সেদিন তেহুতি তলোয়ারবাজির এমন উৎকৃষ্ট নিদর্শন দেখেছিল যে, আর কোনো দিন সেটা সে ভুলবে না। এবং সেরেনার কোমর থেকে ঝুলতে থাকা নীল তলোয়ারটা দেখে আমার মন্তব্যের জবাবেই এই গল্প আমাকে শুনিয়েছিল সে।
*
দিনগুলো যদি আমার জন্য সুখের হয়ে থাকে তবে রামেসিস আর সেরেনার জন্য তা ছিল স্বর্গীয়। শুনেছি প্রথম দর্শনে প্রেম বলে কিছু নেই; কিন্তু এই জুটিকে দেখে সেই ধারণাকে মিথ্যে বলে উড়িয়ে দিতে বাধ্য হলাম আমি।
নিজেদের মাঝে তৈরি হওয়া আকর্ষণ এবং ভালোবাসা লুকিয়ে রাখার কোনো চেষ্টাই করল না তারা। সুযোগ পেলেই নিজেদের স্পর্শ করে তারা, একজন যখন কথা বলে তখন আরেকজন তার ঠোঁটের দিকে তাকিয়ে থাকে নির্নিমেষ চোখে। মাঝে মাঝে দেখা যায় পরস্পরের চোখের দিকে তাকিয়ে কোথাও বসে আছে তারা, বহুক্ষণ কেটে গেলেও নড়ার কোনো লক্ষণ নেই।
দুজনের এই ভালোবাসা দেখে প্রথমে তেহুতি খুশি হয়েছিল ঠিক; কিন্তু খুব শীঘ্রই সেটা ভয়ে রূপ নিল। মেয়ের কাছ থেকে সতীত্ব অক্ষুণ্ণ রাখার একটা শপথ আদায় করে নিল সে, তারপর আমার কাছে অভিযোগ করতে এলো। ওই শপথ ও মন থেকে নেয়নি। মাদি ঘোড়া তার প্রথম মৌসুমে যেমন উত্তেজিত হয়ে থাকে ওর অবস্থাও তাই। রামেসিসকে দেখলেই ওর মনের অবস্থা কী হয় সেটা আমি ঠিকই বুঝতে পারি। আমাকে সাহায্য করো, টাটা।
চেহারায় নিষ্পাপ ভাব ফুটিয়ে তুললাম আমি। বললাম, কীভাবে সাহায্য করব? জারাস যখন তোমার পেছনে লেগেছিল তখন যেভাবে তোমার কুমারীত্ব রক্ষা করতে সাহায্য করেছিলাম সেভাবে?
চমকে উঠল তেহুতি, তারপর জ্বলন্ত চোখে তাকাল আমার দিকে। তোমার জন্য দুঃখ লাগছে আমার। এত নোংরা মন তোমার, টাইটা!
কখন আমার নোংরা মনের পরিচয় পেলে? প্রশ্ন করলাম আমি। ব্যাপারটা যখন তোমার আর জারাসের ছিল তখন, নাকি এখন রামেসিস আর সেরেনার ব্যাপারে? এই কথা শোনার সাথে সাথে নিষ্ফল রাগে হাত দুটো মাথার ওপর ছুড়ল তেহুতি, তারপর হাল ছেড়ে দিয়ে হাসিতে ফেটে পড়ল।
দুটোর মাঝে অনেক বড় তফাত আছে, হাসির দমক কিছুটা সামলে নিয়ে বলল সে। জারাস আর আমি কখনো আমার ভাই, অর্থাৎ ফারাওয়ের কাছ থেকে কোনো সুযোগ পাইনি। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এক বুড়ো বরের সাথে বিয়ে দেওয়া হচ্ছিল আমাকে। আমি শুধু চেয়েছিলাম জীবনে একবারের জন্য হলেও আমার ভালোবাসার পুরুষকে কাছে পেতে। কিন্তু সেরেনা আর রামেসিসের মিলনের প্রতি সবার সম্মতি রয়েছে। আমরা শুধু চাইছি ওরা একটু ধৈর্য ধরুক।
আমার মনে হয় সেই একটু ধৈর্যটা ঠিক কতখানি সেটা নিয়ে তোমার এবং তোমার মেয়ের মতামত সম্পূর্ণ আলাদা। তবে এটা বলতে পারি যে, অন্তত রামেসিসকে সামলে রাখার চেষ্টা করব আমি।
এবং তেহুতিকে সত্যি কথাই বলেছিলাম আমি। ওর মতো আমিও জানি প্রথম প্রেমের উচ্ছ্বাস কতটা অপ্রতিরোধ্য হতে পারে। রাজা হুরোতাস এবং তেহুতি দুজনই রামেসিস আর সেরেনার মিলনের পক্ষে; কিন্তু ব্যাপারটা একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের গুরুত্বও বহন করছে। হুরোতাস এবং তেহুতির মতে ল্যাসিডিমনের চারদিকে ছোট-বড় যে অসংখ্য রাজ্য রয়েছে তাদের সবগুলোর প্রধানদের বিয়েতে উপস্থিত থাকতেই হবে। এই বিয়ে থেকে যতটা সম্ভব রাজনৈতিক ফায়দা আদায় করতে চায় রাজা হুরোতাস এবং তার স্ত্রী।
ওদের আন্দাজ অনুসারে রাজনৈতিক মৈত্রী আশা করা যায় এমন সবগুলো দেশের রাজার কাছে বিয়ের আমন্ত্রণপত্র পাঠাতে, সেইসাথে তাদের সবাইকে ল্যাসিডিমনের দুর্গ-প্রাসাদে অবস্থানের ব্যবস্থা সাজাতে সাজাতে প্রায় বছরখানেক সময় লেগে যাবে।
এক বছর! অধৈর্য হয়ে চেঁচিয়ে উঠল রামেসিস। এর ভেতরে তো আমি বুড়ো হয়ে মরেই যাব! কিন্তু অবাক হয়ে দেখলাম সেরেনা অনেক বেশি ধৈর্য এবং বুদ্ধির পরিচয় দিল।
তুমি যতটা বলো সত্যিই যদি আমাকে ততটা ভালোবাসো, নিজের বাবা-মা এবং আমার উপস্থিতিতে রামেসিসকে বলল সে, তাহলে আমার বাবা এবং মায়ের কথা তোমাকে শুনতেই হবে। এই সুন্দর দেশের ভবিষ্যৎ উত্তরাধিকারী আমি। সুতরাং এই দেশের প্রতি আমার কর্তব্যের গুরুত্ব আমাদের ব্যক্তিগত ইচ্ছার চাইতে অনেক বেশি। তা ছাড়া সময় এবং ত্যাগের সাথে সাথে আমাদের ভালোবাসার শক্তি আরো বাড়বে, তাই না? বলা যায় যে, এই একটা সাধারণ কিন্তু ওজনদার যুক্তি দিয়েই রামেসিসের মন ঘুরিয়ে ফেলল সে।
এখন পর্যন্ত ওকে আমি স্রেফ একজন সুন্দরী তরুণী হিসেবেই দেখে এসেছি। কিন্তু সেই দিন থেকে বুঝতে শুরু করলাম, আসলেই ওর ব্যক্তিত্ব কতটা শক্তিশালী। সত্যি কথা বলতে, ওর গুণ এবং মেধার প্রায় পুরোটাই ঢাকা পড়ে গেছে সৌন্দর্যের পর্দার আড়ালে। কিন্তু যদি কেউ ওই পর্দার আড়াল ভেদ করে উঁকি দিতে পারে তাহলে দেখবে ভেতরে এমন এক বুদ্ধিমত্তা এবং ইস্পাতকঠিন ব্যক্তিত্ব লুকিয়ে আছে, যা সত্যিই অসাধারণ।
দিনের মাঝে অনেকটা সময় একসাথে কাটায় ওরা, ফলে ওদের ভালোবাসার কথা কারো অজানা নেই। কিন্তু কখনো মানুষের দৃষ্টির আড়ালে যায় না সেরেনা, ফলে কেউ ওদের নিয়ে কোনো অলস গালগল্পের জালও বুনতে পারে না। প্রকৃতপক্ষে এই জুটির দুজনই অন্যান্য বুদ্ধিমান এবং জ্ঞানী মানুষদের প্রতি দারুণভবে আকৃষ্ট, বিশেষ করে যেকোনো জ্ঞানগর্ভ আলোচনায় সেরেনার আগ্রহ অনেক বেশি। প্রায় প্রতিদিনই অন্তত কয়েক ঘণ্টার জন্য আমাকে খুঁজে নেয় সে, নানা রকম বিষয়ে আলোচনা করে। সেসব বিষয়ের মাঝে আমাদের পৃথিবীর আকৃতির মতো ব্যাপার যেমন থাকে, তেমনি থাকে জোয়ার-ভাটার কারণ এবং চাঁদ আর সূর্য কী উপাদানে তৈরি তাই নিয়ে গবেষণা।
