আবর্জনার ঝড়! তারপর, পাঁজির পা-ঝাড়া! খুব ভালো করেই মনে আছে। আমার। তেহুতির সাথে মিশল রামেসিসের হাসি। তখন আমার বয়স মাত্র তিন কি চার, ওদিকে তুমি তখন ষোলো কি সতেরো বছরের বুড়ি। কিন্তু ওই মিষ্টি মিষ্টি কথাগুলো এখনো আমার কানে মধুর মতো লেগে আছে!
লাফ দিয়ে ঘোড়া থেকে নামল তেহুতি, ভাইপোর দিকে দুই হাত বাড়িয়ে দিল। এদিকে এসে তোমার এই বুড়ি ফুপুকে একটা চুমু দাও দেখি, দুষ্টু ছেলে!
অত্যন্ত আনন্দের সাথে দুজনকে আলিঙ্গন করতে দেখলাম আমি, এবং আনন্দটা শুধু এ জন্য নয় যে, রামেসিসের সাথে আপাতত আমাকে পৃথিবীর শেষ প্রান্ত থেকে লাফ দিতে হচ্ছে না। এই পুনর্মিলনী সভা শেষ হতে হতে বেশ সময় লেগে গেল, কারণ স্বাভাবিকভাবেই বেকাথাও যোগ দিল এই আনন্দের উৎসবে। তবে শেষ পর্যন্ত আবার ঘোড়ায় উঠলাম, আমরা দুর্গের দিকে এগোতে শুরু করলাম। দুই বোন রইল রামেসিসের দুই পাশে, স্পর্শ করা যায় এমন দূরত্বে।
দুর্গের কাছাকাছি আসতেই খুলে গেল বিশাল দরজা। রাজা হুরোতাসকে দেখা গেল দুর্গ-প্রাচীরের গায়ে তৈরি করা অস্থায়ী কাঠামোর ওপর থেকে নেমে আসছে। এগুলো তৈরি হয়েছে দুর্গের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বাড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কারকাজ শেষ করতে। এতক্ষণ ওর ওপর দাঁড়িয়ে কর্মীদের দিকনির্দেশনা দিচ্ছিল সে। চেহারা-সুরতে যতটা না রাজা তার চাইতে বেশি ওই মিস্ত্রিদের মতোই অবস্থা হয়েছে তার। সারা গায়ে ধুলোবালি ভর্তি। দূর থেকেই আমাকে চিনে ফেলেছে সে, যেটা খুবই স্বাভাবিক। ভিড়ের মাঝেও কারো দৃষ্টি এড়িয়ে যাব, এমন মানুষ নই আমি। তা ছাড়া নিজের স্ত্রী এবং তার বোনকে অচেনা এক আগন্তুক যুবকের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে লেগে থাকতে দেখেও বেশ আশ্চর্য হয়েছে সে।
এ হচ্ছে আমার ভাইপো রামেসিস! পঞ্চাশ কদম দূরে থাকতেই স্বামীকে উদ্দেশ্য করে চেঁচিয়ে উঠল তেহুতি।
আমাদের ভাই টামোসের মেজ ছেলে, আরেকটু বুঝিয়ে বলার প্রয়োজন বোধ করেছে বেকাথা। ও আসলে নিশ্চিত করতে চাইছে যে, ভাইপো কথাটার অর্থ নিয়ে যেন কোনো সন্দেহের অবকাশ না থাকে। এবং তুমি আর টাইটা মিলে যখন উটেরিককে পৃথিবীর বুক থেকে মুছে ফেলবে তখন ওই হবে মিশরের ফারাও। ইতোমধ্যে রাজা নির্বাচক পদে নির্বাচিত করা হয়েছে আমাকে, কথাটা শুনে বেশ অবাক হলাম আমি। তবে হুরোতাস সম্ভবত বেকাথার এ ধরনের দিবাস্বপ্ন দেখার স্বভাবের সাথে পরিচিত। সরাসরি এগিয়ে এসে রামেসিসকে জড়িয়ে ধরল সে, একই সাথে তার পরনের পোশাকে নিজের গায়ে লেগে থাকা ধুলোবালির একটা বড় অংশ স্থানান্তর করল।
শেষ পর্যন্ত রামেসিসকে ভালোবাসা জানানোর পালা শেষ হলো তার। বেকাথার মতোই জোর গলায় ঘোষণা করল, যুবরাজ রামেসিসকে স্বাগত জানানোর জন্য একটি উৎসবের আয়োজন করতেই হবে আমাদের। বাবুর্চিদের জানিয়ে দাও যে আজ রাতে এক ভোজের আয়োজন করছি আমি, যেখানে সবার জন্য ভালো খাবার এবং আরো ভালো মদের ব্যবস্থা থাকবে।
*
সেই সন্ধ্যায় দুর্গের ভেতরের উঠানে বারোটার মতো বিশাল অগ্নিকুণ্ড জ্বালিয়ে চারদিকে আলোকিত করে তোলা হলো। সেইসাথে টেবিল পাতা হলো ল্যাসিডিমনের কয়েক শ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির জন্য। রাজা এবং তার পরিবারের সদস্যরা বসল প্রাঙ্গণের মাঝে একটা উঁচু মঞ্চের ওপর, যেখান থেকে তাদের সবাইকে স্পষ্ট দেখতে পাবে বাকি সবাই। আমি বসলাম আমার দুই প্রিয় মানুষ তেহুতি এবং বেকাথার ঠিক মাঝখানে। আমাদের ঠিক নিচেই বসার ব্যবস্থা হয়েছে বেকাথা এবং হুইয়ের ছেলেদের। চারজন সুদর্শন তরুণ, রাজা খামুদিকে বিতাড়নের অভিযানে এরা সবাই গিয়েছিল মিশরে। যদিও তখন খুব অল্প সময়ের জন্য ওদের দেখেছিলাম আমি; কিন্তু মানবচরিত্র বিচারে আমার কখনো ভুল হয় না। এক নজরেই বুঝতে পারলাম যে বেকাথা সত্যিই ফারাও রক্তের মান রেখেছে, তার ছেলেরা সবাই মিশরের অভিজাত বংশধারার উৎকৃষ্ট নিদর্শন। ছেলেদের মাঝে দুজন ইতোমধ্যে বিয়ে করেছে, তাদের সুন্দরী স্ত্রীরাও বসেছে একই সাথে। সবার বয়সই হবে রামেসিসের কাছাকাছি, এবং তার সাথে উপযুক্ত সম্মানসূচক আচরণই করছে তারা। ওদের সম্পর্কে আমার মনোভাবের কথা জানালাম বেকাথাকে। একটুও অবাক না হয়ে আমার প্রশংসা গ্রহণ করল সে, ছেলেদের গুণ সম্পর্কে সম্পূর্ণ নিঃসন্দেহ।
সত্যি কথা বলতে, আমি ভেবেছিলাম আমার ছেলেদের মাঝেই কেউ ওদের চাচাতো বোন সেরেনাকে বিয়ে করবে, আমাকে জানাল সে। ইতোমধ্যে আমি জেনে গেছি যে সেরেনা হচ্ছে তেহুতির সেই রহস্যময় কন্যার নাম। রাজা হুরোতাস অর্থাৎ তার বাবার পাশে একটা চেয়ার এখনো খালি পড়ে আছে তার অপেক্ষায়। ওদিকে প্রায় এক নিঃশ্বাসে বলে চলেছে বেকাথা: ওদের চারজনই এক এক করে সেরেনাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছে কিন্তু সবাইকেই দক্ষভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে ও। বলেছে যার সাথে একই সাথে ন্যাংটো হয়ে গোসল করেছে, একই পাত্রে প্রস্রাব করার সময় নিজেদের গোপনাঙ্গের পার্থক্য নিয়ে আলোচনা করেছে তাদের কাউকে ওর পক্ষে বিয়ে করা সম্ভব হবে না। কিন্তু আরো কয়েক শ পুরুষ, যারা ওকে একই প্রস্তাব দিয়েছে তাদের ও কী বলে ফিরিয়েছে সেটা জানতে খুব ইচ্ছে করে আমার। পৃথিবীর অপর প্রান্ত থেকেও ওকে বিয়ে করার জন্য প্রস্তাব এসেছে; কিন্তু কেউই পাত্তা পায়নি।
