দূর থেকে জায়গাটাকে দেখার জন্য অবশ্য বেশি সময় নষ্ট করলাম না আমি। তবে তাড়াহুড়ো করার আরো একটা কারণ হচ্ছে, হুই জায়গাটার ইতিহাস শোনাচ্ছিল আমাকে। নৌ সেনাপতি হিসেবে সে প্রথম শ্রেণির হতে পারে; কিন্তু বক্তা হিসেবে একেবারেই দুগ্ধপোষ্য শিশু। তাই ঘোড়ার পেটে আলতো করে পা দিয়ে চাপ দিলাম আমি, তারপর সবাইকে সাথে নিয়ে হালকা চালে দুর্গ লক্ষ্য করে এগোতে শুরু করলাম। বেশ কিছুটা দূরে থাকতেই খেয়াল করলাম পরিখার ওপর নামিয়ে দেওয়া হচ্ছে টানা-সেতু। সেতুর অগ্রভাগ মাটি স্পর্শ করার সাথে সাথে তার ওপর দিয়ে পূর্ণ গতিতে ঘোড়া ছুটিয়ে এগিয়ে এলো দুই অশ্বারোহী, প্রতি মুহূর্তে বাড়ছে তাদের কণ্ঠস্বর থেকে বেরিয়ে আসা উত্তেজিত আনন্দের চিৎকারের তীব্রতা।
*
সামনের অশ্বারোহীকে এক নজরেই চিনে নিলাম আমি। তেহুতিই রয়েছে সামনে, সব সময় যেমন থাকে সে। বাতাসে পতাকার মতো উড়ছে তার লম্বা চুল। শেষবার যখন দেখেছিলাম তখন মরিচার মতো লাল রং ছিল তার চুলের; কিন্তু এখন তা ধবধবে সাদা; সূর্যের আলোয় পেছনের ট্যাগেটাস পর্বতমালার তুষারের মতোই ঝলমল করছে। কিন্তু এই দূরত্ব থেকেও স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে তরুণী অবস্থায় যেমন ছিল; এখনো ঠিক তেমনই হালকা-পাতলা দেহসৌষ্ঠবের অধিকারী সে।
তার পেছনে অপেক্ষাকৃত মন্থরগতিতে আসছে আরো একজন মহিলা, যার বয়স এবং ওজন দুটোই তেহুতির চাইতে বেশি। আমি নিশ্চিত, এর সাথে আগে কখনো দেখা হয়নি আমার।
উল্লসিত চিৎকার ছুঁড়তে ছুঁড়তেই পরস্পরের মুখোমুখি হলাম আমি আর তেহুতি। ঘোড়ার গতি প্রায় না কমিয়েই নেমে পড়লাম আমরা এবং মাটি থেকে পড়ার পরেও ভারসাম্য না হারিয়ে দুই পায়ে খাড়া হয়ে থাকতে পারলাম। নিজেদের ভরবেগটুকু ব্যবহার করলাম পরস্পরের দিকে ছুটে যাওয়ার কাজে। শক্ত করে পরস্পরকে জড়িয়ে ধরলাম আমরা।
একই সাথে কাঁদছে আর হাসছে তেহুতি। এতগুলো বছর কোথায় লুকিয়ে ছিলে, দুষ্টু ছেলে কোথাকার? আমি তো ভেবেছিলাম আর কখনো আমাদের দেখাই হবে না! আনন্দের অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে ওর গাল বেয়ে, থুতনিতে এসে জমা হয়ে ফোঁটায় ফোঁটায় পড়ছে নিচে।
আমার মুখও ভিজে গেছে। অবশ্য সেটা আমার নিজের অশ্রু নয়, বরং তেহুতির চোখের পানিই এসে লেগেছে আমার গালে। কত কথা জমে আছে ওকে বলার জন্য; কিন্তু এখন মনে হচ্ছে যেন গলায় আটকে গেছে কথাগুলো। তাই কেবল শক্ত করে ওকে জড়িয়ে ধরে রইলাম আমি; মনে মনে প্রার্থনা করছি যেন আর কখনো পরস্পরের কাছ থেকে আলাদা না হই আমরা।
ইতোমধ্যে তেহুতির সঙ্গী আমাদের কাছাকাছি এগিয়ে এসেছে। সাবধানে ঘোড়া থেকে নামল সে; তারপর দুই হাত বাড়িয়ে দিয়ে এগিয়ে এলো আমাদের দিকে।
টাইটা! তোমার অভাব যে কত তীব্রভাবে বোধ করেছি আমি তা বলে বোঝাতে পারব না। হাথোর এবং অন্য সকল দেব-দেবীকে ধন্যবাদ যে তারা তোমাকে আমাদের কাছে ফিরিয়ে দিয়েছেন, সুরেলা কণ্ঠে বলে উঠল সে। এতগুলো বছর পরেও সেই কণ্ঠস্বর একটুও বদলায়নি। এবং কণ্ঠটা শোনার সাথে সাথেই সেটা চিনতে পারলাম আমি এবং ক্ষীণ অপরাধবোধ জেগে উঠল আমার মনে।
বেকাথা! চিৎকার করে উঠলাম আমি, তারপর শক্ত করে জড়িয়ে ধরলাম তাকে। তবে আরেক হাতে ঠিকই তেহুতিকে ধরে রেখেছি আমার আলিঙ্গনে। তেহুতির ছোট বোন বেকাথা, যদিও তার আকার দেখে এখন আর তাকে ছোট বলার উপায় নেই।
তিনজন একে অপরকে জড়িয়ে ধরে রেখে দাঁড়িয়ে রইলাম আমরা, একই সাথে কাঁদছি আর হাজারটা অর্থহীন কথাবার্তা বলে চলেছি পরস্পরকে উদ্দেশ্য করে। যে দীর্ঘ বছরগুলো আমাদের আলাদা করে রেখেছিল তার দুঃসহ স্মৃতি যেন মুছে ফেলতে চাইছি এই কথাগুলোর মাঝ দিয়ে। দুজনের মাঝে তেহুতির নজর বরাবরই একটু বেশি তীক্ষ্ণ ছিল। হঠাৎ করেই সে বলে উঠল, একটা ব্যাপার খুব অদ্ভুত লাগছে আমার, বুড়ো বন্ধু টাইটা। অনেকগুলো বছর আগে শেষবার যখন তোমাকে বিদায় জানাই তার পর থেকে একটুও বদলায়নি তোমার চেহারা। সত্যি কথা বলতে, আরো যেন তরুণ হয়ে উঠেছ তুমি, আরো সুদর্শন হয়েছ।
স্বাভাবিকভাবেই আপত্তি জানানোর চেষ্টা করলাম আমি। কিন্তু কোনো জিনিসকে সঠিকভাবে বর্ণনা করার একটা স্বাভাবিক গুণ ছিল তেহুতির এবং এখনো একটুও বদলায়নি সেটা।
আমার যত দূর মনে আছে তার চাইতে অনেক বেশি সুন্দরী হয়েছ তোমরা দুজনই, পাল্টা জবাব দেওয়ার চেষ্টা করলাম আমি। তোমরা নিশ্চয়ই জানো যে কিছুদিন আগেই তোমাদের স্বামীদের সাথে কথা হয়েছে আমার; কিন্তু তাতে তোমাদের দেখার ইচ্ছে কমেনি, বরং আরো বেড়ে গেছে। বেকাথা, তোমার চার ছেলে যখন হিকসস আধিপত্য থেকে মিশরকে মুক্ত করতে এসেছিল তখন তাদের সাথে দেখা হয়েছে আমার। কিন্তু সেটা ছিল খুবই অল্প সময়ের জন্য। এখন ওদের সম্পর্কে সব কিছু আবার তোমার কাছ থেকে শুনতে চাই আমি। যেকোনো মায়ের জন্যই তার সন্তানদের কথা সব সময়ই সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয়। প্রাসাদ পর্যন্ত বাকি পথটুকু নিজের ছেলেদের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেই কাটাল বেকাথা।
আমার বোন যতটা বলছে এমন সোনার টুকরো নিশ্চয়ই নয় ওরা, দুষ্টুমির ভঙ্গিতে আমার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপল তেহুতি। কিন্তু তেমন নিখুঁত কে-ই বা আছে বলো?
