তবে অন্য তিনটি সুড়ঙ্গের তুলনায় এই সুড়ঙ্গের অবস্থা যথেষ্ট ভালো, সময়ের কামড় এখানে অন্য গুহাগুলোর তুলনায় লাগেনি বললেই চলে। টালিগুলোর মাঝে কমপক্ষে চার ভাগের এক ভাগ এখনো অক্ষত রয়েছে। আমার পায়ের নিচে সিঁড়ির ধাপগুলো হালকা ক্ষয়ে গেছে শুধু, খুব সম্ভব প্রাচীনকালে এখান দিয়ে চলাচল করা সেই অজানা জাতির লোকদের পায়ের ঘষায়।
সুড়ঙ্গটা দুই কি তিন জায়গায় পাথর ধস এবং অন্যান্য আবর্জনা পড়ে বন্ধ হয়ে গেছে। তবে খালি হাতেই সেগুলো সরিয়ে পথ করে নিতে পারলাম আমি। সিঁড়িটা পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে খাড়া নেমে গেছে দ্বীপের মাঝখান দিয়ে। নামার সময় ধাপগুলো গুনতে লাগলাম আমি। দেড় শ ধাপের মতো গুনলাম, তারপর হঠাৎ চমকে উঠে উপলব্ধি করলাম যে এতক্ষণে নদীর তলদেশের চাইতেও অনেক নিচে নেমে আসার কথা আমার।
এখন যেকোনো মুহূর্তে পানিতে ডুবে মরতে পারি আমি। সুড়ঙ্গের মাঝে আচমকা ছুটে আসতে পারে পানির বিপুল তোড়, চিরকালের জন্য ভাসিয়ে নিয়ে যেতে পারে আমাকে। ঘুরে দাঁড়িয়ে দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে শুরু করলাম আমি। সকল দেব-দেবীর প্রতি মনে মনে প্রার্থনা করছি, বিশেষ করে ইনানার প্রতি। আবেদন জানাচ্ছি আমাকে যেন কিছুতেই এভাবে একা একা ভূগর্ভ থেকে বহু নিচে মৃত্যুবরণ করতে না হয়।
সুড়ঙ্গের প্রবেশমুখে যখন এসে পৌঁছলাম তখন হাপরের মতো হাঁপাচ্ছি আমি, নিঃশ্বাস পড়ছে জোরে জোরে। দুটো পায়ের মধ্যে একটা পায়ের পাতা ভিজে গেছে কেবল; কিন্তু বাকি শরীর একেবারে খটখটে শুকনো। সুড়ঙ্গের প্রথম সিঁড়িতে বসে পুরো ব্যাপারটা নিয়ে ভাবতে শুরু করলাম আমি। বুঝতে পারলাম অন্তত একবারের জন্য হলেও হিসাবে ভুল হয়েছে আমার, যদিও সেটা অত্যন্ত বিরল একটা ঘটনা। নদীর নিচে যদি কোনো সুড়ঙ্গ বা পথ থাকে তাহলে যে তাতে পানি ঢুকবেই এমনটা নাও হতে পারে।
তবে আমাকে দোষও দেওয়া যায় না। জীবনে এই প্রথমবারের মতো নদীর নিচ দিয়ে চলে গেছে এমন কোনো সুড়ঙ্গ দেখলাম আমি। বিশেষ করে নীলনদের মতো শক্তিশালী নদীর নিচে এমন পথ থাকতে পারে তা কেউ ঘুণাক্ষরেও সন্দেহ করবে না। আমার মাথাতেও এমন চিন্তা কখনো আসেনি। কিন্তু এখন নিজের চিন্তাধারাকে বদলানো ছাড়া কোনো পথ দেখছি না। এবং এই চিন্তাটা মাথায় আসার পরেই আমি ধরে ফেললাম আমার আগের ধারণায় ঠিক কোন অংশটা ভুল ছিল।
নৌকা যখন পানিতে ভাসে তখন তার খোলের ভেতর পানি ওঠে না কেন? এই প্রশ্নের উত্তরটা হলো, পানি খোলের ভেতরে ঢোকার কোনো পথ পায় না। কিন্তু খোলে যদি একটা ছিদ্র করে দেওয়া হয় তাহলে সাথে সাথে তার ভেতর দিয়ে পানি উঠে ভরে যায়! যে পৃথিবীর ওপর আমরা বাস করছি তার উপরিভাগ চ্যাপ্টা হওয়ার ব্যাপারটার মতোই এই ধারণাটাও যৌক্তিক বলে মনে হতে লাগল আমার কাছে।
তবে এটা স্বীকার করছি যে, একটা নৌকার খোল আর নীলনদের নিচে একটা সুড়ঙ্গের মাঝে যে বিশাল তফাত আছে সেটাকে প্রয়োজনের খাতিরেই এড়িয়ে গেলাম আমি।
অধৈর্য হয়ে ইনানার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম আমি, মনে মনে চাইছি দ্রুত দেখা দিক সে। তাহলে এই ব্যাপারটা নিয়ে তার সাথে আলোচনা করা যাবে, পরামর্শ নেওয়া যাবে। কিন্তু আজ নিশ্চয়ই নারীসুলভ খামখেয়ালিতে পেয়েছে তাকে, দেখা দেওয়ার কোনো লক্ষণই নেই। এভাবেই একসময় ভোরের আলো ফুটতে শুরু করল। আর বেশিক্ষণ এখানে থাকলে দুর্গ প্রাচীরের ওপর দাঁড়ানো প্রহরীরা আমাকে দেখে ফেলতে পারে। তাই যত দ্রুত সম্ভব ভাগতে হবে এখান থেকে।
দিনের বাকি সময়টা আমার কাটল রাত নামার জন্য অস্থির অপেক্ষায়। তবে এই সময়ের মাঝে একজন সহকারীকে খুঁজে বের করলাম আমি, যে ভবিষ্যতে আমাকে সাহায্য করতে পারবে। এই কাজের জন্য আমার প্রথম পছন্দ হলো নাসলা। শুধু অল্পবয়স্ক এবং শক্তিশালী বলে নয়, আবু নাসকোস দুর্গ সম্পর্কে দুই পক্ষেরই সমস্ত সৈন্যদের চাইতে ওর জ্ঞান অনেক বেশি। নদীর মাঝে অবস্থিত দ্বীপ এবং সেগুলোর সুড়ঙ্গ সম্পর্কে আমার কাছ থেকে জানতে পেরে সেও একই রকম উত্তেজিত হয়ে উঠল, এক কথায় রাজি হয়ে গেল আমার সাথে যেতে।
*
সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে ডিঙি নৌকা নিয়ে যাত্রা শুরু করলাম আমরা। দ্বীপের গোড়ায় পৌঁছে নৌকা বেঁধে রাখলাম গতকালের মতো, তারপর ওপরে উঠে এলাম। সুড়ঙ্গটা দেখেই বিস্মিত হয়ে উঠল নাসলা। প্রশ্ন করল, কিন্তু এই সুড়ঙ্গটা কোথায় গিয়ে থেমেছে প্রভু?
এখনো জানি না। তবে সেটা জানার জন্যই এখানে এসেছি আমরা।
আপনার যদি আপত্তি না থাকে তাহলে আমিই প্রথমে যেতে চাই, বলল নাসলা। নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকিয়ে নাসলার জন্য জায়গা করে দিলাম আমি। অবশ্য এমনটা ভাবার কোনো প্রয়োজন নেই যে আমি ভয় পেয়েছি। সুড়ঙ্গের ভেতর থেকে ওর কণ্ঠস্বর ভেসে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম আমি। দেখলাম অনেক নিচ থেকে ভেসে আসছে নাসলার হাতে ধরা মোমবাতির আলো।
নিচে নেমে এসেছি আমি প্রভু টাইটা। আপনি কি আসছেন? চিৎকার করে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল সে। শুনে মনে হলো না যে পানিতে ডুবে মরার মতো কোনো বিপদের সম্মুখীন হতে হয়েছে তাকে। আমার ধারণায় যে আসলেই কোনো ফুটো নেই সেটা ধরতে পেরে বেশ খুশি হয়ে উঠলাম আমি। তারপর সিঁড়ি বেয়ে নামতে শুরু করলাম নিচে, যেখানে নাসলা অপেক্ষা করছে আমার জন্য। একদম নিচে নেমে আসার পর দেখলাম সুড়ঙ্গটা এখান থেকে খাড়া নেমে যাওয়ার বদলে সমান্তরালভাবে এগিয়ে গেছে এক দিকে।
