কাপুরুষ উটেরিক একবার কেবল ঘৃণার দৃষ্টিতে তাকাল আমার দিকে, তারপর হাত নেড়ে সরিয়ে নিয়ে যেতে নির্দেশ দিল। লুক্সরের রাজদরবারে আমিই এখন একমাত্র ব্যক্তি, যার মুখে হাসি খেলা করছে। বর্তমানে যে দানব মিশরের সিংহাসনে বসেছে তার বিরুদ্ধে কেবল এই ব্যঙ্গের হাসিটুকু ছাড়া আর কোনো অস্ত্র নেই আমার কাছে।
.
ফারাওয়ের নির্দেশ অনুযায়ী ওয়েনেগ আর তার সৈন্যরা মিলে আমাকে নিয়ে লুক্সর প্রাসাদের দরবার কক্ষ থেকে বেরিয়ে এলো। পরনে ছোট্ট এক টুকরো কাপড় আর শিকলগুলো ছাড়া কিছুই নেই আমার। বিশাল সিঁড়ির শুরুতে এসে হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে পড়লাম আমি, অবাক হয়ে চেয়ে রইলাম সিঁড়ির নিচে ভোলা প্রাঙ্গণে জড়ো হওয়া বিপুল জনতার দিকে। মনে হচ্ছে যেন এই বিশাল শহরের প্রতিটি নাগরিক আজ এখানে এসে হাজির হয়েছে, তাদের ভিড়ে উপচে পড়ছে প্রাঙ্গণ। সবাই চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে, কারো মুখে কোনো কথা নেই।
তাদের ঘৃণা আর শত্রুতার ভাব অনুভব করতে পারছিলাম আমি। যদিও তাদের বেশির ভাগই আমার নিজের মানুষ। তারা অথবা তাদের বাপ-দাদারা বিগত পঞ্চাশটি যুদ্ধে আমার পাশে দাঁড়িয়ে লড়াই করেছে। যারা যুদ্ধে পঙ্গু হয়ে গেছে তাদের দায়িত্ব নিয়েছি আমি, আমার সম্পত্তির অংশ ভাগ করে দিয়েছি। আমার কারণেই আশ্রয় এবং দিনে অন্তত একবেলা খাবার পেয়েছে। তারা। যারা মারা গেছে তাদের বিধবারাও ক্ষতিপূরণ পেয়েছে আমার কাছ থেকে। তাদের কাজ দিয়েছি আমি, ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা করিয়েছি, যাতে এই কঠিন পৃথিবীতে তারা নিজেদের জায়গা করে নিতে পারে। কিন্তু এখন বুঝতে পারছি আমার সেই দানশীলতাকে তারা সবাই অস্বীকার করেছে, তার বদলে আজ এখানে হাজির হয়েছে নিজেদের ঘৃণার উন্মুক্ত প্রকাশ ঘটাতে।
এরা এখানে কেন? মৃদু স্বরে ঠোঁট প্রায় না নাড়িয়ে ওয়েনেগকে জিজ্ঞেস করলাম আমি।
আরো মৃদু গলায় আমার প্রশ্নের জবাব দিল ওয়েনেগ। ফারাওয়ের নির্দেশ। এরা আপনাকে বিশ্বাসঘাতক হিসেবে অভিশাপ দিতে এসেছে, আবর্জনা ছুঁড়ে মারতে এসেছে আপনার গায়ে। ফারাও বলেছেন, যতভাবে সম্ভব আপনাকে অপমান করা হবে।
এ জন্যই আমার পোশাক খুলে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল সে। আমিও এতক্ষণ ভাবছিলাম আমার পোশাক খুলে নেওয়ার জন্য ফারাওয়ের এত ব্যস্ত তা কেন। এখন কারণটা বুঝতে পারছি। সে চায় আমি যেন ওই আবর্জনার স্পর্শ অনুভব করি। বেশ। তোমরা কিন্তু আমার বেশি কাছাকাছি থেকো না, তাহলে তোমাদের গায়েও লাগতে পারে।
আমি আপনার ঠিক এক কদম পেছনেই থাকব। যা আপনি সহ্য করতে পারবেন টাইটা তা আমিও সহ্য করতে পারব।
অনেক বেশি সম্মান দিচ্ছ আমাকে ওয়েনেগ, প্রতিবাদ জানালাম আমি।
তারপর নিজেকে শক্ত করে সিঁড়ি বেয়ে নামতে শুরু করলাম ক্রোধান্বিত জনসমুদ্রের মাঝে। শুনতে পাচ্ছি আমার প্রহরীরাও সবাই আমার কাছাকাছি রয়েছে, কেউ আমাকে অপমানের মুখে একা যেতে দিতে রাজি নয়। তাড়াহুড়ো করছি না আমি, আবার ধীরে ধীরেও হাঁটছি না। স্বাভাবিক পদক্ষেপে মাথা উঁচু রেখে সামনে এগিয়ে যাচ্ছি কেবল। জনসমুদ্রের মাঝে ভেসে থাকা মুখগুলো পরীক্ষা করলাম, এক এক করে ঘৃণার চিহ্ন খুঁজছি। অপেক্ষা করছি কখন তাদের অপমানের ঝড় আছড়ে পড়বে আমার ওপর।
তারপর একেবারে সামনের সারিতে দাঁড়ানো মানুষগুলোর মুখ আরো পরিষ্কার হয়ে আসতে হঠাৎ বিভ্রান্ত হয়ে পড়লাম আমি। উপস্থিত মহিলাদের অনেকের চোখেই অশ্রু। এটা তো আমি আশা করিনি। পুরুষদের চেহারা গম্ভীর, এমনকি ব্যাপারটা এতই অচিন্তনীয় যে, নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে মন চাইল না- বিষণ্ণ হয়ে আছে, যেন শেষকৃত্যে অংশ নিতে এসেছে তারা।
হঠাৎ করেই সশস্ত্র প্রহরীদের সীমানা এড়িয়ে এক মহিলা সামনে চলে এলো। প্রহরীদের রাখা হয়েছে ইচ্ছে করেই, যেন তারা ভিড় সামলে রাখতে পারে। আমার কাছ থেকে কয়েক কদম দূরে এসে থামল মহিলা, কিছু একটা ছুঁড়ে মারল আমার দিকে। জিনিসটা আমার পায়ের কাছে পড়ল। ঝুঁকে এসে শিকলে বাঁধা দুই হাত দিয়ে সেটা পাথরের মেঝে থেকে তুলে নিলাম আমি।
ফারাওয়ের নির্দেশ অনুযায়ী কোনো আবর্জনা বা মানুষের বর্জ্য নয় সেটা, বরং নীলনদের পানি থেকে তুলে আনা একটা অদ্ভুত সুন্দর নীলপদ্ম ফুল। সাধারণত দেবতা হোরাসের পুজো দিতে এই ফুল ব্যবহার করা হয়। ভালোবাসা এবং গভীর সম্মানের প্রতীক এটা।
প্রহরীদের সারি থেকে দুজন এগিয়ে এলো মহিলার দিকে। তার দুই হাত ধরল তারা; কিন্তু কারো চেহারায় রাগের কোনো লক্ষণ দেখা গেল না। শান্ত ভঙ্গিতে মহিলাকে ধরে রেখেছে তারা, দুজনের চেহারাই বিষণ্ণ।
টাইটা! বলে উঠল মহিলা। আমরা তোমাকে ভালোবাসি।
তার পরেই জনতার সমুদ্রের মাঝখান থেকে দ্বিতীয় একটা কণ্ঠস্বর চিৎকার করে উঠল, টাইটা! তারপর আরো একজন বলে উঠল টাইটা! হঠাৎ করেই যেন একজন মানুষ থেকে শুরু করে হাজার মানুষের কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল আমার নাম।
দ্রুত আপনাকে শহরের প্রাচীরের বাইরে নিয়ে যেতে হবে, আমার কানের কাছে মুখ এনে চিৎকার করে বলল ওয়েনেগ ফারাও কিছু বুঝে ওঠার আগেই সরে যেতে হবে আমাদের। না হলে তার ক্রোধ থেকে কেউ রেহাই পাবে না। কিন্তু এসব কী হচ্ছে আমি নিজেই তো বুঝতে পারছি না? আমিও পাল্টা চিৎকার করে জবাব দিলাম। এবার আর কোনো কথা বলল না ওয়েনেগ, শুধু আমার বাহু চেপে ধরল শক্ত করে। আরেক হাত চেপে ধরল ওয়েনেগের অধীনের আরেকজন লোক। আমাকে প্রায় মাটি থেকে তুলে নিয়ে পথ ধরে দৌড়ে চলল দুজন। প্রতি মুহূর্তে কমে আসছে পথের প্রস্থ, কারণ দুই পাশে জড়ো হওয়া জনতা আমাদের দিকে সরে আসছে। সবার উদ্দেশ্য হয় আমাকে ছুঁয়ে দেখা অথবা জড়িয়ে ধরা; আসলে কোনটা সেটা আমি নিজেও বুঝতে পারছি না।
