নদীর তীরে আমাদের দেখতে পাওয়ার সাথে সাথে মেমননের নাবিকরা ব্যস্ত হয়ে উঠল। ক্রুশ আকৃতির ভারী তামার নোঙরটা পানি থেকে ওঠাতে শুরু করল কয়েকজন। তারপর ছোট ছোট পাল আর মৃদু পশ্চিমা বাতাসের সাহায্য নিয়ে জাহাজটা ধীরে ধীরে তীরের দিকে এগোতে শুরু করল, যেখানে আমরা সবাই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি।
আমার উৎসাহই সবার চাইতে বেশি, কারণ আমি অনুভব করতে পারছি যে মুক্তি আসন্ন। নির্যাতন-নিপীড়নের ভবনে ভুগের সাথে আরো একবার দেখা করার হাত থেকে এবারের মতো বেঁচে গেছি আমি।
মেমনন হচ্ছে আমার প্রিয় ফারাও টামোসের ছোটবেলার নাম। হিকসস তীরের আঘাতে তার মৃত্যুর পর খুব সামান্য সময়ই পার হয়েছে। নীলের পশ্চিম তীরে রাজাদের উপত্যকায় তৈরি হয়ে আছে তার কবর; কিন্তু সেখানে শোয়ানোর আগে মৃতদেহের জন্য জরুরি মমীকরণ প্রক্রিয়াও এখনো সম্পূর্ণ হয়নি। ফারাও টামোস সেখানে তার পূর্বপুরুষদের সাথে অনন্ত বিশ্রামে শায়িত হবেন।
আর এই মেমনন আদতে বিশালাকৃতির এক জাহাজ। তার গঠন সম্পর্কে আমার পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে জানা আছে, কারণ নকশাটা মূলত আমিই তৈরি করেছিলাম, যদিও তা কেউ জানে না। আমার বদলে ফারাও টামোসই সম্পূর্ণ কৃতিত্ব তার নিজের ঘাড়ে নিয়ে নিয়েছিলেন; কিন্তু এখন তিনি মৃত। আর মৃত ব্যক্তির কাছ থেকে তার কৃতিত্ব কেড়ে নেওয়ার মতো খারাপ মানুষ আমি নই। মেমননের খোলের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তের দূরত্ব হবে এক শ কিউবিটের বেশি। সম্পূর্ণ ধারণক্ষমতা পূরণ করা হলে তিন হাজার কিউবিট পর্যন্ত পানি সরাতে পারে। প্রতি পাশে তিনটি ভাগে মোট ছাপ্পান্নটা দাঁড়। দাঁড়িদের বসার জায়গাগুলো নিচের দিকে বেশ ছড়ানো এবং ওপরের দিকের সারির সাথে আছে ভারসাম্য রক্ষার বাড়তি কাঠামো, ফলে দাঁড়ের সাথে দাঁড় বাড়ি খায় না কখনো। চওড়ায় তেরো কিউবিটেরও কম, ফলে জলপথে তীরবেগে ছুটতে পারে, আবার চড়ায় থামাতেও অসুবিধা হয় না। একমাত্র মাস্তুল চাইলে নামিয়ে ফেলা যায় আবার ইচ্ছে করলে বিশাল পালও খাটানো যায় তাতে। সত্যিই রণতরীদের মাঝে সবচেয়ে সুন্দর নকশার জাহাজ এই মেমনন।
জাহাজটা নদীর পাড়ে নোঙর করতে দীর্ঘদেহী রহস্যময় এক আগন্তুককে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম পেছনের ডেকে। পরনে লাল রঙের আলখাল্লা, একই রঙের কাপড়ে ঢেকে রেখেছে মুখ। শুধু চোখের জায়গায় ফুটো করা। মনে হচ্ছে যেন নিজের পরিচয় সবাইকে জানাতে আপত্তি আছে এই লোকের। নাবিকরা জাহাজটাকে জায়গামতো বেঁধে রাখছে, এই সময় নিচে নেমে গেল সে। তার চেহারা দেখার বা পরিচয় আন্দাজ করার কোনো সুযোগই পেলাম না আমি।
কে ওটা? ওয়েনেগকে প্রশ্ন করলাম এবার। তার সাথেই কি দেখা করতে এসেছি আমরা?
মাথা নাড়ল ওয়েনেগ। আমি কিছু বলতে পারব না। এখানেই তীরেই আপনার জন্য অপেক্ষা করতে হবে আমাকে।
দ্বিধা না করে মেমননের সামনের ডেকে উঠে পড়লাম আমি, তারপর লম্বা লম্বা পায়ে ডেক পার হয়ে পেছনের ডেকে চলে এলাম। এখানে একটা গোলাকৃতি দরজা দিয়ে রহস্যময় লোকটা নিচে নেমে গেছে। ডেকের ওপর পা দিয়ে জোরে আঘাত করলাম আমি। সাথে সাথে একটা ভারী কিন্তু ভদ্র কণ্ঠস্বরে জবাব এলো। গলাটা চিনতে পারলাম না আমি।
দরজা খোলা আছে। নেমে আসুন আর দরজাটা বন্ধ করে দিন।
কথামতো কাজ করে নিচের কামরায় নেমে এলাম আমি। ছোট্ট একটা ঘর, নড়াচড়ার জায়গা বেশি নেই। কারণ এটা একটা যুদ্ধজাহাজ, প্রমোদতরী নয়। একটু আগে দেখা সেই লাল পোশাক পরা আগন্তুক এখানেই বসে আছে। উঠে দাঁড়ানোর কোনো চেষ্টা করল না সে, শুধু সামনে রাখা সরু বেঞ্চটা দেখিয়ে দিল।
এমন পোশাক পরে থাকার জন্য দুঃখ প্রকাশ করছি। কিন্তু একটু পরেই বুঝতে পারবেন যে কেন সবার কাছ থেকে আমার চেহারা লুকিয়ে রাখা জরুরি, অন্তত কিছু সময়ের জন্য। ছোটবেলায় আপনাকে খুব ভালোভাবেই চিনতাম আমি; কিন্তু পরিস্থিতি ধীরে ধীরে আমাদের দূরে সরিয়ে দিয়েছে। তা ছাড়া আপনি আমার বাবাকেও খুব ভালোভাবে চিনতেন, যিনি অত্যন্ত সম্মানের চোখে দেখতেন আপনাকে। এবং বর্তমানে আমার বড় ভাই, যে আপনার ব্যাপারে খুব একটা খুশি নয়…
কথাগুলো শেষ হওয়ার আগেই সামনে বসে থাকা মানুষটার পরিচয় সম্পর্কে নিঃসন্দেহ হয়ে গেলাম আমি। তাকে সম্মান দেখানোর জন্য তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়াতে চাইলাম এবং কাজটা করতে গিয়ে দড়াম করে মাথায় বাড়ি খেলাম ডেকের সাথে। লেবানন থেকে আনা আসল সিডার কাঠের তৈরি ডেক, তার তুলনায় আমার মাথার খুলি কিছুই নয়। দুই হাতে মাথা চেপে ধরে আবার বেঞ্চে বসে পড়লাম আমি, বাম চোখের ওপর দিয়ে রক্তের সরু ধারা গড়িয়ে। পড়তে শুরু করেছে।
আমার সামনে বসে থাকা মানুষটা তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়াল। তবে আমার মতো বোকামি করল না সে, মাথা নিচুই রাখল। নিজের মাথা থেকে লাল রঙের। কাপড়টুকু খুলে ফেলল সে, পাকিয়ে গোল আকৃতি দিল। তারপর সেটা আমার ক্ষতস্থানে চেপে ধরে চেষ্টা করতে লাগল রক্ত বন্ধ করার।
আপনিই প্রথম নন যে এখানে বাড়ি খেয়েছে, আমাকে আশ্বস্ত করল সে। ব্যথা লাগে ঠিক, তবে গুরুতর কিছু যে নয়, সেটা নিশ্চিত করে বলতে পারি, সম্মানিত টাইটা। এখন যেহেতু তার মুখ ঢেকে রাখা কাপড়টুকু আমার মাথার পরিচর্যায় ব্যস্ত, সেহেতু ইনি যে সত্যিই যুবরাজ রামেসিস সে ব্যাপারে আর কোনো সন্দেহ রইল না আমার মনে।
