তুমিই তো আমার মামাতো ভাই রামেসিস? মা বলেছিল যে তুমি আমাদের এখানে বেড়াতে এসেছ, জলতরঙ্গের মতো সুরেলা সামান্য চাপা গলায় প্রশ্ন করল ও। নীরব প্রাঙ্গণের প্রতিটি আনাচকানাচে ছড়িয়ে গেল তার কণ্ঠস্বর। ওর চোখে এমন এক আলো খেলা করছে, যেটা ত্রিশ বছর আগের একটা মুহূর্তের কথা মনে করিয়ে দিল; যে মুহূর্তে প্রথমবারের মতো জারাসের চোখে চোখ রেখেছিল তেহুতি। কোনো কথা না বলে শুধু একবার মাথা ঝাঁকাল রামেসিস, সেরেনার নিখুঁত সৌন্দর্য থেকে এক পলকের জন্যও চোখ সরাচ্ছে না।
আমার পাশেই বসে ছিল তেহুতি; কিন্তু দুর্গের প্রাঙ্গণে বসে থাকা কেউ খেয়াল করল না যে কখন যেন টেবিলের নিচ দিয়ে হাত ঢুকিয়ে আমার হাতে চাপ দিয়েছে সে। এই তো! মৃদু কিন্তু উত্তেজিত গলায় ফিসফিস করে বলে উঠল ও। এই তো!
নিজের অভিজ্ঞতা থেকে সেই অলৌকিক মুহূর্তটাকে চিনে নিয়েছে তেহুতি। উনিশ বছর বয়সে অবশেষে নিজের জীবনসঙ্গীকে খুঁজে নিয়েছে তার মেয়ে।
*
এরপর যে সপ্তাহ এবং মাসগুলো কেটে গেল তা আমার স্মৃতিতে ধরে রাখা সময়গুলোর মাঝে অন্যতম সেরা সুখের সময়।
প্রথম খুশির ব্যাপারটা ঘটল তখন যখন রাজা হুরোতাস এবং তার রানি তাদের দুর্গ-প্রাসাদের নিচে সদ্য গড়ে তোলা কোষাগার ঘুরে দেখার জন্য আমাকে আমন্ত্রণ জানাল। পাথরের তৈরি সিঁড়ি দিয়ে অনেকগুলো ধাপ নিচে নামলাম আমরা। সামনে রইল দশজন অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত প্রহরী, পেছনে আরো দশজন। পথ দেখানোর সুবিধার জন্য সবার হাতে রয়েছে জ্বলন্ত মশাল। সব শেষের সিঁড়িটা বেয়ে নেমে আসার পর একটা ভারী ব্রোঞ্জের চাবি দিয়ে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একটা বিশাল দরজার তালা খুলল হুরোতাস। তারপর তিনজন প্রহরী মিলে ঠেলে খুলে ফেলল সেই দরজা।
রাজাকে অনুসরণ করে রাজকীয় ধনভাণ্ডারের ভেতরে ঢুকলাম আমি, আগ্রহের চোখে চাইলাম এদিক-ওদিক। যদিও মাটির নিচে এই অভিযানের কারণ সম্পর্কে আমাকে কিছুই জানানো হয়নি, তবে মনে মনে আন্দাজ করেছিলাম যে এখানে কী চোখে পড়তে পারে আমার। হুরোতাস এবং তেহুতি দুজনই বেশ আগ্রহের সাথে লক্ষ্য করছে আমাকে। প্রায় এক মুহূর্তের মাঝেই যা খুঁজছিলাম তা পেয়ে গেলাম আমি। ভারী গ্রানাইটের টুকরো দিয়ে তৈরি করা দেয়ালের পাশে দাঁড় করানো রয়েছে প্রায় পঁচিশটার মতো সিডার কাঠের তৈরি সিন্দুক। এমনিতে যদিও নিজের আচরণ নিয়ে আমি সব সময় সচেতন তবে এই ক্ষেত্রে একটু ব্যতিক্রম ঘটিয়ে খুশির চিৎকার ছাড়ার জন্য নিশ্চয়ই আমাকে দোষ দেওয়া যায় না। এক দৌড়ে কামরার এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে চলে গেলাম আমি, একটা সিন্দুক দুই হাতে ধরে তোলার চেষ্টা করলাম। পারলাম না। একটার ওপর আরেকটা সাজিয়ে রাখা সিন্দুকের স্তূপ থেকে সবচেয়ে ওপরের সিন্দুকটা নিচে নামানোর জন্য তিনজন প্রহরীর সাহায্য দরকার হলো। তারপর তলোয়ারের মাথা দিয়ে চাড় মেরে সিন্দুকের ডালা খুলে দিল তারা, এবং পিছিয়ে গেল।
আমি লোভী মানুষ নই। কিন্তু আপনাদের মনে রাখতে হবে, মাত্র কয়েক দিন আগেই আমার হাতে থাকা সকল জমিজমা এবং রৌপ্যমুদ্রার শেষ ডেবেন পর্যন্ত বাজেয়াপ্ত হয়ে চলে গেছে ফারাও উটেরিক টুরোর দখলে। যখন নিজের কাছে এক লাখ রৌপ্যখণ্ড থাকে তখন তা নিয়ে মাথায় কোনো চিন্তাই থাকে না। কিন্তু যখন সেই পরিমাণটা নেমে আসে একটিমাত্র ডেবেনে তখন মাথায় ওটা ছাড়া আর কোনো চিন্তার অবকাশ থাকে না।
আমার মনে হয় আর কখনো এমন অবিশ্বাস্য দৃশ্যের মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ পাব না আমি, মশালের আলোতে ঝলমল করতে থাকা সোনা এবং রুপোর বিশাল ভাণ্ডারের দিকে চোখ কুঁচকে তাকানোর চেষ্টা করতে করতে বললাম আমি। অবশ্য বিশেষ কাউকে উদ্দেশ্য করে বলা হলো না কথাগুলো। তারপর হাতের তালু দিয়ে মুছে ফেললাম গাল বেয়ে নামা আনন্দের অশ্রু, এবং ঘুরে তাকালাম রাজা হুরোতাসের দিকে। তার সামনে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লাম আমি। ফিসফিস করে বললাম, ধন্যবাদ, মহামান্য রাজা। তারপর ঝুঁকে এলাম তার পায়ে চুমু খাব বলে। কিন্তু আমাকে কাজটা করার কোনো সুযোগ দিল না সে, সরে গেল সাথে সাথে। আমার দুই কাঁধে দুই হাত রেখে আমাকে তুলে দাঁড় করাল, তারপর চাইল আমার চোখের দিকে।
আমার এবং তেহুতির প্রতি তুমি শত শতবার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছ। তার প্রতিদান হিসেবে এ আর এমন কী? প্রশ্ন করল সে।
বারোজন ক্রীতদাসের সাহায্য নেওয়ার পরেও এই বিশাল সম্পদ সম্পূর্ণ বাছাই করা ওজন করা এবং পরিশেষে আবার আগের জায়গায় তুলে রাখার জন্য পরবর্তী তিন দিন সময় লেগে গেল আমার। দ্রুত একটা হিসাব করে তেহুতি জানাল যে এই সম্পদ আরো অগণিত বছর আমার বিলাসবহুলভাবে বেঁচে থাকার জন্য যথেষ্ট।
অবশ্য সত্যিই যদি ওই অগণিত বছর আয়ু থাকে তোমার, নিজের হিসাবে খুঁত বের করার চেষ্টা করল সে।
সেটা কোনো সমস্যা হবে না, তাকে আশ্বস্ত করলাম আমি। সমস্যা হবে সম্পদ ফুরিয়ে যাওয়ার পরের পাঁচ শ বছর কীভাবে চলব তাই নিয়ে।
হুইয়ের চার ছেলের মাঝে পারিবারিক বন্ধন সত্যিই দৃঢ়। তবে বয়সে বড় হওয়া, সৌন্দর্য, মোহময়ী ব্যক্তিত্ব এবং রাজার একমাত্র মেয়ে হওয়ায় এই দলের অবিসংবাদিত নেত্রী হচ্ছে সেরেনা। ঘূর্ণিবায়ুর মতো নাচতে পারে সে, জানে তুফান বেগে ঘোড়া ছোটাতে। মানুষের পরিচিত প্রতিটা বাদ্যযন্ত্র বাজানোর ক্ষমতা আছে তার, একই সাথে সুরেলা কণ্ঠে তুলতে পারে সাইরেনদের মতো মনমাতানো সুর; যারা নাবিকদের ভুলিয়ে নিয়ে ডুবোপাহাড়ে নিক্ষেপ করত। কিন্তু সেরেনার কণ্ঠস্বরে সর্বনাশের হাতছানি নেই, বরং আনন্দের ইশারা আছে।
