অনেক লিগ চওড়া একটা উপসাগরের মুখে প্রবেশ করলাম আমরা। এই হচ্ছে গিথিয়ন উপসাগর। এখানে অবশ্য ঢেউগুলো আরো শান্ত, অপেক্ষাকৃত ছোট ছোট। তীরের আরো কাছাকাছি এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাওয়া গেল এখান থেকে। পাহাড় থেকে নেমে আসা একটা নদীর চওড়া মুখের পাশ কাটিয়ে এগিয়ে গেল আমাদের জাহাজ।
এর নাম হুরোতাস নদী, আমাকে জানাল হুই। তোমার খুব পরিচিত একজনের নামে রাখা হয়েছে এই নাম।
তার রাজধানী কোথায়? প্রশ্ন করলাম আমি।
এখান থেকে প্রায় চার লিগ ভেতরে, জবাব দিল হুই। ইচ্ছে করেই সাগরের তীর থেকে দূরে জায়গাটাকে তৈরি করেছি আমরা, যাতে অনাকাক্ষিত অতিথিদের এড়িয়ে থাকা যায়।
তাহলে তোমাদের নৌবাহিনী কোথায় থাকে? তোমাদের নৌশক্তির যে নিদর্শন আমি দেখেছি, এতগুলো যুদ্ধজাহাজকে লুকিয়ে রাখা তো সত্যিই খুব কঠিন।
ভালো করে তাকিয়ে দেখো টাইটা, বলল হুই। তোমার চোখের সামনেই লুকিয়ে রাখা হয়েছে জাহাজগুলোকে।
অত্যন্ত তীক্ষ্ণ আমার চোখের দৃষ্টি; কিন্তু হুই কীসের কথা বলছে তা বেশ কষ্ট করেও বুঝে উঠতে পারলাম না। ফলে বেশ বিরক্ত হয়ে উঠলাম মনে মনে। কেউ আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করলে সেটা আমার মোটেই পছন্দ হয় না। হুইও নিশ্চয়ই ব্যাপারটা বুঝতে পারল, কারণ আমাকে একটা সূত্র ধরিয়ে দিল সে। ওইখানটায় দেখো, যেখানে পাহাড়গুলো সাগরের সাথে মিশেছে, বলল সে। তারপর অবশ্য পুরো ব্যাপারটা যেন লাফ দিয়ে উঠে এসে ধরা দিল আমার চোখে। একটু আগে তীরের ওপর ছড়িয়ে থাকা কিছু মরা গাছ দেখেছিলাম আমি ওখানে। এখন বুঝতে পারছি গাছগুলো আসলে স্বাভাবিক গাছের তুলনায় খুব বেশি সোজা আর লম্বা, এবং ডালপালাও নেই।
ওগুলো কি যুদ্ধজাহাজের মাস্তুল নয়? কিন্তু জাহাজের খোল কোথায় গেল? তোমরা কি তীরের ওপর তুলে রেখেছ জাহাজগুলোকে?
দারুণ বলেছ, টাইটা! সোল্লাসে আমার প্রশংসা করল হুই, ফলে তার শিশুসুলভ আচরণের ফলে আমার মনে যে বিরক্তি জেগে উঠেছিল তা কিছুটা হলেও কমে গেল। জাহাজগুলোকে লুকিয়ে রাখার জন্য বন্দরের সামনে একটা দেয়াল বানিয়েছি আমরা। ওগুলোর খোল দেয়ালের ওপাশে থাকায় দেখতে পাচ্ছ না তুমি। এবং মাত্র কয়েকটা জাহাজের মাস্তুল এখনো তুলে রাখা হয়েছে। বেশির ভাগেরই মাস্তুল নামিয়ে ফেলেছি আমরা, ফলে ওগুলোকে খুঁজে বের করা এখন আরো কঠিন।
সত্যিই বুদ্ধির পরিচয় দেওয়া হয়েছে কাজটায়, স্বীকার করলাম আমি।
এবার ওই লুকোনো বন্দরের দিকে এগিয়ে গেল আমাদের জাহাজ, মেমনন রইল পিছে পিছে। গায়ের জোরে তীর ছুড়লে যত দূরে যায়, বন্দরের দেয়াল থেকে তার অর্ধেক দূরত্বে রয়েছি আমরা; এই সময় হঠাৎ করেই প্রবেশপথটা ধরা দিল আমাদের চোখে। সাগরের দিক থেকে যেন বোঝা না যায় সে জন্য বিশেষভাবে তৈরি করা হয়েছে ওটাকে। ভেতরে ঢোকার সাথে সাথে পাল নামিয়ে ফেললাম আমরা, তার বদলে দাঁড়ের শক্তির ওপর নির্ভর করলাম বাকি পথটুকু পাড়ি দেওয়ার জন্য। বেশ ঘোরালো একটা পথ পাড়ি দিয়ে শেষ মোড়টা পার হতেই ভেতরের বন্দরটা আমাদের সামনে ভেসে উঠল। পুরো ল্যাসিডিমন নৌবাহিনী এখানে দেয়ালের সাথে বাঁধা রয়েছে। গোপন এই বন্দরের মাঝে চলছে পুরোদস্তুর কর্মব্যস্ততা। প্রতিটি জাহাজে নাবিকরা সমুদ্রযাত্রার প্রস্তুতি নিতে দারুণ ব্যস্ত; পাল এবং খোলের মেরামতি করছে কেউ কেউ, বাকিরা খাবার পানি, যন্ত্রপাতি আর অস্ত্রশস্ত্রের বোঝা জাহাজে তুলছে।
তবে আমাদের জাহাজ দুটো বন্দরের ভেতরে প্রবেশ করার সাথে সাথে হঠাৎ করেই যেন থেমে গেল সব কিছু। তীরে দাঁড়ানো লোকগুলোর মাঝে গুঞ্জনের সৃষ্টি হলো মেমননকে দেখে। এর আগে তারা কখনো এমন একটা জাহাজকে দেখেছে কি না সন্দেহ। কিন্তু তার পরেই এমন একটা ব্যাপার ঘটল, যেটা এমনকি রামেসিসের জাহাজের মতো অসাধারণ দৃশ্য থেকেও তাদের চোখ সরিয়ে নিতে বাধ্য করল। সেটা আর কিছুই নয়, আমাদের সামনে থাকা জাহাজটা: হুইয়ের বেকাথা। সামনের ডেকে দাঁড়িয়ে থাকা নাবিকদের ছোট্ট দলটার দিকে ইশারা করতে শুরু করল তারা। একে অপরকে ডাকছে কেউ কেউ। তাদের উত্তেজিত আলাপের মাঝে আমার নাম-টাইটা-ও কয়েকবার উচ্চারিত হতে শুনলাম আমি।
নিঃসন্দেহে সবাই খুব ভালোভাবেই চেনে আমাকে। আমার সুদর্শন এবং সুবেশ চেহারা, বা একসময় তাদের পাশে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করেছি আমি- এই কারণগুলো তো আছেই, সাথে আরো একটা কারণে আমাকে মনে রেখেছে তারা; যেটা সব নাবিক বা রথচালকের কাছেই একইভাবে স্মরণীয়।
মেফিস শহর পুনর্দখল, সেইসাথে খামুদির পরাজয় এবং হিকসস বাহিনীকে সমূলে ধ্বংস করার পর যখন আমি ওদের কাছ থেকে বিদায় নিলাম, তখন রাজা হুরোতাসকে অনুরোধ করেছিলাম আমার ভাগের সম্পদ থেকে কিছু অংশ তার সৈন্যদের মাঝে বিতরণ করে দিতে। যুদ্ধে তাদের অবদানের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতাস্বরূপ এই পুরস্কার। আমার প্রাপ্য দশ লাখ রৌপ্যখণ্ডের মাঝ থেকে এক লাখ বিতরণ করা হয়েছিল তাদের মাঝে, প্রতিজনের ভাগে পড়েছিল পাঁচ ডেবেন ওজনের দশটি করে রৌপ্যমুদ্রা। আমার কাছে বা যেকোনো অভিজাতের কাছেই এটা খুব সামান্য পরিমাণ; কিন্তু সাধারণ সৈনিকদের কাছে। এর অর্থ প্রায় দুই বছরের বেতনের সমান। সোজা কথায় তাদের কাছে এটা বিশাল এক সম্পদ। স্বাভাবিকভাবেই আমাকে মনে রেখেছে তারা, এবং সম্ভবত মৃত্যুর দিন পর্যন্ত মনে রাখবে।
