ওদিকে মেমননের বেশির ভাগ নাবিকই আগে থেকে সতর্ক হয়ে গিয়েছিল। ফলে সংঘর্ষের আগেই বিভিন্ন জিনিস আঁকড়ে ধরে নিজেদের রক্ষা করেছে তারা। তবে কয়েকজন অবশ্য ধাক্কার ঝাঁকুনিতে মেমননের ডেক থেকে দস্যুদের জাহাজে গিয়ে পড়ল। তাদের মাঝে আমি একজন। নিজের চেষ্টায় পতনের গতিরোধ করতে পারব না বুঝতে পেরে সামনে সবচেয়ে নরম যে জিনিসটা পেলাম সেটাকেই বেছে নিলাম এবং সামনে এগিয়ে গেলাম। জিনিসটা ছিল দস্যু জাহাজের ক্যাপ্টেন। দুজন জড়াজড়ি করে জাহাজের ডেকে গড়িয়ে পড়লাম আমরা, কয়েক গড়ান দিয়ে তবে থামলাম। তবে আমি থাকলাম ওপরে, ক্যাপ্টেনের বুকের ওপর বসা অবস্থায়। হুট করে জাহাজ বদল করতে হওয়ায় তলোয়ারটা হারিয়ে ফেলেছি, তাই সাথে সাথে ব্যাটাকে খুন করতে পারলাম না। তবে তাতে বোধ হয় সুবিধাই হলো, কারণ প্রায় সাথে সাথেই লোকটা কাতর সুরে গুঙিয়ে উঠে মাথার শিরস্ত্রাণের মুখাবরণটা সরিয়ে দিয়ে আমার দিকে তাকাল। আর ঠিক সেই মুহূর্তে আরো একটা বজ্রপাতের আলোতে আলোকিত হয়ে উঠল তার চেহারা।
*
সেথের দুর্গন্ধময় পশ্চাদ্দেশের কসম! তুমি এখানে কী করছ অ্যাডমিরাল হুই? অবাক হয়ে প্রশ্ন করলাম আমি।
আমার ধারণা তোমার আর আমার কাজ এখানে একই প্রিয় টাইটা। কিছু বাড়তি টাকা কামিয়ে নিচ্ছি আর কী, যন্ত্রণাকাতর গলায় জবাব দিল সে, দম ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করছে। উঠে বসার চেষ্টা করতে করতে বলল, এবার আমার বুকের ওপর থেকে সরো দেখি। তোমাকে একটু জড়িয়ে ধরি, তারপর আমাদের এই সময়োচিত পুনর্মিলন উদ্যাপন করার জন্য একটু খাঁটি ল্যাসিডিমনের লাল মদ নিয়ে আসি।
দুই জাহাজের নাবিকদের নিজেদের জায়গামতো ফিরিয়ে নিয়ে যেতে বেশ সময় লেগে গেল। সেইসাথে আহতদের পরিচর্যা আর দ্বিতীয় জাহাজের পানি সেচার যন্ত্র চালু করতেও আরো কিছু সময় নষ্ট হলো। সংঘর্ষে আমাদের চাইতে ওদের জাহাজটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বেশি, এবং পানি সেচে না ফেললে ডুবেই যাবে।
সব ঝামেলা শেষ হওয়ার পর রামেসিসের সাথে হুইয়ের পরিচয় করিয়ে দিলাম আমি। তবে রামেসিস যে মিশরের সিংহাসনের পরবর্তী সম্ভাব্য উত্তরাধিকারী এটা আর বললাম না, শুধু বললাম যে সে এই জাহাজের ক্যাপ্টেন। তারপর হুইকে পরিচয় করালাম রামেসিসের সাথে; তবে তার ফুপা হিসেবে নয় বরং ল্যাসিডিমন নৌবাহিনীর অ্যাডমিরাল এবং শখের জলদস্যু হিসেবে।
দুজনের বয়সে বেশ বড় ব্যবধান থাকা সত্ত্বেও দারুণ মিল হয়ে গেল কিছুক্ষণের মধ্যেই। আমরা যখন লাল মদের দ্বিতীয় পাত্রটা ধরেছি তখন দুজন পুরনো দোস্তের মতো গালগল্প জুড়ে দিয়েছে।
দুই জাহাজের সব ক্ষয়ক্ষতি মেরামত করতে, এবং আহতদের ক্ষতস্থান সেলাই আর ভাঙা হাড় জোড়া দিতে দিতে সারা রাত এবং পরের দিনের বেশির ভাগ অংশ পার হয়ে গেল। সব কাজ শেষ হওয়ার পর ল্যাসিডিমনের দক্ষিণ তীরে অবস্থিত গিথিয়ন বন্দরের দিকে আমরা যখন রওনা দিলাম, মেমননকে পথ দেখিয়ে নিয়ে চলল হুই। ওই জাহাজের নাম সে রেখেছে বেকাথা, তার স্ত্রীর নামে।
রামেসিসকে মেমননের দায়িত্বে রেখে বেকাথায় উঠে এলাম আমি, যাতে চুপি চুপি হুইকে আমাদের এই হঠাৎ আবির্ভাবের কারণটা খুলে বলা যায়। চুপচাপ আমার কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনে গেল সে এবং সব শেষ হতে হঠাৎ মৃদু স্বরে হেসে উঠল।
এতে হাসির কী হলো? জানতে চাইলাম আমি।
আরো খারাপ কিছুও ঘটতে পারত তোমার ভাগ্যে।
কীভাবে একটু বলো দেখি? এখন আমি নির্বাসিত, নিজের মাতৃভূমিতে ঢোকার কোনো অনুমতি নেই আমার। ঢুকলেই মৃত্যু। সেইসাথে নিজের সব জমিজমা আর সম্মানের আসনও হারিয়েছি। মিশর ছেড়ে পালিয়ে আসার পর এই প্রথমবারের মতো নিজের দুরবস্থা নিয়ে একটু দুঃখ প্রকাশ করার সুযোগ পেলাম আমি। প্রচণ্ড খারাপ লাগছিল আমার।
আর যাই হোক নির্বাসিত হলেও তুমি এখনো অনেক ধনী এবং সবচেয়ে বড় কথা, এখনো বেঁচে আছ, আমাকে মনে করিয়ে দিল হুই। এর জন্য রাজা হুরোতাসকে ধন্যবাদ দেওয়া উচিত তোমার।
এই নামের মালিককে মনে করতে এক মুহূর্ত সময় লেগে গেল আমার। এখনো মাঝে মাঝে শুধু জারাস ছাড়া অন্য কোনো নামে তাকে মনে করতে পারি না আমি। তবে হুই ঠিকই বলেছে। আমি এখনো একজন ধনী মানুষ, কারণ হুরোতাস আমার প্রাপ্য সেই বিশাল সম্পদের অংশটুকু নিরাপদে পাহারা দিয়ে রেখেছে। তা ছাড়া প্রায় তিন দশকের বিচ্ছেদের পর অবশেষে আমি আমার প্রিয় দুই রাজকুমারীর দেখা পেতে যাচ্ছি।
হঠাৎ করেই আবার উল্লসিত বোধ করতে শুরু করলাম আমি।
*
ল্যাসিডিমনের প্রথম যে জিনিসটার ওপর আমার চোখ পড়ল তা হচ্ছে ট্যাগেটাস পর্বতমালার চূড়াগুলো। এক একটা যেন ড্রাগনের দাঁতের মতো ধারালো আর চোখা, হেডিস প্রণালির মতো খাড়া। যদিও এখন বসন্তের শুরু; কিন্তু চূড়াগুলোর L, মাথায় এখনো ঝলমল করছে বরফ।
আমরা যতই সামনে এগিয়ে গেলাম ততই সাগরের বুক চিরে আরো ওপরে মাথাচাড়া দিয়ে উঠল তারা। দেখলাম পাহাড়ের অপেক্ষাকৃত নিচু ঢালগুলোতে জন্মেছে সুউচ্চ সব গাছের ঘন জঙ্গল। আরো কাছে আসার পর সাগরের বেলাভূমি চোখে পড়ল আমাদের, বাদামি পাথরের প্রাকৃতিক দেয়াল দিয়ে সুরক্ষিত। একের পর এক ঢেউ এসে ফেনা তুলে সগর্জনে আছড়ে পড়ছে তাদের ওপর, যেন কোনো দুর্গের প্রাচীরে হামলা চালাচ্ছে প্রশিক্ষিত যোদ্ধাদের সারি।
