কিন্তু পাহাড়ি নদীর বরফগলা পানির প্রচণ্ড ঠাণ্ডার সাথে পাল্লা দিয়ে এই দুই নারীর কারো পক্ষেই জয়লাভ করা সম্ভব ছিল না। পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে যখন তারা তীরে ফিরে এলো তখন দুজনই প্রচণ্ড শীতে ঠক ঠক করে কাঁপছে। ঠাণ্ডার চোটে লাল হয়ে গেছে নিতম্ব আর তলপেট। বাড়ির ভেতরে ঢুকে অগ্নিকুণ্ডের মরে আসা আগুনে নতুন করে কাঠের টুকরো ছুঁড়ে ফেলল তারা, তারপর যখন সেগুলো নতুন করে জ্বলে উঠল তখন আগুনের এত কাছে এসে দাঁড়াল যে আরেকটু হলেই তাদের গায়ে আগুন লেগে যেত। চাকরদের রেখে যাওয়া শুকনো তোয়ালে দিয়ে পরস্পরের শরীর মুছে পরিষ্কার করে দিল তারা। শরীর গরম হয়ে আসতে যখন কাঁপুনি কমে এলো তখন বড় এক পাত্র লাল মদ নিয়ে এলো তেহুতি। সেটা কয়লার ওপর রাখল সে, তারপর যখন ভেতরের মদ ফুটতে শুরু করল তখন তার ভেতরে দুই মুঠো শুকনো গুল্ম ছুঁড়ে দিয়ে ভালোভাবে নাড়ল। শরীর সম্পূর্ণ শুকিয়ে আসার পর কাপড় পরে নিল দুজন, তারপর আগুনের সামনে রাখা একটা আসনে পাশাপাশি বসল। ধূমায়িত পাত্রটা হাতবদল হতে লাগল দুজনের মাঝে, উষ্ণ মদের কারণে আর পরস্পরের সান্নিধ্যে দুজনই সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট বোধ করছে।
চুনি পাথরের বাঁটসহ সেই তলোয়ারটা এখনো খাপের মাঝে ভরে নিজের কোলের ওপর রেখেছে তেহুতি। এবার মেয়ের দিকে ঝুঁকে এলো সে, মুক্ত হাতটা দিয়ে তার কাঁধ জড়িয়ে ধরল। সেরেনাও মায়ের গালে চুমু খেয়ে আদরের জবাব দিল, তারপর ফিসফিস করে বলল, এই সুন্দর দিনটার জন্য তোমাকে ধন্যবাদ মা। আমাকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মেয়েতে পরিণত করেছ তুমি।
এখন আর তুমি নিছক কোনো মেয়ে নও, প্রিয়। নারী হয়ে উঠেছ তুমি এবং তোমার সৌন্দর্য এখন ভাষায় বর্ণনা করার মতো নয়। কিন্তু তোমার জন্মদিন তো এখনো শেষ হয়নি। তোমার জন্য আরো একটা উপহার আছে আমার কাছে।
ইতোমধ্যে আমাকে যথেষ্টরও বেশি দিয়েছ তুমি… বলতে শুরু করল সেরেনা, তারপর হঠাৎ ভাষা হারিয়ে ফেলে হাঁ করে তাকিয়ে থাকল মায়ের দিকে। কোল থেকে নীল তলোয়ারটা তুলে নিয়েছে তেহুতি, মেয়ের কোলের ওপর রেখেছে সেটা। তারপর সেরেনার হাতটা ধরল সে, তলোয়ারের বাটের ওপর রেখে ভাঁজ করে দিল আঙুলগুলো।
এটাই তোমার প্রতি আমার উপহার, সেরেনা, বলল সে। সাবধানে ব্যবহার কোরো এটা, যত্ন নিও। কিন্তু যখন প্রয়োজন হবে তখন যেন শত্রুর হৃৎপিণ্ড বরাবর আঘাত করতে দ্বিধা কোরো না।
এ যে অনেক বেশি, দুই হাত নিজের পেছনে নিয়ে গিয়ে মাথা নেড়ে বলল সেরেনা, এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছে কোলের ওপর পড়ে থাকা অস্ত্রটার দিকে। আমি জানি তোমার কাছে এটা কত মূল্যবান। আমি এটা নিতে পারি না।
কিন্তু এই উপহারের সাথে যে আমার ভালোবাসাও মিশে আছে। আর এখন যদি এটা আমি ফেরত নিতে চাই তাহলে আমার ভালোবাসাও ফিরিয়ে নিতে হবে, যেটা অসম্ভব, বলল তেহুতি।
তলোয়ারের দিক থেকে চোখ সরিয়ে এনে মায়ের দিকে চাইল সেরেনা, এই কথার কী জবাব দেবে ভাবছে। কথার খেলা চলছে এখন দুজনের মাঝে। এমন একটা ব্যাপার, যেটা উভয়েই পছন্দ করে। তার পরেই তার মাথায় সমাধানটা চলে এলো। এই নীল তলোয়ার তো তোমারই একটা অংশ, তাই না? প্রশ্ন করল সে। একটু দ্বিধা করে মাথা ঝাঁকাল তেহুতি।
হ্যাঁ, আমার তাই মনে হয়, ব্যাপারটা স্বীকার করে নিল সে।
কিন্তু তোমার অংশ তো আমি নিজেও। আর তুমিও আমার একটা অংশ। ঠিক কিনা, বলো?
এবার তেহুতি বুঝতে পারল কী বোঝাতে চাইছে তার মেয়ে। গম্ভীর ভাব কেটে গিয়ে উজ্জ্বল হাসি ফুটে উঠল তার মুখে।
তার মানে কী দাঁড়াচ্ছে? আমরা তিনজন আসলে একই সত্তা এবং এই তলোয়ার আমাদের দুজনেরই অংশ। তার মানে আমরা তিনজন প্রত্যেকেই একে অপরের। এই কথা বলে তলোয়ারের চুনিখচিত হাতলটা চেপে ধরল সেরেনা টান দিয়ে সেটা বের করে আনল খাপ থেকে। তারপর বলল, এই অসাধারণ জিনিসটা তুমি আমার সাথে ভাগ করে নিতে চেয়েছ, এটা আমার জন্য অনেক বড় সম্মানের ব্যাপার, মা।
তারপর উঠে দাঁড়াল সে, তলোয়ারটা তুলে ধরল এমনভাবে যেন জ্বলন্ত মশাল তুলে ধরেছে। মনে হলো যেন তলোয়ারের ফলা থেকে প্রতিফলিত নীলচে আভায় পুরো ঘর আলোকিত হয়ে উঠেছে। এবার অনুশীলনের ধাপগুলো শুরু করল সে, যেগুলো সেই ছোটবেলায় খেলনা তলোয়ার ধরার মতো বয়স হওয়ার সাথে সাথেই তাকে শিখিয়েছিল তেহুতি। প্রথমেই আক্রমণের বারোটি প্রাথমিক পদ্ধতি অনুশীলন করল সে, তারপর কোথাও না থেমে সাবলীল দ্রুততায় অন্য সবগুলো পদ্ধতি।
তাকে হাততালি দিয়ে উৎসাহিত করতে লাগল তেহুতি, আর একই সাথে অনুশীলনের গতি বাড়াতে শুরু করল সেরেনা। একসময় তার হাতের তলোয়ারটা মনে হতে লাগল এক টুকরো আলোর রেখা, ঠিক যেমনটা ফুলের সামনে ভেসে থাকার সময় হামিংবার্ডের পাখায় দেখা যায়। সেই পাখারই একটা অংশে পরিণত হলো তার হাত, প্রতিনিয়ত আকার বদলাচ্ছে। তলোয়ারের তালে তালে নাচতে শুরু করল তার সম্পূর্ণ শরীর। শেষে গ্রীস্মের আকাশে ফুটে ওঠা বিদ্যুৎশিখার মতো লঘু চঞ্চল পায়ে ঘুরতে শুরু করল সে। প্রতিটা ঘূর্ণনের সাথে সাথে তামার ফুলদানিগুলো থেকে একটা করে ফুলের উঁটা কেটে পড়ে যেতে লাগল তার তলোয়ারের ঘায়ে। কাজটা এত নিখুঁতভাবে ঘটতে লাগল যে, এমনকি ফুলগুলোও বুঝতে পারল না যে তাদের গোড়া কেটে ফেলা হয়েছে। এক মুহূর্তের জন্য যেন শূন্যে ভেসে থাকল তারা, তারপর পড়ে যেতে লাগল মেঝেতে। ততক্ষণে হয়তো নতুন তিন-চারটি ফুলের উঁটা কেটে পড়ে গেছে সেরেনার তলোয়ারের আঘাতে। মেঝের ওপর পুরু হয়ে জমল ফুলের আস্তরণ, শীতকালে যেভাবে জমে তুষার। শেষ পর্যন্ত যখন আর একটা ফুলও বাকি রইল না তখন যেভাবে নাচ শুরু করেছিল ঠিক সেভাবেই আবার হঠাৎ করে থেমে গেল সেরেনা, ঠিক আগের মতোই নীল তলোয়ারটা মশালের মতো তুলে ধরে রেখেছে মাথার ওপর।
