু খুঁজে পেলে তার আনন্দের আর সীমা থাকে না। বেশির ভাগ সৈনিক এবং পুরুষমানুষের মতো এসব ব্যাপারে রামেসিসের খুব একটা আগ্রহ না থাকলেও সেরেনা তাকে কোথাও নিয়ে যেতে চাইলে কখনো আপত্তি করে না সে।
সেই বিশেষ দিনটায় আমরা যখন সমুদ্রতীরে গেলাম, দেখলাম জোয়ারের পানি অন্যান্য দিনের চাইতে আজ বেশি ওপরে উঠে এসেছে।
এই দেখে সেরেনা অদ্ভুত এক তত্ত্ব খাড়া করল। পোসাইডনের তৃষ্ণা আজ বেশি বেড়ে গেছে বলে নয়, বরং সূর্য আর চাঁদ আজ কোনো রহস্যময় উপায়ে একই রেখায় চলে এসেছে এবং সাগরের পানির ওপর দ্বিগুণ টান প্রয়োগ করছে। আর সে কারণেই তীরের ওপর বেশি উঠে এসেছে জোয়ারের পানি।
জ্যোতির্বিদ্যা নিয়ে পড়াশোনা করেছে এমন সব শিক্ষিত মানুষের মতো আমিও খুব ভালো করেই জানি যে সূর্য আর চাঁদ প্রকৃতপক্ষে একই বস্তু। দিনের বেলায় যখন এর শক্তি পূর্ণ সীমায় অবস্থান করে তখন তা সূর্যে পরিণত হয়। আর রাতের বেলা যখন তার আগুন ফুরিয়ে যায়, নতুন করে শক্তি সঞ্চয় করে, তখন তাকে আমরা চাঁদ হিসেবে দেখি। এই সময় যা দেখা যায় তা আসলে তার অগ্নিময় চেহারার ছায়া মাত্র।
