ওর সাথে দেখা করার খুব ইচ্ছে হচ্ছে আমার। মনে হচ্ছে অত্যন্ত সুন্দরী সে, স্বীকার করলাম আমি। উৎসাহ পেয়ে আরো বলে চলল বেকাথা।
ওর চাচারাসহ সবাই বলে যে ও নাকি সৃষ্টির সবচেয়ে সুন্দরী নারী, দেবী আফ্রোদিতির সাথে পাল্লা দিতে পারে। যদিও আমার তা মনে হয় না। সে যাই হোক, এত খুঁতখুঁতে হলে বর আর জুটবে না ওর ভাগ্যে, একা একাই বুড়ি হয়ে মরতে হবে। আমার অন্য পাশে বসে থাকা তেহুতির দিকে দুষ্টুমিভরা দৃষ্টি ছুড়ল বেকাথা। তেহুতিও আমাদের কথা শুনছিল, তবে জবাব দেওয়ার কোনো প্রয়োজন বোধ করল না সে। কেবল লাল জিভের ডগাটা বের করে দেখিয়ে দিল বেকাথাকে।
তো নারীত্বের এই আদর্শ উদাহরণ ব্যক্তিটি এখন কোথায়? জানতে চাইলাম আমি। এসব কথার কোনোটাই আসলে তেমন গুরুত্ব বহন করে না, তবে আমার মনে হলো যে দুজনের মাঝের দুষ্টুমি আরো গুরুতর রূপ নেওয়ার আগেই প্রসঙ্গ বদলে ফেলা ভালো হবে। আজ রাতে কি আমাদের সাথে যোগ দেবে না সে?
এখানে কোনো খালি আসন দেখতে পাচ্ছ? প্রশ্ন করল বেকাথা, একই সাথে চোখ দিয়ে ইশারা করল রাজা হুরোতাসের দিকে। একই টেবিলে আমাদের মুখোমুখি বসে আছে সে। এবং তার বাম পাশের চেয়ারটাই এখন এই জনাকীর্ণ উঠানে একমাত্র খালি আসন। দাঁত বের করে হাসল বেকাথা, তারপর বড় বোনের আগেই কথাটার জবাব দিয়ে দিল, স্পার্টার রাজকুমারী সেরেনা শুধু সেই ঢাকের তালেই নাচে, যার শব্দ সে ছাড়া আর কেউ শুনতে পায় না।
কথাটা বেশ মজার সুরেই বলল সে, ফলে অভিযোগের বদলে প্রশংসার মতো লাগল শুনতে। কিন্তু রাজা হুরোতাস এতক্ষণ মনোযোগর সাথে আমাদের কথা শুনছিল। এবার তাড়াতাড়ি সামনে ঝুঁকে এসে আলোচনায় প্রবেশ করল সে। যখন কোনো সুন্দরী নারী মাত্র এক ঘণ্টা দেরি করে, তখন বুঝতে হবে যে ঠিক সময়ে উপস্থিত হওয়ার জন্য তার চেষ্টার কোনো ত্রুটি ছিল না।
সাথে সাথে চুপ হয়ে গেল বেকাথা। এবার আমি বুঝতে পারলাম এই রাজ্যের প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ আসলে কার হাতে এবং রাজা হুরোতাসের প্রকৃত আনুগত্য আসলে কার প্রতি। উৎসবের কোলাহলে যেন প্রায় একই মুহূর্তে ছেদ টেনে দিল কেউ এবং এক মুহূর্তের জন্য আমার মনে হলো উপস্থিত সবাই বোধ হয় হুরোতাসের কথা শুনেই চুপ হয়ে গেছে। কিন্তু তার পরেই বুঝতে পারলাম কথাটা আসলে স্রেফ দু-একজন ছাড়া কারো কানে যাওয়ার কথা নয়। এবং এই মুহূর্তে হুরোতাস বা অন্য কারো প্রতি কেউ খেয়াল করছে না, বরং সবার দৃষ্টি ঘুরে গেছে দুর্গ থেকে প্রাঙ্গণে প্রবেশের যে দরজাগুলো রয়েছে তার দিকে। একটা দরজা দিয়ে বেরিয়ে এসেছে এক তরুণী। অবশ্য আমার এবং রামেসিসের জীবনে তার প্রবেশের এই ঘটনার বিবরণ এভাবে দিতে গেলে আসলে কিছুই বলা হয় না। যেন হাঁটছে না রাজকুমারী সেরেনা, বরং শরীরে কোনো অংশ না নাড়িয়ে যেন ভেসে চলেছে বাতাসে। তার কোমরের নিচ থেকে পা পর্যন্ত ঢেকে রেখেছে পোশাকের লম্বা ঝুল, এটাই বোধ হয় কারণ। চুলগুলো মাথার ওপর চুড়ো করে বাঁধা, ঝলমলে সোনালি এক মুকুট যেন। কাঁধ এবং বাহুর হালকা রোদে পোড়া ত্বকে কোনো দাগ নেই, ঠিক পালিশ করা মার্বেল বা সদ্য বোনা রেশমের মতো। দিঘল দেহ; কিন্তু প্রতিটি অংশ নিখুঁত অনুপাতে তৈরি।
তাকে আসলে সুন্দরী বলা যায় না, কারণ ওই শব্দটার মাধ্যমে সত্যিকারের সৌন্দর্যের কোনো প্রকাশই বর্ণনা করা যায় না। বিস্ময়কর বললেও বরং কিছুটা বোঝা যায়। তার চেহারার প্রতিটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশই নিখুঁত, এবং যখন সেগুলোকে একসাথে মিলিয়ে দেখা হয় তখন যে আশ্চর্য ঘটনার সৃষ্টি হয় তার বর্ণনা দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। উপস্থিত প্রতিটি মানুষের দৃষ্টি যেন আটকে গেছে তার ওপর। তবে তার সবচেয়ে সুন্দর যে অঙ্গ, অবশ্য যদি এভাবে কিছু নির্বাচন করা যায় আর কি; সেটা হচ্ছে তার চোখ। আকারে বিশাল; কিন্তু মুখের বাকি অংশের সাথে একেবারে নিখুঁতভাবে মানিয়ে গেছে। যেকোনো পান্নার চাইতেও উজ্জ্বল সবুজ চোখগুলো। একই সাথে যেমন তীক্ষ্ণ এবং অনুভূতিপ্রবণ, তেমনি শান্ত এবং উদার দৃষ্টি সে চোখে।
এই সৌন্দর্যের কাছাকাছি আসতে পারে এমন মাত্র দুজন নারীর সাথে পরিচিত হওয়ার সৌভাগ্য হয়েছে আমার। একজন ছিল রানি লসট্রিস, আমার প্রথম ভালোবাসা। আর তারপর আছে সেই নারী, যে এই মুহূর্তে আমার পাশে বসে আছে: রানি তেহুতি, যে ছিল আমার দ্বিতীয় ভালোবাসা এবং এখনো তাই আছে। এখন যে তরুণীকে আমার সামনে দেখছি, লসট্রিস এবং তেহুতি যথাক্রমে তার নানি এবং মা।
তবে নিঃসন্দেহে রাজকুমারী সেরেনা হচ্ছে আমার দেখা জীবিত এবং মৃত সকলের মাঝে সবচেয়ে সুদর্শনা এবং স্নিগ্ধ নারী।
আমার পাশে বসে থাকা তেহুতিকে খুঁজে নিল ওর দৃষ্টি, এবং অনিন্দ্যসুন্দর হাসি ফুটল ঠোঁটে। তার পরেই টেবিলের শেষ প্রান্তে বসে থাকা রামেসিস উঠে দাঁড়াল, এবং নড়াচড়ার ফলে ওর দিকে আকৃষ্ট হলো সেরেনার চোখ। সাথে সাথে ওর ঠোঁটে ফুটে ওঠা হাসিটুকু মিলিয়ে গেল, তার বদলে চেহারায় ফুটল অবাক বিস্ময়। হাঁটার মাঝখানে এক পা তুলে রাখা অবস্থাতেই থমকে গেল ও, কাপড়ের নিচ থেকে উঁকি দিল একটা স্যান্ডেলের অগ্রভাগ। পরস্পরের দিকে দীর্ঘ এক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল দুজন, যে সময়টায় পৃথিবীর আর কোনো মানুষের অস্তিত্ব রইল না তাদের মাঝে। একসময় পা-টা নামিয়ে মাটিতে রাখল সেরেনা; কিন্তু চোখগুলো তখনো আটকে রইল রামেসিসের ওপর। তারপর হঠাৎ লজ্জায় গোলাপের মতো লাল হয়ে উঠল ওর গাল। এবং ব্যাপারটা যদিও অসম্ভব; কিন্তু এই লাজুকতা যেন আরো সুন্দরী করে তুলল ওকে।
