এটা শুধু হিংসে আর কিছুই নয়, আপত্তি জানাল বেকাথা। বুঝলে টাইটা, আমার বেচারা বোনটা কেবল এক সন্তানের জন্ম দিয়েছে। তাও একটা মেয়ে। তবে এই কথায় কিছুই মনে করল না তেহুতি। বোঝা গেল আগেও বোনের কাছ থেকে বহুবার এই খোঁচা সহ্য করেছে সে, ফলে এখন আর এতে কোনো প্রতিক্রিয়া হয় না তার।
মাথায় রুপালি চুলের ঢল নেমেছে, তা সত্ত্বেও তেহুতি এখনো দারুণ দেখতে। কে জানে, হয়তো চুলগুলোই এর কারণ। চেহারায় কোনো বয়সের ছাপ বা রেখা পড়েনি, শরীর এখনো হালকা-পাতলা; কিন্তু শক্ত পেশিতে গড়া। শরীরের পোশাকে কোনো ফুল-লতা-পাতার নকশা বা নারীসুলভ চপলতার চিহ্ন নেই; বরং সৈনিকদের টিউনিক পরে আছে সে। চলাফেরায় নারীসুলভ কমনীয়তা যেমন আছে তেমনি আছে পুরুষের আত্মবিশ্বাস আর দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ভাব। সহজেই হাসি ফোটে তার ঠোঁটে; কিন্তু উপযুক্ত কোনো কারণ থাকলে তবেই। দাঁতগুলো সমান ঝকঝকে সাদা। দৃষ্টি তীক্ষ্ণ বুদ্ধিদীপ্ত। শরীরে অনেকটা ফলবান আপেল গাছের মতো ঘ্রাণ। খুব সহজেই আবার আমার ভালোবাসা জয় করে নিয়েছে সে।
বেকাথার দিকে তাকিয়ে আমি বুঝতে পারলাম বড় বোনের ঠিক উল্টোটা হয়েছে সে। তেহুতি যদি হয় যুদ্ধের দেবী অ্যাথেনা তাহলে বেকাথা হচ্ছে ধরিত্রীর দেবী গেইয়া। মোটাসোটা চেহারা, গায়ের রং গোলাপি। পূর্ণ চন্দ্রের মতো গোলাকার মুখ; কিন্তু আরো উজ্জ্বল ঝকঝকে। একটুতেই হেসে গড়িয়ে পড়ছে, হয়তো জীবন তার কাছে অত্যন্ত আনন্দময় বলেই। আমার মনে পড়ল শেষবার যখন দেখেছিলাম তখন ছোট্ট একটা মেয়ে ছিল সে, আকারে ছিল তার স্বামী হুইয়ের অর্ধেক। কিন্তু বেশ কয়েক সন্তানের জননী হওয়ার সাথে সাথে যদিও এখন বেশ মুটিয়ে গেছে বেকাথা তবু তাকে আগের মতোই ভালোবাসে হুই। এবং একটু পরেই আমি বুঝতে পারলাম ভালো তাকে আমিও বাসি।
দলের বাকিদের চাইতে বেশ সামনে সামনে ঘোড়া ছুটিয়ে এগিয়ে চললাম আমরা। হুই এবং রামেসিস ইচ্ছে করেই আমাদের আলাদা থাকতে দিল, যাতে দুই বোনের সাথে আমার সম্পর্কটা আবার জোড়া লাগিয়ে নিতে পারি। অবশ্য আমাদের ভেতরে এত কথা জমা হয়ে আছে যে এই সামান্য সময়ে সেগুলো মোটেও শেষ হবে না। সত্যিই কথা শেষ হওয়ার আগেই আমরা শ্রেষ্ঠ সুন্দরী স্পার্টার দুর্গ-প্রাসাদের প্রধান ফটকে এসে পৌঁছলাম।
যদিও বহু দশক ধরেই ক্রীতদাসের দল এর ওপর কাজ করে যাচ্ছে, তবু এখনো সম্পূর্ণ হয়নি দুর্গের নির্মাণকাজ। তবে বিশাল প্রাচীর পরিখা এবং অন্যান্য প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দেখে আন্দাজ করলাম, আমার জানা মতে যত সেনাবাহিনী আছে তাদের মাঝে সবচেয়ে শক্তিশালী দলের আক্রমণও খুব সহজেই ঠেকিয়ে দিতে পারবে এই দুর্গ। ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরলাম আমি, কাছ থেকে ভালোভাবে দেখতে চাই সব কিছু। ইতোমধ্যে পেছন থেকে হুই আর রামেসিস এসে যোগ দিল আমাদের সাথে।
তেহুতি এবং বেকাথা উভয়েই এবার তাদের মনোযোগ ফেরাল রামেসিসের দিকে। তাতে অবশ্য আমার কোনো আফসোস হলো না। ইতোমধ্যে তাদের মনোযোগের যথেষ্টরও বেশি ভাগ পেয়েছি আমি, রামেসিস সত্যিই দৃষ্টি আকর্ষণ করার মতোই একজন মানুষ। সত্যি কথা বলতে ওর সাথে তুলনা করা যায় এমন কাউকে এখনো দেখিনি আমি। হয়তো একটু বাড়িয়ে বলা হলো; কিন্তু ভদ্রতার খাতিরে এর বেশি কিছু আমি বলতেও চাই না। তাই ওদের একলা ছেড়ে দিয়ে আমি একটু পেছনে সরে এলাম।
তোমার পরিচয় কী যুবক? বেকাথার মাঝে কখনো পিছিয়ে থাকার লক্ষণ ছিল না, এখনো নেই। সরাসরি রামেসিসকে লক্ষ্য করছে সে।
আমার তেমন কোনো পরিচয় নেই, মহামান্যা, ভদ্রতার হাসি হেসে প্রশ্নটা এড়িয়ে গেল রামেসিস। আমি শুধু ওই জাহাজের ক্যাপ্টেন, যাতে করে প্রভু টাইটা এই সুন্দর দ্বীপে আপনাদের সাথে দেখা করতে এসেছেন। আমার নাম ক্যাপ্টেন রামি। আমি এবং রামেসিস দুজনই একমত হয়েছি যে, মিশরের সিংহাসনের সাথে রামেসিসের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা এখনই সবার সামনে প্রকাশ করা উচিত হবে না। সবাই জানে সবচেয়ে অগম্য স্থানেও ফারাও উটেরিক টুরোর গুপ্তচর পৌঁছে যেতে পারে।
ওদিকে তেহুতি সম্পূর্ণ অন্য রকম এক দৃষ্টিতে রামেসিসের দিকে তাকিয়ে আছে। তার বোনের ঠাট্টা-তামাশার কোনো চিহ্ন নেই সেই দৃষ্টিতে।
মিশরীয় রাজপরিবারের সদস্য তুমি, মনে হলো যেন মন্তব্য নয়, বরং অভিযোগের সুরে কথাটা ছুঁড়ে দিল সে।
আপনি কীভাবে জানলেন, মহামান্যা? অবাক হয়ে প্রশ্ন করল রামেসিস।
তুমি যখন কথা বলছ তখন তোমার বাচনভঙ্গি খেয়াল করলেই বোঝা যায়, কয়েক মুহূর্ত রামেসিসের দিকে তাকিয়ে থেকে তারপর জবাব দিল তেহুতি। তারপর আরো নিশ্চিত গলায় বলে উঠল, তোমাকে দেখে আমার এমন একজনের কথা মনে পড়ছে যাকে আমি খুব ভালোভাবেই চিনি; কিন্তু বহু বছর দেখিনি। দাঁড়াও একটু ভেবে দেখি! তার পরেই আবার বদলে গেল তার অভিব্যক্তি; কিন্তু এবার আগের চাইতে অবাক ভাব ফুটল চেহারায়। তোমাকে দেখে আমার ভাই ফারাও টামোসের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে- মাঝপথে থেমে গেল সে, অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল তার আত্মীয়ের দিকে। রামি! আরে তাই তো! তুমি আমার ভাইপো রামেসিস। তার পরেই আমার দিকে ফিরল চোখে ভর্ৎসনা। কিন্তু একই সঙ্গে খুশিতে ঝকমক করে উঠল তার চোখজোড়া, ঠোঁটে লুকায়িত হাসি। তুমি খুব দুষ্টু, টাটা! আমাকে এমনভাবে ধোঁকা দেওয়ার চেষ্টা কীভাবে করলে তুমি? আমি যেন আমার নিজের রক্ত-মাংসকেও চিনতে পারব না। ওকে তো আমিই প্রথম গালি দিতে শিখিয়েছিলাম। তোমার মনে নেই রামেসিস?
