এ তো প্রভু টাইটা! উত্তেজিত গলায় বলাবলি করছে তারা, আমার দিকে ইঙ্গিত করছে আঙুল তুলে।
টাইটা! টাইটা! বাকিরাও এবার তাদের উত্তেজিত চিৎকারে যোগ দিল। দলবেঁধে বন্দরের ঘাটলায় এসে জড়ো হলো সবাই, আমাকে স্বাগত জানাতে চায়। তীরে নামার সাথে সাথে আমাকে ছুঁয়ে দেখার প্রতিযোগিতা লেগে গেল সবার মাঝে, কেউ কেউ তো অত্যুৎসাহী হয়ে আমার পিঠ চাপড়ে দিতে চাইল। কয়েকবার হোঁচট খেয়ে পড়তে পড়তে বেঁচে গেলাম আমি। শেষ পর্যন্ত হুই আর রামেসিস মিলে তাদের বিশজন লোকের সাহায্যে আমার চারদিকে বেষ্টনী তৈরি করল, যাতে আমার কোনো অসুবিধা না হয়। তারপর হট্টগোলের মাঝ থেকে আমাকে বের করে বাইরে নিয়ে যাওয়া হলো। সেখানে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল কয়েকটা ঘোড়া, যেগুলো আমাদের নিয়ে যাবে সেই উপত্যকায়, যেখানে রাজা হুরোতাস এবং রানি স্পার্টা তাদের রাজধানী তৈরি করছেন।
উপকূল এলাকা ছাড়িয়ে যত সামনে যেতে লাগলাম ততই বাড়তে লাগল প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। দৃষ্টিসীমার ঠিক প্রান্তে সব সময় ভেসে আছে তুষারে ঢাকা পাহাড়চূড়াগুলো, মনে করিয়ে দিচ্ছে যে কিছুদিন আগেই শীতকাল গেছে। পাহাড়ের পাদদেশে ঘন সবুজ কোমর সমান লম্বা ঘাস আর নানা রকমের ফুলের গাছে ঢাকা তৃণভূমি, ট্যাগেটাসের চূড়া থেকে নেমে আসা মৃদু বাতাসে যেন মনের আনন্দে মাথা দোলাচ্ছে তারা। বেশ কিছুটা পথ হুরোতাস নদীর কিনার ধরে পাড়ি দিলাম আমরা। তুষারগলা পানিতে ফুলে উঠেছে নদী; কিন্তু সে পানি এত পরিষ্কার যে ঢেউয়ের বিপরীতে ভেসে থাকা বড় বড় মাছগুলোকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে তাতে। বরফঠাণ্ডা পানিতে বুক পর্যন্ত ডুবে ঘুরে বেড়াচ্ছে অর্ধনগ্ন নারী-পুরুষের দল, হাতে বোনা লম্বা জাল টানছে কয়েকজনে মিলে। জালে ধরা পড়ছে মাছগুলো, সেগুলোকে তীরে তুলে এনে স্কুপ করা হচ্ছে। সেই কূপ থেকে সবচেয়ে বড় দেখে পঞ্চাশটা মাছ কিনে নিল হুই, রাজপ্রাসাদের রান্নাঘরে সরাসরি পাঠিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হলো সেগুলোকে।
নদীতে দেখা এই মানুষগুলো ছাড়াও পথের পাশে মাঝে মাঝে দেখা যেতে লাগল ছোট ছোট ছেলেদের। ফাঁদ পেতে ধরা পায়রা আর তিতির বিক্রি করছে তারা। তার সাথে আরো দেখা গেল ছোট ছোট দোকান, বুনো ষাড় আর হরিণের মাংস বিক্রি হচ্ছে সেখানে। মাঠে চরে বেড়াচ্ছে গবাদিপশুর দল: গরু, ছাগল, ভেড়া এবং ঘোড়া। সবগুলোই সুস্বাস্থ্যের অধিকারী, মোটাসোটা আর চকচকে লোমে ঢাকা শরীর। মাঠে যেসব নারী-পুরুষ কাজ করছে তারা সবাই হয় একেবারেই তরুণ অথবা একেবারেই বৃদ্ধ। কিন্তু সবার মাঝেই একই রকম সন্তুষ্টির ভাব স্পষ্ট। আমাদের দেখে চিৎকার করে শুভেচ্ছা জানাল তারা।
রাজধানীর কাছাকাছি পৌঁছানোর পরেই কেবল বদলাতে শুরু করল মানুষজনের চেহারা। এখন বেশির ভাগই বয়সে তরুণ, সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার উপযুক্ত। দক্ষ হাতে তৈরি বড় বড় সেনানিবাসে তাদের বসবাসের ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রশিক্ষণ এবং যুদ্ধবিদ্যা শেখায় পুরোদস্তুর মগ্ন সবাই। তাদের রথ, বর্ম আর অস্ত্রগুলো দেখে বোঝা গেল সবই সর্বাধুনিক কৌশলে তৈরি। সেগুলোর মাঝে দুই দিক বাঁকানো ধনুক আর হালকা কিন্তু শক্তপোক্ত চার ঘোড়ায় টানা রথও আছে।
বেশ কয়েকবার তাদের অনুশীলন দেখার জন্য থামলাম আমি। খুব দ্রুতই একটা জিনিস পরিষ্কার হয়ে গেল। সেটা হচ্ছে, এরা সবাই প্রথম শ্রেণির দক্ষ সৈনিক, যেকোনো মুহূর্তে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত। প্রশিক্ষণের সর্বোচ্চ অংশটুকু আদায় করে নিচ্ছে সবাই। কেবল হুরোতাস আর হুইয়ের মতো দক্ষ যোদ্ধাকে এদের সেনাপতি হিসেবে পাওয়া গেলেই এটা সম্ভব।
উপকুল ছেড়ে আসার পর থেকেই ধীরে ধীরে সমতল ছেড়ে ওপরে উঠছি আমরা। প্রায় চার লিগ পথ পাড়ি দেওয়ার পর জঙ্গলে ঢাকা একটা ঢালু জমি বেয়ে উঠে এলাম আমরা এবং আবারও থমকে দাঁড়ালাম। তবে এবার অবাক বিস্ময়ে, কারণ আমাদের সামনে এখন দেখা যাচ্ছে চারপাশে উঁচু পাহাড়ে ঢাকা এক টুকরো সমতলভূমি। আর তার মাঝখানে গড়ে উঠেছে এই রাজ্যের রাজধানী।
সমতলের মাঝ দিয়ে বয়ে গেছে হুরোতাস নদী। তবে একটা নয়, বরং দুটো শক্তিশালী স্রোতস্বিনীতে নদীটা ভাগ হয়ে গেছে এখানে। দুই ধারার মাঝখানে গড়ে তোলা হয়েছে প্রধান দুর্গ, যাকে একই সঙ্গে রাজপ্রাসাদও বলা যায়। প্রাসাদকে ঘিরে প্রাকৃতিক পরিখা তৈরি করেছে নদীটা। সমতলের শেষ প্রান্তে নদীর দুই ধারা আবার এক হয়ে সামনে এগিয়ে গেছে সেই গিথিয়ন বন্দর পর্যন্ত।
দুৰ্গটা আসলে গড়ে উঠেছে মাটির ভেতর থেকে উঠে আসা আগ্নেয়শিলার ওপর ভিত্তি করে। কোনো এক প্রাচীন রাজার বাসভবন ছিল এটা। একসময় এখান থেকে চলে যায় সে। তারপর ট্যাগেটাস পর্বতমালায় বসবাসকারী বর্বর উপজাতি নেগলিন্টদের দখলে চলে যায় এই প্রাসাদ-দুর্গ। নেগলিন্টরা আবার পরাজিত হয় রাজা হুরোতাস এবং অ্যাডমিরাল হুইয়ের কাছে এবং তাদের দাসে পরিণত হয়।
নতুন পাওয়া এই দাসদের কাজে লাগিয়ে প্রাসাদের দুর্ভেদ্যতা আরো বাড়িয়ে তুলেছে হুরোতাস আর হুই, ফলে এখন তা প্রায় অজেয়। ভেতরটা শুধু সুপ্রশস্ত ই নয়, দারুণ আরামদায়কও বটে। এই জায়গাকেই নিজের নতুন দেশের রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলার দৃঢ়প্রতিজ্ঞা করেছে হুরোতাস।
