এটাই কিছুই নয় মহামান্য যুবরাজ। আমার বোকামির একটু শাস্তি পেয়েছি আর কি। রামেসিসের কাছ থেকে সহানুভূতি পেয়ে কিছুটা বিব্রত হয়ে পড়েছি আমি, তবে একই সাথে মাথা ঠাণ্ডা রেখে যুবরাজকে কাছ থেকে দেখার সুযোগটাও কাজে লাগাচ্ছি পুরোদমে।
রামেসিসের পদবি হচ্ছে নৌবাহিনীর প্রধান অ্যাডমিরাল। নিজের কর্তব্যে সে এতই অবিচল যে, নৌবাহিনীর উচ্চপদস্থ সৈনিকদের ছাড়া অন্য কারো সাথে প্রায় দেখাই যায় না তাকে। তার নিজের বাবার ক্ষেত্রেও কথাটা সত্যি। যদিও ছোটবেলায় তার সাথে অনেক সময় কাটিয়েছি আমি; ড্রাগন এবং অন্যান্য দানবের খপ্পর থেকে কীভাবে সুন্দরী রাজকুমারীকে উদ্ধার করে রাজপুত্র সেই গল্প শুনিয়েছি। কিন্তু বড় হওয়ার সাথে সাথে পরস্পরের কাছ থেকে দূরে সরে গেছি আমরা। সম্পূর্ণভাবে নিজের বাবার প্রভাবে বড় হয়েছে রামেসিস। তারপর থেকে আর কখনো তাকে জানার সুযোগ হয়নি আমার। এখন তাই তার সাথে তার বাবা ফারাও টামোসের মিল লক্ষ্য করে অবাক না হয়ে পারলাম না আমি। এবং এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এই মিল তার প্রতি আমার সব সময়ের উঁচু ধারণা আরো বাড়িয়ে তুলল। সত্যি কথা বলতে, বাবার চাইতেও সুদর্শন হয়েছে সে। যদিও কথাটা ভাবতে বিবেকের একটু দংশন অনুভব করলাম আমি; কিন্তু কথাটা ঠিক।
রামেসিসের চোয়ালের গঠন আরো শক্তিশালী, দাঁতগুলো ধবধবে সাদা। তার বাবার চাইতেও সামান্য বেশি লম্বা সে; কিন্তু কোমর আরো বেশি সরু। হাত পা আরো বেশি টান টান। গায়ের রং অনেকটা যেন কড়া সোনালি; তার মা রানি মাসারার কাছ থেকে পাওয়া আবিসিনীয় রক্তের চিহ্ন। চোখগুলো আরো উজ্জ্বল, আরো বেশি গাঢ় রঙের। তাতে তীক্ষ্ণ কিন্তু একই সাথে দয়ালু এবং বুদ্ধিদীপ্ত দৃষ্টি।
মুহূর্তের মাঝেই তার প্রতি আবারও আকৃষ্ট হয়ে পড়লাম আমি, যেন মাঝখানে কেটে যাওয়া এতগুলো বছরের কোনো অস্তিত্বই ছিল না কখনো। তার পরবর্তী কথাগুলো যেন আমার চিন্তাকেই প্রতিফলিত করল: আমাদের মাঝে অনেক মিলই আছে টাইটা। কিন্তু এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় মিল হলো আমার বড় ভাইয়ের কাছ থেকে পাওয়া শত্রুতা। আমাদের দুজনের লাশ দেখার আগে কোনোভাবেই থামবে না ফারাও উটেরিক টুরো। আপনি ইতোমধ্যে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন। আমার শাস্তি এখনো প্রকাশ্যে নির্ধারিত না হলেও আপনার চাইতে আমাকে কম ঘৃণা করে না উটেরিক।
কেন? জানতে চাইলাম আমি। আপনার ভাই আপনাকে ঘৃণা করছে কেন? প্রশ্নটা জিজ্ঞেস করতে কোনো দ্বিধা বোধ করলাম না আমি। মনে হচ্ছে যেন এই লোকটার সাথে আমার কোনো বিরোধ নেই, কখনো ছিল না। এর কাছে আমার কিছু লুকোনোর নেই, তেমনি আমার কাছেও কিছু লুকোনোর নেই তার।
কারণটা খুব সাধারণ। ফারাও টায়োস আপনাকে এবং আমাকে অনেক বেশি ভালোবাসতেন, তার বড় ছেলে উটেরিকের চাইতেও বেশি। এক মুহূর্ত বিরতি নিল রামেসিস, তারপর বলে চলল: আরেকটা কারণ হচ্ছে, আমার ভাই একজন উন্মাদ। তার বিকৃত মনের মাঝে বাস করা কাল্পনিক দানব আর প্রেতাত্মারা সর্বক্ষণ তাড়া করে ফেরে তাকে। নিজের চাইতে জ্ঞানী এবং বুদ্ধিমান যেকোনো ব্যক্তিকে সরিয়ে দিতে চায় সে।
এটা কি আপনি নিশ্চিতভাবে জানেন? প্রশ্ন করলাম আমি। মাথা ঝাঁকাল রামেসিস।
অবশ্যই। তথ্য সংগ্রহের নিজস্ব রাস্তা আছে আমার টাইটা, ঠিক যেমন আছে আপনার। গোপনে শুধু নিজের চাটুকারদের কাছেই আমার সম্পর্কে নিজের শত্রুভাবাপন্ন মনোভাব ব্যক্ত করেছে উটেরিক।
তাহলে এখন আপনি কী করতে চান? প্রশ্ন করলাম আমি এবং রামেসিসের কণ্ঠ থেকে ভেসে আসা জবাবটা আমার কানে এমনভাবে বাজল, মনে হলো যেন আমি নিজেই বলেছি কথাগুলো।
ওকে খুন করার কথা আমি ভাবতেও পারব না। আমার বাবা ওকে ভালোবাসতেন, এই চিন্তাটুকুই আমার হাত থামিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। কিন্তু তাই বলে সে যদি আমাকে খুন করতে আসে তাহলেও আমি চুপ করে বসে থাকব না। আজই মিশর ছেড়ে চলে যাচ্ছি আমি। শান্ত যুক্তিপূর্ণ গলায় কথা বলল সে। আপনি কি আমার সাথে আসবেন, টাইটা?
অত্যন্ত আনন্দের সাথেই আপনার বাবার সেবা করেছি আমি, জবাব দিলাম আমি। আপনার জন্যও সেটা করতে পারলে সৌভাগ্য বোধ করব। আপনিই সেই রাজপুত্র, যার ফারাও হওয়া উচিত। সামনে এগিয়ে এসে বন্ধুত্বের নিদর্শন হিসেবে আমার ডান হাত চেপে ধরল সে। আমি বলে চললাম, তবে আরো কিছু মানুষ আছে যারা আমার জন্য নিজেদের প্রাণ বিপন্ন করেছে।
হ্যাঁ, আপনি কাদের কথা বলছেন আমি জানি, জবাব দিল রামেসিস। ক্যাপ্টেন ওয়েনেগ আর তার অধীনস্ত সৈন্যরা সবাই বিশ্বাসী এবং দক্ষ লোক। তাদের সাথে ইতোমধ্যে কথা হয়েছে আমার। ঠিক হয়েছে আমাদের সাথেই যাবে সবাই।
মাথা কঁকালাম আমি। তাহলে আর কোনো সমস্যা দেখছি না আমি। আপনি যেখানে নিয়ে যাবেন আমিও সেখানেই যাব, প্রভু রামেসিস। যদিও সেই জায়গাটা কোথায় আমি খুব ভালো করেই জানি, এমনকি যুবরাজ নিজেও হয়তো এত ভালোভাবে জানে না। তবে এখন সে ব্যাপারে কথা বলার সময় নয়।
আবার ডেকে উঠে এলাম আমরা দুজন। দেখলাম নদীর তীরে ইতোমধ্যে রথগুলো খুলে বিভিন্ন অংশে ভাগ করে ফেলেছে ওয়েনেগ আর তার লোকেরা। এখন সেই টুকরোগুলো তোলা হচ্ছে জাহাজের ডেকে সেখান থেকে পাঠিয়ে দেওয়া হবে নিচের মাল রাখার জায়গায়। এরপর ঘোড়াগুলোকেও জাহাজে তুলে নিচে পাঠিয়ে দেওয়া হলো। এক ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে পাল তোলার জন্য প্রস্তুত হয়ে গেল মেমনন। তীর থেকে সরে এলাম আমরা, উত্তর দিকে তাক করলাম জাহাজের মুখ। পালে আছে পর্যাপ্ত বাতাস, সেইসাথে নদীর ঢেউও আমাদের অনুকূলে। তার ওপরে নীলনদের জলে ফেনা তুলছে দাঁড়িদের ছন্দবদ্ধ দাঁড় টানা। তীর গতিতে উত্তর দিকে খোলা সাগর অভিমুখে এগিয়ে চললাম আমরা; ফারাওয়ের বিষাক্ত প্রভাব থেকে অনেক দূরে।
