পথের শেষ প্রান্তে রথের সারি নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল ওয়েনেগের সহকারীরা। জনসমুদ্র আমাদের ওপর সম্পূর্ণভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ার ঠিক আগ মুহূর্তে সেখানে পৌঁছে গেলাম আমরা। এই হইচইয়ের কারণে ঘোড়াগুলো বেশ ভয় পেয়ে গেছে, তবে আমরা রথে ওঠার সাথে সাথেই চালকরা তাদের লাগামে টান দিল। নুড়ি বিছানো পথ ধরে রথ নিয়ে দৌড়ে চলল ঘোড়াগুলো, উদ্দেশ্য শহরের প্রধান দরজা। খুব তাড়াতাড়িই জনতার ভিড়কে পেছনে ফেলে এলাম আমরা। শহরের প্রধান ফটক যখন আমাদের চোখে পড়ল তখন তা বন্ধ হয়ে যেতে শুরু করেছে। মরিয়া হয়ে সঙ্গীদের মাথার ওপর চাবুক ফুটিয়ে তাড়া দিল ওয়েনেগ, ফটক বন্ধ হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে সরু পথটা দিয়ে বাইরে খোলা জায়গায় বেরিয়ে এলাম আমরা।
.
যাচ্ছি কোথায় আমরা? কোনোমতে বলে উঠলাম আমি। কিন্তু আমার প্রশ্নের কোনো জবাব দিল না ওয়েনেগ, শুধু আমার হাতকড়ার চাবিটা তুলে দিল আমার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তীরন্দাজের হাতে। রথের ঝাঁকুনি থেকে আমি যেন শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারি, এ জন্য আমাকে ধরে রেখেছিল লোকটা। আগে বাঁধন খুলে দাও, তারপর ম্যাগাসের শরীর ঢাকার ব্যবস্থা করো। আমার প্রশ্নের জবাব দেওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা গেল না ওয়েনেগের মাঝে, তবে চেহারায় বেশ রহস্যময় একটা ভাব ফুটিয়ে তুলল সে।
কী দিয়ে আমার শরীর ঢাকবে ভেবেছ? নিজের প্রায় নগ্ন দেহের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলাম আমি। এবারও আমার প্রশ্নের কোনো জবাব মিলল না, তবে ওয়েনেগের তীরন্দাজ রথের নিচ থেকে একটা কাপড়ের পুঁটলি তুলে নিয়ে ধরিয়ে দিল আমার হাতে।
আপনি যে এত বিখ্যাত আমি জানতামই না, বলে উঠল তীরন্দাজ। পুঁটলি থেকে একটা সবুজ টিউনিক বের করে মাথায় গলালাম আমি। পুঁটলিতে এই একটা কাপড়ই আছে, ফলে বেশ বিরক্ত হলেও এটাই পরতে হবে আমাকে। সবুজ রংটা একেবারেই আমার পছন্দ নয়, কারণ আমার চোখের রংকে সম্পূর্ণ ম্লান করে দেয় এই রঙের পোশাক। ওরা কীভাবে আপনার নাম ধরে ডাকছিল শুনেছেন? উত্তেজিত গলায় বলে চলেছে তীরন্দাজ। আমি তো ভেবেছিলাম আপনাকে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলবে; কিন্তু না। ওরা তো আপনাকে ভালোবাসে! পুরো মিশর আপনাকে ভালোবাসে, টাইটা। লোকটার কথা শুনে লজ্জা লাগতে শুরু করল আমার, সুতরাং সেটা ঢাকার জন্য ওয়েনেগের দিকে তাকালাম আমি।
নির্যাতন ভবনে ভুগের কাছে পৌঁছানোর জন্য এটাই সবচেয়ে ছোট রাস্তা বলে তো মনে হয় না, বললাম আমি। এবার আমার দিকে তাকিয়ে দাঁত বের করে হাসল ওয়েনেগ। ডুগের সাথে আপনার দেখা করার শখটা মেটাতে পারছি না বলে দুঃখিত প্রভু। এখন আসলে সম্মানিত ডুগের বদলে অন্য আরেকজনের সাথে দেখা করতে হবে আপনাকে। চাবুক চালিয়ে রথের গতি আরো বাড়িয়ে তুলল ওয়েনেগ। নীলনদের বন্দরের দিকে যে রাস্তা গেছে সেটা ধরে এখন ছুটছে আমাদের রথ। তবে বন্দরে পৌঁছানোর আগেই আরো একবার রথের মুখ ঘোরাল সে, এবার উত্তরমুখী একটা রাস্তায়, যেটা নদীর সাথে সমান্তরালে এগিয়ে গেছে। একই রকম দ্রুতগতিতে বেশ কয়েক লিগ পথ চলতে হলো আমাদের। একই প্রশ্ন বারবার জিজ্ঞেস করে ওয়েনেগের চোখে নিজেকে অধৈর্য প্রমাণ করতে চাই না বলে চুপ করে থাকলাম আমি। এমনিতে আমার চেহারা দেখে বোঝার উপায় নেই- রাগের চিহ্ন আমি কখনো চেহারায় প্রকাশ করি না। কিন্তু বলতে বাধ্য হচ্ছি তার এই রহস্যময় নীরবতা একটু হলেও বিরক্ত করে তুলেছে আমাকে।
নদীর তীরে জন্মানো ঘন জঙ্গলের ফাঁক দিয়ে মাঝে মাঝে নদীর রুপালি চিহ্ন দেখা যাচ্ছে। কিন্তু চেহারা ভাবলেশহীন করে রাখলাম আমি, পুব দিগন্তে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকা দূরের পাহাড়গুলোর দিকে তাকিয়ে থাকলাম। তারপর হঠাৎ ওয়েনেগকে উত্তেজিত গলায় বলতে শুনলাম, এই তো! যেখানে কথা ছিল সেখানেই আছেন দেখা যায়!
আমিও ঘুরে তাকালাম, তবে একেবারেই আস্তে আস্তে অলস ভঙ্গিতে। কিন্তু হঠাৎ করেই রথের ওপর ঝাঁকি খেয়ে সোজা হয়ে বসলাম আমি। নীলনদের কিনার থেকে মাত্র এক শ কদমের মতো দূরত্বে নোঙর করে দাঁড়িয়ে আছে। মিশরীয় নৌবাহিনীর প্রধান জাহাজ, নিঃসন্দেহে যেটা অন্য সব জাহাজের চাইতে বেশি শক্তিশালী এবং দ্রুতগতিসম্পন্ন। দৌড়ের পাল্লায় অন্য সব জাহাজকে হারিয়ে দিতে পারে সে, নিজের ওপর ধারণ করতে পারে এক শ দক্ষ নাবিক ও যোদ্ধার ভার।
আর শান্ত হয়ে বসে থাকা সম্ভব হলো না আমার পক্ষে। তড়িঘড়ি করে সোজা হয়ে উঠে দাঁড়ালাম আমি। তড়বড় করে বলে উঠলাম, দেবী হাথোরের বিশাল বক্ষ আর পিচ্ছিল যোনির কসম! এ তো মেমনন!
দেবতা পোসাইডনের বিশাল পুরুষাঙ্গ আর উত্তাল অণ্ডকোষের কসম! জীবনে বোধ হয় প্রথমবারের মতো সঠিক কোনো কথা বললেন আপনি, টাইটা, আমার কথার জবাবে পাল্টা ঠাট্টা করে উঠল ওয়েনেগ।
এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেলাম আমি। তারপর নিজেকে সামলাতে না পেরে হেসে উঠলাম, জোরে একটা ঘুষি মারলাম ক্যাপ্টেনের দুই কাঁধের মাঝখানে। এত সুন্দর একটা জাহাজ আমাকে দেখানো মোটেই উচিত হয়নি তোমার। এখন যত সব উদ্ভট চিন্তা খেলা করতে শুরু করেছে আমার মাথায়।
স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছি, ওই উদ্দেশ্যেই কাজটা করেছি আমি। এই কথা বলে নিজের রথের ঘোড়াগুলোর লাগাম টেনে ধরল ওয়েনেগ। দাঁড়া! শক্তিশালী প্রাণীগুলো মাথা ঝাঁকাল, ঘাড় বাঁকিয়ে টানটান করে তুলল লাগাম। নদীর কিনারে ঝাঁকি খেয়ে থেমে দাঁড়াল রথ। আমাদের সামনে নীলনদের তীরে এখন ভাসমান অবস্থায় দেখা যাচ্ছে বিশাল যুদ্ধজাহাজটাকে।
