এটা কোনো জবাব হলো না, বলে উঠল রামেসিস। অসুবিধা ছিল বলতে আসলে কী বোঝাতে চাইছ তুমি?
তার চেয়ে বরং তোমাকে আরেকটা উদাহরণ দিই, রামেসিস।
মাথা ঝাঁকাল ও। বলো। আমি শুনছি।
মনে করো মিশরের রাজপরিবারের এক রাজপুত্র হঠাৎ জানতে পারল বর্তমান ফারাও অর্থাৎ তার বড় ভাই তাকে কোনো কারণ ছাড়াই খুন করতে চায়। ফলে দেশে থেকে প্রাণ হারানোর চাইতে দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল সে। এটাকে কি তুমি কর্তব্যের অবহেলা বলে ধরবে? প্রশ্ন করলাম আমি। অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইল রামেসিস। সামনে-পেছনে দুলছে মৃদু মৃদু যেন কী বলবে ঠিক করতে পারছে না।
শেষ পর্যন্ত জোরে জোরে কয়েকবার মাথা ঝাঁকাল ও, যেন চিন্তাভাবনাগুলো পরিষ্কার করতে চাইছে। মৃদু গলায় বলল, তুমি জানতে চাইছ এই ধরনের পরিস্থিতিকে আমি ব্যতিক্রম বলে স্বীকার করব কি না?
হ্যাঁ। করবে?
আমার মনে হয় সেটাই উচিত হবে, স্বীকার করল ও এবং হেসে ফেলল।
ইতোমধ্যে কাজটা করে ফেলেছি আমি।
সুযোগ চিনতে ভুল করলাম না আমি। বেশ। এবার তাহলে তোমার দুই ফুপুর কথা বলি। অত্যন্ত ভালো মেয়ে ছিল তারা, সুন্দরী, বুদ্ধিমতী এবং অত্যন্ত অনুগত। তোমার বাবা তাদের ক্রিটে পাঠিয়েছিলেন মিনোসের স্ত্রী হতে। তাদের অভিভাবক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল আমাকে। তোমার বাবা এবং মিশরের প্রতি নিজেদের কর্তব্য খুব ভালোভাবেই পালন করেছিল তারা। যদিও তাদের দুজনেরই ভালোবাসার মানুষ ছিল, তবু মিনোসকে বিয়ে করে তারা। তারপর যখন ক্রোনাস পর্বতের অগ্ন্যুৎপাতে মিনোস মারা গেলেন তখন হঠাৎ করে মুক্তি মিলে গেল তাদের। তখন তারা তাদের প্রেমিকদের সাথে পালিয়ে যায় এবং তাদের আটকানোর বদলে আমি বরং সাহায্য করি এই কাজে।
আমার কথাগুলো শুনতে শুনতে বিস্ময়ের মাত্রা উত্তরোত্তর বাড়ছে রামেসিসের। তুমি ঠিকই আন্দাজ করেছ। তোমার দুই ফুপুই এখনো বেঁচে আছে, বললাম আমি।
সেটা তুমি কীভাবে জানো? জানতে চাইল ও।
কারণ মাত্র মাসখানেক আগেই তাদের স্বামীদের সাথে কথা হয়েছে আমার। আমার ইচ্ছে তুমি ওদের সাথে দেখা করো। ইচ্ছে করলে ছদ্মবেশেও থাকতে পারো তুমি। টামোসের পরিবারের সদস্য নয়, স্রেফ মেমননের ক্যাপ্টেন হিসেবে। একমাত্র তাহলেই তোমার নিজের পালিয়ে আসার সিদ্ধান্তের সাথে ওদের সিদ্ধান্তের তুলনা করতে পারবে তুমি, বুঝতে পারবে ওরা সঠিক কাজটা করেছি কি না।
তার পরেও যদি আমার ধারণায় কোনো পরিবর্তন না আসে?
তাহলে তোমার সাথে হাথোরের দরজা পর্যন্ত যাব আমি, জাহাজ নিয়ে পৃথিবীর কিনার থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ব অসীমের মাঝে।
উচ্চ স্বরে হেসে উঠল রামেসিস। বেশ কিছুক্ষণ পর নিজেকে সামলে নিতে পারল। হাসির চোটে চোখ থেকে বেরিয়ে আসা পানি মুছে জানতে চাইল, এই দুই রহস্যময় মহিলাকে কোথায় পাওয়া যাবে নিশ্চয়ই জানো তুমি?
জানি।
তাহলে পথ দেখাও, আমন্ত্রণ জানাল ও।
*
দুই দিন পর আর তেমন কোনো দেরি ছাড়াই নীলের অববাহিকায় এসে পৌঁছলাম আমরা। হিকসস নৌবাহিনী ধ্বংস হয়ে গেছে, এখন আর এমন কোনো জাহাজ নেই যা আমাদের অগ্রযাত্রাকে রুখতে পারে। মেমনন নামের মানুষটি যেমন ভূভাগের ওপর একচ্ছত্র রাজত্ব করে গেছে তেমনি একই নামের জাহাজটাও জলপথে বিস্তার করেছে পূর্ণ আধিপত্য। আমাদের সামনে এখন ভূমধ্যসাগরের বিশাল জলরাশি। নীলনদের সাতটি মুখের মাঝে সবচেয়ে বড় যে মুখ সেই ফাতনিক অববাহিকা দিয়ে সাগরে প্রবেশ করলাম আমরা। বিশাল সমুদ্রের ঢেউয়ের মাথায় আরো একবার জাহাজ নিয়ে চড়তে পেরে আনন্দে ভরে উঠল আমার মন।
আমি জানি উত্তরমুখী যে পথ ধরে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি তাতে হয়তো বেশ কয়েক দিন, এমনকি সপ্তাহখানেক পর্যন্ত ডাঙার কোনো চিহ্ন না দেখেই থাকতে হবে আমাদের। বছরের এই সময়টায় খুব সম্ভব সূর্যও দীর্ঘ সময় মেঘে ঢাকা থাকবে। এবং এমন পরিস্থিতিতে জাহাজ চালানো সত্যিই খুব কঠিন। তাই রামেসিসকে আমার জাদুর মাছটা দেখাব বলে ঠিক করলাম। বহু বছর আগে এক আফ্রিকান ওঝা আমাকে এই জিনিসটা দিয়েছিল। সাপের কামড় থেকে তার বড় ছেলেকে বাঁচিয়েছিলাম আমি। এটা তার কৃতজ্ঞতার চিহ্নস্বরূপ দেওয়া উপহার।
এই জাদুর মাছটা তৈরি করা হয়েছে একধরনের বিরল ভারী এবং কালো পাথর খোদাই করে, যে পাথর শুধু নীলের শেষ প্রপাতের ওপরে ইথিওপিয়াতেই পাওয়া যায়। উপজাতীয়দের কাছে এর নাম বাড়ি ফেরার পাথর, কারণ এর সাহায্যে তারা বাড়ি ফেরার পথ নির্ণয় করে। কালো উপজাতীয়দের জ্ঞানকে অনেকেই তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে ঠিক; কিন্তু আমি তাদের মাঝে নই।
মার জাদুর মাছটা লম্বায় হবে আমার কড়ে আঙুলের সমান, তবে একেবারেই সরু। যখন প্রয়োজন হয় তখন পাথরটাকে আমি নৌকার মতো করে খোদাই করা এক টুকরো কাঠের সাথে আঠা দিয়ে লাগিয়ে দিই। তারপর মাছসহ ছোট্ট নৌকাটাকে ভাসিয়ে দেওয়া হয় পানিভর্তি একটা গোল পাত্রে। পাত্রটা অবশ্যই কাঠের তৈরি হতে হবে এবং তার গায়ে থাকতে হবে উজ্জ্বল রঙে আঁকা নানা রকম রহস্যময় আফ্রিকান নকশা। এর পরেই আসে জাদুর অংশটুকু। পাথরের মাছটা ধীরে ধীরে; কিন্তু নিশ্চিতভাবেই উত্তরমুখী হয়ে ঘুরে যায়, জাহাজের মুখ যেদিকেই ঘোরানো থাকুক না কেন। যাত্রার এই পর্যায়ে এসে মেমননের নাক কেবল সামান্য বামে ঘুরিয়ে দিতে হলো আমাদের, যেদিকে মাছটা নির্দেশ করছিল। দিন হোক বা রাত, এই মাছের জাদু কখনো ব্যর্থ হয় না। যখন ফেরার সময় হবে তখন মেমননের নাকটা ঠিক উল্টো দিকে ঘুরিয়ে দিলেই হবে, অবশ্য তার আগে এটা নিশ্চিত করতে হবে যে মিশরে ফেরার সুযোগ তৈরি হবে আমাদের জন্য।
