ছোট্ট মাছটা দেখে অবজ্ঞায় নাক কুঁচকাল রামেসিস। আর কী কী করতে পারে এটা? প্রশ্ন করল সে। দেবতাদের প্রশস্তি গাইতে পারে? এক পাত্র ভালো মদ এনে দিতে পারে আমাকে? অথবা এমন একটা মেয়েকে দেখিয়ে দিতে পারে যার শরীরে মধুর স্বাদ পাওয়া যায়? প্রশ্নগুলো শুনেও না শোনার ভান করলাম আমি।
খোলা সাগরে নামার পর প্রথম রাতে সম্পূর্ণভাবে মেঘে ঢাকা রইল আকাশ। কোনো সূর্য চাঁদ বা তারা নেই, যা দেখে পথ নির্দেশ করা যায়। নিশ্চিদ্র অন্ধকারে কেবল বাড়ি ফেরার পাথরের নির্দেশ অনুসরণ করে সারা রাত জাহাজ চালালাম আমরা। ভোর হওয়ার অনেক আগেই আমরা দুজন ডেকের ওপর উঠে পড়লাম, তেলের প্রদীপের টিমটিমে আলোয় তাকিয়ে রইলাম কাঠের পাত্রে ভাসমান মাছটার দিকে। আমার বুদ্ধিমত্তা নিয়ে নানা রকম কৌতুক করে সময়টা কাটানোর চেষ্টা করল রামেসিস। কিন্তু দিনের আলো ফোঁটার পর যখন আকাশের মেঘ কেটে গেল তখন মেমনন এবং আমার ছোট্ট মাছটা সেই একই হালকা পশ্চিম ঘেঁষে উত্তর দিকে মুখ করে আছে দেখে বিস্ময়ের সীমা রইল না তার।
এ তো আসলেই জাদু, তৃতীয় দিন সকালেও একই ঘটনা ঘটার পর ওকে বিড়বিড় করে বলতে শুনলাম আমি। তারপর চতুর্থ দিন সকালে দিগন্তের ওপর সূর্যের জ্বলন্ত দেহটা উঁকি দেওয়ার সাথে সাথে এক নতুন দৃশ্য দেখা গেল। আমাদের জাহাজের ঠিক নাক বরাবর পাঁচ লিগ সামনে দেখা যাচ্ছে ক্রিট দ্বীপের ঝলসানো চেহারা।
অনেক বছর আগে আমি যখন প্রথম এই দ্বীপের ওপর দৃষ্টি রেখেছিলাম তখন দ্বীপের পাহাড়গুলো ছিল সবুজ ঘন জঙ্গলে ঢাকা। দ্বীপের কিনারে গড়ে উঠেছিল বিরাট বিরাট সব শহর আর বন্দর, দেখেই বোঝা যেত যে পৃথিবীর মাঝে অন্যতম ঐশ্বর্যশালী এক দেশ এটা। দ্বীপের চারপাশের পানিতে সব সময় ভিড় করে থাকত মালবোঝাই জাহাজ আর রণতরীর দল। এখন সেই শহর বা জঙ্গল কোনোটাই নেই, পুড়ে ছাই হয়ে গেছে দেবতা ক্রোনাসের আগ্নেয় নিঃশ্বাসে। যে পাহাড়ের নিচে তার ছেলে দেবতা জিউস তাকে আটকে রেখেছিলেন, প্রচণ্ড ক্রোধে সেই পাহাড়কেই এক তীব্র অগ্ন্যুৎপাতে ধ্বংস করে দিয়েছেন তিনি। সেই পাহাড়টা এখন সম্পূর্ণ তলিয়ে গেছে পানির তলায়, কোনো চিহ্নই আর নেই তার। গতিপথ একটু বদলে নিয়ে দ্বীপের যথাসম্ভব কাছ দিয়ে এগিয়ে চললাম আমরা। কিন্তু দ্বীপের বুকে এমন কিছুই চোখে পড়ল না, যা পরিচিত মনে হয়। এতগুলো বছর পরেও বাতাসে গন্ধকের কটু গন্ধ, তার সাথে মিশেছে মরা পশুপাখি আর মাছের দুর্গন্ধ। অথবা কে জানে এটা হয়তো স্রেফ আমার কল্পনাশক্তি আর শক্তিশালী ঘ্রাণেন্দ্রিয়ের কারণে হচ্ছে। তবে এমনিতেও আমাদের জাহাজের খোলের নিচে যে জলভাগ তাতে প্রাণের কোনো অস্তিত্ব বোঝা যাচ্ছে না। পানির নিচে যে প্রবাল প্রাচীর ছিল তা অনেক আগেই উঁচু তাপমাত্রার আগে মারা গেছে। এমনকি রামেসিস আর তার নাবিকরা যারা আগে কখনো এদিকে আসেনি তারাও এই পরিপূর্ণ ধ্বংসের করাল রূপ দেখে নিশ্চুপ হয়ে গেছে।
মানুষের সকল চেষ্টা, সকল সংগ্রামই যে দেবতাদের সামনে তুচ্ছ, এই ঘটনা তার জলজ্যান্ত প্রমাণ, ফিসফিসে গলায় বলে উঠল রামেসিস। এখান থেকে যত দ্রুত সম্ভব সরে যেতে হবে আমাদের। দেবতা ক্রোনাসের প্রলয়ংকর ক্রোধের সামনে পড়ার কোনো ইচ্ছে নেই আমার।
সুতরাং এবার দাঁড় বাওয়ার গতি বাড়াতে নির্দেশ দিলাম প্রধান দাঁড়িকে। আরো উত্তরে গ্রিসীয় সাগরে এসে পড়েছি আমরা। এখনো আমাদের অভিমুখ সেই হালকা পশ্চিম ঘেঁষে উত্তরে।
আমার জন্য এদিককার সাগর একেবারেই অপরিচিত। ক্রিটের বেশি সামনে কখনো আসিনি আমি। কয়েক দিনের মাঝেই আগ্নেয়গিরির অত্যাচারে ধ্বংস হয়ে যাওয়া দ্বীপের পাশ কাটিয়ে এলাম আমরা। আবার আগের মতো শান্ত বন্ধুর মতো চেহারা ধারণ করল সাগর। রামেসিসের মস্তিষ্ক অত্যন্ত ধারাল, শেখার আগ্রহ প্রবল। এবং এতে বরং খুশিই হলাম আমি। আমার কাছ থেকে, বিশেষ করে নিজের পারিবারিক ইতিহাস সম্পর্কে বিশদভাবে জানতে চাইল সে, যেটা সম্পর্কে আমার জ্ঞান প্রচুর। ফারাওদের চারটি প্রজন্মের পাশে সশরীরে থাকার সৌভাগ্য হয়েছে আমার। সেই জ্ঞান এখন খুশিমনেই রামেসিসের সাথে ভাগ করে নিলাম আমি।
তাই বলে মিশরের ইতিহাসে আমরা এত বেশি ডুবে যাইনি যে দায়িত্বে অবহেলা করব। সবচেয়ে শক্তিশালী রণতরীর পরিচালক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব সত্যিই অনেক। অতীত নিয়ে আলোচনায় আমরা যতটা সময় দিলাম তার চাইতে অনেক বেশি সময় দিলাম ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায়। এমন একটা জাহাজের জন্য যেটা স্বাভাবিক, প্রতিটি নাবিককে রামেসিস নিজের হাতে বাছাই করেছে। আমার চোখেও তাদের কাজের কোনো খুঁত ধরা পড়ল না। তবে আমি বরাবরই যেকোনো কিছুকে নিখুঁতের চাইতেও নিখুঁত করে তুলতে আগ্রহী। নিজের লোকদের কঠোর প্রশিক্ষণ দিতে লাগল রামেসিস এবং আমিও সেই প্রশিক্ষণের সর্বোচ্চ পর্যায় নিশ্চিত করতে তাকে সাহায্য করলাম।
সবচেয়ে দক্ষ সেনানায়কদের অন্যতম প্রধান গুণ হচ্ছে বিপদ অথবা শত্রুর অবস্থান বোঝার মতো ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের দখল রাখা। ক্রিট দ্বীপ ছাড়িয়ে আসার পর তৃতীয় দিন দুপুরে আমিও সেই অদ্ভুত অস্বস্তিটা বোধ করতে লাগলাম। বিকেলের প্রায় পুরোটা সময় দিগন্তের আনাচকানাচে খুঁজে খুঁজে কাটালাম আমি সামনে এবং পেছনে দুদিকেই। পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে জানি মনের গভীর থেকে উঁকি দেওয়া এই অজানা অস্বস্তিকে অগ্রাহ্য করা ঠিক হবে না। তারপর দেখলাম অস্বস্তিতে শুধু আমি একা ভুগছি না। রামেসিসও অস্থির হয়ে উঠছে, যদিও আমার মতো দক্ষভাবে সেটা চাপা দিতে পারছে না। তবে এটাও ঠিক যে, আমার চাইতে ওর অভিজ্ঞতা অনেক কম। শেষ বিকেলে সূর্য যখন পশ্চিম-দিগন্ত থেকে আর হাতখানেক ওপরে মাত্র তখন নিজের তলোয়ার আর শিরস্ত্রাণ নামিয়ে রেখে মাস্তুল বেয়ে তরতর করে ওপরে উঠে গেল রামেসিস। দেখলাম বেশ কিছুক্ষণ ধরে আমাদের ফেলে আসা সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে রইল ও। একসময় নিজেকে আর সামলাতে পারলাম না আমি। অস্ত্র এবং বর্ম খুলে নামিয়ে রাখলাম, তারপর এগিয়ে গেলাম মাস্তুলের গোড়ার দিকে। ইতোমধ্যে অন্য নাবিকরা, বিশেষ করে যারা দাঁড় বাইছে তারা বেশ আগ্রহের সাথে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। প্রধান ডেক থেকে মাস্তুলের মাথায় কাকের বাসায় উঠে এলাম আমি। ঝুড়িতে নড়েচড়ে বসে আমার জন্য জায়গা করে দিল রামেসিস, যদিও এই ছোট্ট জায়গায় দুজন দাঁড়ানো বেশ মুশকিল। কিছু না বলে কেবল কৌতূহলী দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে রইল ও।
