.
দীর্ঘজীবন পাওয়ার অন্যতম প্রধান সুবিধা হচ্ছে যেকোনো ক্ষত থেকে খুব দ্রুত সেরে ওঠার ক্ষমতা। ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই আমার মাথায় তৈরি হওয়া ক্ষত থেকে রক্ত বের হওয়া থেমে গেল। শুকনো চামড়া জমতে শুরু করল সেখানে। নীলনদ যেখানে ভূমধ্যসাগরে পড়েছে, সেই মোহনায় পৌঁছনোর আগেই ডুগ আর তার সঙ্গীদের অত্যাচারে আমার গায়ে তৈরি হওয়া চাবুকের দাগ এবং অন্যান্য কাটাছেঁড়াগুলো ভালো হয়ে গেল পুরোপুরি। আরো একবার পূর্ণ যুবকের মতো কান্তিময় হয়ে উঠল আমার চামড়া।
নদীপথ ধরে উত্তর দিকে সাগর অভিমুখে চলতে থাকার এই দিনগুলোতে যুবরাজ রামেসিসের সাথে আমার সম্পর্ক আবারও ঝালাই করে নেওয়ার সুযোগ পেলাম আমি।
আমাদের ওপর পরবর্তী যে সিদ্ধান্তের ভারটা নেমে এলো সেটা হচ্ছে মিশর ছাড়ার পর আমাদের চূড়ান্ত গন্তব্য নির্ধারণ করা। আমার মনে হচ্ছিল রামেসিস নিশ্চয়ই পৃথিবীর শেষ প্রান্তে হাথোরের পাথুরে দরজার মাঝ দিয়ে যেতে চায় জাহাজ নিয়ে, ওপাশে কী আছে দেখতে চায়। কিন্তু ওপাশে কী আছে আমি খুব ভালো করেই জানি। ওপাশে আছে শুধু নিঃসীম শূন্যতা। আমরা যদি সত্যিই ওই পথে এগোনোর মতো বোকামি করি তাহলে পৃথিবীর শেষ প্রান্ত দিয়ে নিচে পড়ে যাব, তারপর অনন্তকাল ধরে নিশ্চিদ্র অন্ধকারের মাঝ দিয়ে কেবল পড়তেই থাকব।
এটাই যে আমাদের কপালে ঘটবে, সেটা নিশ্চিত হচ্ছ কী করে? প্রশ্ন করল রামেসিস। খুব দ্রুতই পরস্পরের ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছি আমরা, সম্বোধনও বদলে গেছে।
কারণ ওই দরজা থেকে এখন পর্যন্ত কেউ ফিরে আসতে পারনি, খুব স্বাভাবিক গলায় ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করলাম আমি।
সেটা কীভাবে জানো তুমি? আবারও প্রশ্ন করল ও।
ওখান থেকে ফিরে আসতে পেরেছে এমন একজনের নাম বলো তো? পাল্টা প্রশ্ন ছুড়লাম আমি।
হিসপানের স্কিভা।
এই নাম কখনো শুনিনি আমি। কে ছিল সে?
তিনি ছিলেন একজন বিখ্যাত ভ্রমণকারী। আমার দাদার বাবার সাথে তার দেখা হয়েছিল।
কিন্তু তোমার সাথে কখনো তার দেখা হয়নি, তাই তো?
উম, না। বুঝতেই পারছ আমার জন্মের আগেই তিনি মারা গেছেন। তবে আমার বাবা আমাকে সেনেবসেনের গল্প শুনিয়েছিলেন।
তোমার বাবাকে আমি কতটা সম্মান করতাম নিশ্চয়ই তুমি জানো। তবে এই সেনেবসেনের গল্প নিয়ে তার সাথে কখনো আলোচনা করার সুযোগ হয়নি আমার। তা ছাড়া হাথোরের দরজার ওপাশে সত্যিই কী আছে সেটা তৃতীয় কোনো ব্যক্তির মুখ থেকে শুনে বিশ্বাস করতে চাই না আমি, বিশেষ করে যখন সেখানে নিজে যাওয়ার ঝুঁকি নিতে হচ্ছে আমাকে।
তবে সৌভাগ্যক্রমে দুই রাত পরে আমি একটা স্বপ্ন দেখলাম। স্বপ্নে দেখলাম রাজকুমারী বেকাথা এবং তেহুতি তাদের সন্তানদেরসহ ফারসিয়ান জলদস্যুদের হাতে ধরা পড়েছে। টারকুইস্ট নামে এক ভয়ানক সাগর দানবকে উৎসর্গ করার জন্য সাগরতীরে একটা পাথরের সাথে বেঁধে রাখা হয়েছে তাদের। পাখা আছে সেই দানবের, ফলে ইচ্ছে করলে বাতাস কেটে পাখির মতো উড়ে চলতে পারে, আবার মাছের মতো সাঁতার কাটতে পারে পানিতে। পঞ্চাশটা মুখ আছে তার, যেগুলো মানুষ খাওয়ার জন্য সর্বদা লালায়িত। সেই মুখগুলোর এক কামড়ে ভেঙে ফেলতে পারে মানুষের তৈরি যেকোনো জাহাজ।
স্বাভাবিকভাবেই রামেসিসকে এই স্বপ্নের কথা জানাতে গিয়ে দ্বিধাবোধ করতে লাগলাম আমি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মিশরীয় রাজপরিবারের প্রতি আমি যে পবিত্র শপথ নিয়েছি তা আমাকে পালন করতেই হবে। রামেসিস অবশ্য ভবিষ্যদ্রষ্টা এবং স্বপ্নের অর্থ ব্যাখ্যাকারী হিসেবে আমার খ্যাতির কথা অনেক আগে থেকেই জানে। স্বপ্ন সম্পর্কে আমার ব্যাখ্যাটুকু চুপচাপ মনোযোগ দিয়ে শুনল ও, তারপর নিজে কোনো মতামত না দিয়ে চলে গেল জাহাজের সামনের ডেকে। বিকেলের বাকি সময়টুকু সেখানেই কাটাল সে। সূর্য ডোবার সময় উঠে দাঁড়িয়ে আমার কাছে ফিরে এলো এবং কোনো সময় নষ্ট না করে অল্প কথায় খুলে বলল নিজের মতামত।
আমি তোমাকে নির্দেশ দিচ্ছি, আমার বাবা মহান ফারাও টামোস যখন আমার দুই ফুপুকে ক্রিটের রাজা মিনোসের সাথে বিয়ে দেওয়ার জন্য তোমার দায়িত্বে পাঠিয়েছিলেন তখন তাদের ভাগ্যে সত্যি সত্যি কী ঘটেছিল সেটা আমাকে খুলে বলার জন্য। আমি জানি যে তারা আমার বাবার নির্দেশ পালন করেছিলেন, মিনোসকে বিয়ে করেছিলেন। কিন্তু তার পরেই ক্রোনাস পর্বতের ভয়াবহ অগ্ন্যুৎপাতে তাদের মৃত্যু হয়। আমার বাবা আমাকে এটাই বলেছিলেন। কিন্তু আমার ভাই উটেরিক তোমাকে বিশ্বাসঘাতকতা এবং মিথ্যে বলার অভিযোগে দণ্ডিত করেছে। উটেরিকের মতে ওই অগ্ন্যুৎপাতে আমার দুই ফুপু বেঁচে যান; কিন্তু তাদের স্বামী মিনোসের মৃত্যু হয়। তারপর তারা নিজেদের দায়িত্ব অনুযায়ী মিশরে ফিরে না এসে জারাস এবং হুই নামের দুই দলত্যাগী সৈনিকের সাথে অদৃশ্য হয়ে যান। উটেরিকের এই কথাগুলোকে আমি পাগলের প্রলাপ বলে উড়িয়ে দিতে চেয়েছিলাম; কিন্তু এখন তোমার এই স্বপ্ন যেন তাদের বেঁচে থাকার দিকেই ইঙ্গিত করছে। কথা থামিয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাল ও। সত্যি কথাটা বলো আমাকে টাইটা। আসলে কী ঘটেছিল আমার দুই ফুপুর ভাগ্যে?
কিছু অসুবিধা ছিল সে সময়, প্রশ্নটার জবাব এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলাম আমি।
