এখনো কোনো চিহ্ন দেখা গেছে তার? নীরবতা ভেঙে প্রশ্ন করলাম আমি।
অবাক হয়ে গেল রামেসিস।
কার চিহ্ন? প্রশ্ন করল ও।
ওই যে, যে আমাদের পিছু নিয়েছে, জবাব দিলাম আমি। মৃদু স্বরে হেসে উঠল রামেসিস। তাহলে তুমিও আন্দাজ করতে পেরেছ। আস্ত একটা বুড়ো শয়তান তুমি, টাইটা।
আমি যদি বোকা হতাম তাহলে এই বয়স পর্যন্ত পৌঁছতে পারতাম না যুবক।
কেউ আমাকে বুড়ো বললে সেটা আমার ভালো লাগে না।
হাসি থামাল রামেসিস। তোমার কী মনে হয়? কে আমাদের পিছে লেগেছে?
আগের চাইতে চিন্তিত গলায় প্রশ্ন করল ও।
এই উত্তর সাগর হচ্ছে মানুষের রক্তে হাত রাঙানো প্রত্যেকটা জলদস্যুর আখড়া। তাদের মাঝে নির্দিষ্ট করে কোনো একজনের কথা কি বলা সম্ভব?
আমাদের চোখের সামনে অলস ভঙ্গিতে দিগন্তে ডুব দিতে শুরু করল সূর্য। তবে দিগন্তরেখার কোথাও জীবনের বা নড়াচড়ার কোনো চিহ্ন পাওয়া গেল না যতক্ষণ না…
ওই যে! দুজন এক সাথে চেঁচিয়ে উঠলাম আমরা।
সূর্যটা সমুদ্রের মাঝে সম্পূর্ণ ডুবে যাওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে গাঢ় হয়ে আসা পানির ওপর এক ঝলক উজ্জ্বল সোনালি আলো ছুঁড়ে দিল। আমরা দুজনই বুঝতে পেরেছি যে ওটা আসলে আমাদের পেছনে যে জাহাজটা লেগেছে তার পালে সূর্যের আলোর প্রতিফলন, আর কিছু নয়।
খুব সম্ভব আমাদের ওপর হামলা চালানোর ফন্দি আঁটছে ওরা, না হলে এমন চোরের মতো আসবে কেন? নিশ্চয়ই আশা করছে যে সূর্য ডোবার পরে আমরা পাল খাটো করে ফেলব বা নামিয়ে রাখব। তাই আমাদের পাশ কাটিয়ে যেন চলে না যায় এই ভয়ে গতি কমিয়ে রেখেছে। অন্ধকারের মাঝে কোনো জানান না দিয়ে নিঃশব্দে আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার পরিকল্পনা করেছে ব্যাটা, আন্দাজ করলাম আমি। তাহলে বরং আমরাই ওদের একটু চমকে দেওয়ার বুদ্ধি করি।
তোমার পরামর্শ কী টাইটা? নীলনদের বুকে অন্য জাহাজের সাথে নৌযুদ্ধে অভ্যস্ত আমি; কিন্তু এমন খোলা সাগরে আগে কখনো যুদ্ধ করিনি। তাই এখন তোমার নির্দেশই মেনে চলব আমি।
জাহাজের খোলে একটা বাড়তি পাল দেখেছিলাম আমি। ওটা কোথায়?
ওহ কালো রঙের পালটার কথা বলছ তুমি। রাতের বেলায় ওটা বেশ কাজে আসে, বিশেষ করে আমরা যখন শত্রুর চোখকে ফাঁকি দিতে চাই।
এখন ঠিক ওই পালটাই আমাদের দরকার, বললাম আমি।
দিনের শেষ আলোটুকু মিলিয়ে গিয়ে অন্ধকার নেমে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম আমরা। তারপর জাহাজের গতিপথ সম্পূর্ণ সমকোণে ঘুরিয়ে নিলাম, এবং এই অবস্থায় পাল তুলে দিয়ে চললাম প্রায় এক মাইল পথ। এবার জাহাজ থামিয়ে সাদা পাল বদলে তুলে দিলাম কালো পাল। সম্পূর্ণ অন্ধকারে করতে হলো কাজটা, এবং যতটা ভেবেছিলাম তার চাইতে বেশি সময় লেগে গেল। তবে শেষ পর্যন্ত মধ্যরাতের মতো মিশমিশে কালো পাল টাঙিয়ে আবার আগের গতিপথে ফেরত আসতে পারলাম আমরা। এই কাজটা সম্ভব করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখল আমার সেই জাদুর মাছ, এবং মাঝে মাঝে মেঘের মাঝে জ্বলে ওঠা বিদ্যুৎশিখা।
আমি আশা করছিলাম যে অন্য জাহাজটা আমাদের আগের গতিপথই অনুসরণ করছে, এবং আমরা যখন পাল বদলাচ্ছিলাম তখন সেটা পার হয়ে সামনে চলে গেছে। ওই জাহাজের নাবিকরা নিশ্চয়ই অধীর হয়ে সামনের দিকে তাকিয়ে আছে এখন, জানেই না যে আমরা ওদের পেছনে চলে এসেছি। আমাদের ধরার জন্য নিশ্চয়ই জলদস্যুদের নেতা তার জাহাজের সবগুলো পাল উড়িয়ে দিয়েছে, তাই রামেসিসকেও একই কাজ করতে নির্দেশ দিলাম আমি। তীরবেগে অন্ধকার চিরে সামনে এগিয়ে যেতে লাগল মেমনন। জাহাজের নাক বরাবর দুই পাশ থেকে উঠে আসছে ঢেউয়ের ফেনা, বৃষ্টির মতো ঝরে পড়ে ভিজিয়ে দিচ্ছে আমাদের। আমাদের প্রত্যেকটা নাবিক সম্পূর্ণ সশস্ত্র লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত হয়ে অপেক্ষা করছে। কিন্তু সময় কেটে যাওয়ার সাথে সাথে দুই জাহাজের অবস্থান নিয়ে মনে মনে যে হিসাব কষেছিলাম সেটা কতটা নির্ভুল তাই ভেবে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠতে লাগলাম আমি।
তারপর একেবারে হঠাৎ করেই যেন রাতের বুক চিরে আমাদের সামনে বেরিয়ে এলো জলদস্যুদের জাহাজটা। তড়িঘড়ি করে একবার চিৎকার করে সাবধান করে দিলাম দাঁড়িদের। তার পরেই একেবারে আমাদের কাছে চলে এলো জাহাজটা। আরো একবার বিদ্যুৎ চমকাল, সেই আলোতে দেখলাম জাহাজটা পাশ ফিরে আছে। আন্দাজ করলাম জলদস্যুদের নেতা নিশ্চয়ই ধরে নিয়েছিল যে আমাদের পেছন থেকে হামলা করা সম্ভব নয়, কারণ অন্ধকারে আমাদের পাশ কাটিয়েই চলে গেছে সে। এখন তাই জাহাজ ঘুরিয়ে আবার উল্টো পথে ফিরে এসে আমাদের খুঁজে বের করতে চাইছিল। এই মুহূর্তে একটা কাঠের গুঁড়ি মতো আড়াআড়ি হয়ে মেমননের সামনে ভাসছে জাহাজটা। পূর্ণ গতিতে সেদিকে এগিয়ে যাচ্ছে আমাদের জাহাজ। মেমননের গলুই অত্যন্ত ধারালো সন্দেহ নেই, যে জলদস্যুদের জাহাজটাকে দুই টুকরো করে ফেলতে পারবে মাঝ থেকে। কিন্তু তাতে আমাদের নিজেদের জাহাজের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কাও ষোলো আনা।
শুধু জাহাজ চালানোয় রামেসিসের দক্ষতা আর অন্য নাবিকদের প্রশিক্ষণের কারণেই সরাসরি সংঘর্ষ এড়ানো সম্ভব হলো। তেমন কিছু হলে দুটো জাহাজই ধ্বংস হতো, সাগরের তলায় আশ্রয় হতো আমাদের সবার। একেবারে শেষ মুহূর্তে কোনোমতে মেমননের নাক ঘুরিয়ে ফেলতে পারল সে, ফলে আমাদের গলুইয়ের বদলে পেট দিয়ে অপর জাহাজকে বাড়ি মারল আমাদের জাহাজ। তার পরেও ধাক্কাটা এত তীব্রভাবে লাগল যে জলদস্যুদের জাহাজের প্রত্যেকটা নাবিক উল্টেপাল্টে পড়ে গেল। তাদের মাঝে এমনকি জাহাজের ক্যাপ্টেন আর প্রধান দাঁড়িকেও দেখা গেল। এদিক-ওদিক এলোমেলোভাবে পড়ে রইল তারা, বেশির ভাগই হয় আহত বা দারুণ ব্যথা পেয়েছে। যে দুই-একজন নিজের পায়ে উঠে দাঁড়াতে পারল তারাও সংঘর্ষের ফলে অস্ত্র হারিয়ে ফেলেছে, ফলে আত্মরক্ষা করার কোনো উপায় নেই তাদের কাছে।
