এ ছাড়াও ধাঁধা বা ছড়া লিখতেও জানে সে এবং ছোট্ট এক টুকরো হাসি বা একটা শব্দ দিয়েই হাসি ফুটিয়ে তুলতে পারে অপরের মুখে।
পৃথিবীর প্রায় সকল প্রান্ত থেকেই ক্ষমতাশালী ধনী পুরুষরা তাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছে। কিন্তু তাদের সবাইকে সেরেনা এমন বুদ্ধির সাথে প্রত্যাখ্যান করেছে যে, কেউই হৃদয় ভাঙার ব্যথা অনুভব করেনি বরং এমনভাবে বিদায় নিয়েছে যেন সেরেনা তাদের অনেক বড় কোনো উপকার করেছে।
মায়ের মতোই সেরেনাও সুদক্ষ তীরন্দাজ এবং সব ধরনের ধারালো অস্ত্র চালাতে পারদর্শী। তেহুতির সেই চুনির হাতলওয়ালা নীল রঙের তলোয়ারকে স্পর্শ করার অনুমতি আছে শুধু তার। এই অস্ত্রের খ্যাতি প্রায় কিংবদন্তির সমান, যার উৎপত্তি সম্পর্কে ছড়িয়ে আছে নানা বিভ্রান্তি। আমি এটাকে প্রথম দেখেছিলাম অনেক বছর আগে ট্যানাসের হাতে; জীবনের বেশির ভাগ সময় যে ছিল রানি লসট্রিসের একনিষ্ঠ; কিন্তু গোপন প্রেমিক। মৃত্যুশয্যায় সে এই তলোয়ার দিয়ে গিয়েছিল লসট্রিসের ছেলে রাজপুত্র মেমননের হাতে। যদিও মেমনন ছিল ট্যানাসের পুত্র; কিন্তু এই কথা তার আসল বাবা-মা বাদে জানতাম শুধু আমি। লসট্রিসের মৃত্যুর পর তার জায়গায় ফারাও পদে অধিষ্ঠিত হয় মেমনন, নাম নেয় ফারাও টামোস। আমার প্রিয় দুই নারী তেহুতি এবং বেকাথার বড় ভাই ছিল সে, এবং সেই হিসেবে সেরেনার দাদু।
ক্রিটের মিনোসের সাথে তার দুই বোনের বিয়ের ব্যাপারে টামোসই সব পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল, আমি তাকে কিছু সাহায্য করেছিলাম মাত্র। বিয়ের উপহার হিসেবে চুনির হাতলওয়ালা এই নীল তলোয়ারটি বোনকে দিয়েছিল সে। সেই ভয়াবহ অগ্ন্যুৎপাতে যখন মিনোস এবং তার দ্বীপ রাজ্যের প্রায় সব কিছু ধ্বংস হয়ে যায় তখন দুই বিধবা বোন তাদের প্রেমিক হুই এবং জারাসের সাথে পালিয়ে আসে। উত্তরে এই ল্যাসিডিমনে নিজেদের রাজ্য গড়ে তোলে তারা। স্বাভাবিকভাবেই মিশরে ফিরে না গিয়ে প্রেমিকদের সাথে পালিয়ে যেতে দুই বোনকে সাহায্য করেছিলাম আমি। এবং স্বাভাবিকভাবেই এই বিখ্যাত অস্ত্র তখন তেহুতির কাছেই ছিল।
অত্যন্ত দক্ষ তলোয়ারযোদ্ধা হওয়ায় টামোসের কাছ থেকে উপহার পাওয়া নীল তলোয়ারের প্রায় প্রেমে পড়ে গিয়েছিল তেহুতি। খুব সম্ভব ক্রিট দ্বীপে ইচ্ছের বিরুদ্ধে রওনা দেওয়ার সময় এই একটা উপহারই সান্ত্বনা জুগিয়েছিল ওকে।
আর কাউকে কখনো এই জাদুকরী তলোয়ার, এমনকি ছুঁতেও দিত না তেহুতি; এমনকি তার স্বামী রাজা হুরোতাসকেও নয়। ঝকঝকে শরতের আকাশের মতো ধাতুর শরীর থেকে শত্রুর রক্তও সে নিজেই ধুয়ে পরিষ্কার করত সব সময়। একমাত্র তেহুতিই তলোয়ারের ধারগুলোকে পালিশ এবং ধার দিয়ে দিয়ে মৃত্যুর মতো নিখুঁত করে তুলেছিল, এবং কাজটা করতে দিয়ে নিজেও পরিণত হয়েছিল দক্ষ কামারে।
তবে হুরোতাস নদীর তীরে একদিন আশ্চর্য এক ঘটনা ঘটল। এই দিনটা ছিল রাজকুমারী সেরেনার চৌদ্দতম জন্মদিন, যেদিন বালিকা থেকে সে নারীত্বে উপনীত হলো। তাকে দেওয়ার জন্য সত্যিই এর চাইতে বড় কোনো উপহার ছিল না।
আমি অবশ্য সেদিন ওদের সাথে ছিলাম না। কেবল রামেসিসকে নিয়ে ল্যাসিডিমনে পৌঁছানোর পরেই তেহুতির কাছ থেকে নিম্নোক্ত ঘটনার বিবরণ শুনেছি আমি। সেরেনার বয়স তত দিনে বিশ বছর হয়ে গেছে।
*
সেই দিন এখানকার সমাজের নিয়ম এবং নিজেদের ইচ্ছা অনুযায়ী মা এবং মেয়ে দুজন মিলে ঘোড়া নিয়ে চলে গিয়েছিল দুর্গ থেকে দূরে হুরোতাস নদীর উজানে। নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছানোর একটু আগে নিজেদের ঘোড়াগুলো চাকরদের হাতে বুঝিয়ে দিয়েছিল তারা। তারপর হাত ধরাধরি করে শেষ এক শ কিউবিট পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছেছিল জলপ্রপাতের পাশে তৈরি করা রাজকীয় বাড়িটায়। পরিচারক বা চাকরদের কেউ ওদের অনুসরণ করেনি। রাজপরিবারের দুই সদস্যের ফিরে আসা পর্যন্ত ওখানেই অপেক্ষা করতে হবে তাদের।
নীল তলোয়ারটাকে কোমরের খাপে বেঁধে নিয়েছিল তেহুতি; কিন্তু সেটা নিয়ে কেউ মাথা ঘামায়নি। কারণ খুব কম সময়েই ওটা কাছ ছাড়া করে সে। সকালে তাদের চাকর এবং পরিচারকরা হাজির হয়েছিল বাড়িটায়। সব কিছু নিখুঁতভাবে পরিষ্কার করে রেখে এসেছে তারা। বড় বড় তামার ফুলদানিতে সাজিয়ে রেখেছে তাজা ফুল, ফলে বাড়ির প্রধান কামরাটা পরিণত হয়েছে যেন এক আনন্দের বাগানে। বসার আসনগুলো সাজানো হয়েছে এলক হরিণের চামড়া আর রেশমি বালিশ দিয়ে। মেঝের মাঝখানে জ্বালানো হয়েছে আগুন, কারণ শীতকাল এখনো বাকি। তারপর দশজন ক্ষুধার্ত মানুষের জন্য যথেষ্ট পরিমাণ খাবার সাজিয়েছে টেবিলের ওপর; কারণ খুব ভালো করেই জানা আছে যে খাবার যা বাকি থাকবে সেগুলো তারাই পাবে।
বাড়ির সীমানার মাঝে প্রবেশ করার প্রায় সাথে সাথেই শরীর থেকে কাপড়ের বন্ধন খুলে ফেলতে শুরু করল তেহুতি আর সেরেনা। কোমর থেকে নীল তুলোয়ারের খাপটা খুলে নিল তেহুতি, তারপর অগ্নিকুণ্ডের সামনে রাখা টেবিলের ওপর যত্নের সাথে রাখল। পরনে থাকা সকল পোশাক এলকের চামড়ায় ঢাকা বালিশের ওপর ছুঁড়ে ফেলল দুজন। তারপর সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে হাত ধরাধরি করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো তারা, দৌড়ে চলে গেল নদীর পাড়ে। সেখানে স্বচ্ছ পানিতে লাফ দিয়ে নেমে পড়ল তারা, বাতাসে উঠল জলকণার মেঘ। পানি প্রচণ্ড ঠাণ্ডা, ফলে দুজনই চমকে উঠল। নদীর ওপর ভাসছে পাহাড় থেকে ভেসে আসা বরফের বড় বড় চাঙড়। একে অপরকে পানি ছিটাতে লাগল তারা, যতক্ষণ না তেহুতি রণে ভঙ্গ দিয়ে পিছিয়ে গেল। মায়ের পিছু ধাওয়া করল সেরেনা, তারপর জোর করে ধরে রাখল ঝরনার পানির নিচে; যতক্ষণ না মাফ চাইল তেহুতি। তার গায়ে প্রচণ্ড শক্তি থাকলেও মেয়ের সাথে পাল্লা দেওয়ার জন্য নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হলো তাকে। মনে হচ্ছিল যেন সেরেনার শরীরটা কোনো মানুষের রক্ত-মাংসে তৈরি নয় বরং ওই নীল তলোয়ারের মতোই রহস্যময় কোনো স্বর্গীয় পদার্থে গড়া হয়েছে তাকে।
