আর সামনে গেছ নাকি তুমি? নাসলাকে প্রশ্ন করলাম আমি।
না প্রভু। আমার মনে হয়েছিল এই সম্মান আপনারই প্রাপ্য।
তীক্ষ্ণ চোখে ওর দিকে তাকালাম আমি, বোঝার চেষ্টা করছি যে ব্যাটা ঠাট্টা করছে কি না। তবে মোমবাতির আলোতে ওর চেহারা যতটুকু দেখা গেল তাতে ঠাট্টার কোনো চিহ্ন দেখা গেল না। তাহলে এসো আমার সাথে, নাসলা। লোকটাকে যত দেখছি আমি ততই পছন্দ করে ফেলছি। সুড়ঙ্গ ধরে সামনে এগিয়ে গেলাম আমি, নাসলা রইল পেছনে। বহু শতাব্দীর মাঝে আমরাই খুব সম্ভব প্রথম মানুষ যারা এখানে পা রাখল। মাথার ওপরে পানির বিপুল চাপ কাজ করছে, তা সামলানোর জন্য নিশ্চয়ই সুড়ঙ্গের এই অংশকে অনেক বেশি পোক্ত করে বানানো হয়েছে। লাল রঙের মাটির ইট দিয়ে সুড়ঙ্গটা তৈরি করেছে প্রাচীনরা, ওপরে যেমন সুন্দর পোড়ামাটির টালি দেখেছিলাম তেমন নয়। ইটগুলোর মাঝে জোড়া এত মিহি যে প্রায় বোঝাই যায় না। কয়েকটা জোড়া খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পরীক্ষা করলাম আমি। পানি চোয়ানোর কোনো লক্ষণ দেখা গেল না। এবার আমরা যে সমান্তরাল সুড়ঙ্গে প্রবেশ করেছি সেটাকে দেখলাম ভালো করে, তারপর যে খাড়া সুড়ঙ্গটা ধরে নিচে নেমে এসেছি সেটার সাথে মিলিয়ে দেখলাম। যা আশা করেছিলাম ঠিক তাই। এই সুড়ঙ্গটা এগিয়ে চলেছে পশ্চিম দিকে অর্থাৎ আবু নাসকোসের দুর্গ অভিমুখে। যদিও ধারণাটাকে প্রমাণ করার জন্য জাদুর মাছটা এখন নেই আমার কাছে।
এসো, নাসলা, তাকে বললাম আমি, তারপর দুজন মিলে আবার এগিয়ে চললাম সুড়ঙ্গ ধরে। হাঁটার সময় পদক্ষেপগুলো জোরে জোরে গুনতে লাগলাম আমি। প্রায় তিন শ দশ পা সোজা এগিয়ে গেলাম আমরা। পায়ের নিচে টালিগুলো সব শুকনো। সুড়ঙ্গের ভেতরের বাতাসটা ঠাণ্ডা, একটু শুকনো শুকনো। তবে নিঃশ্বাস নিতে কোনো অসুবিধা হচ্ছে না তাতে।
তারপর হঠাৎ করেই আমাদের পায়ের নিচের মেঝে ওপরের দিকে উঠতে শুরু করল। মোমবাতির শিখার ওপর দিয়ে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাল নাসলা। কী ঘটেছে তাকে বুঝিয়ে বললাম আমি। নদী পার হয়ে পশ্চিম তীরের কাছে চলে এসেছি আমরা। এখন ওপরের দিকে উঠছি। আমার ধারণা দুর্গের ভিত্তির দিকে এগিয়ে গেছে এই পথ। যদিও এখনো সে ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়ার কোনো উপায় নেই; কিন্তু এই দেয়ালগুলোর দিকে একবার তাকিয়ে দেখো।
সুড়ঙ্গের দেয়ালগুলোতে আরো একবার শুরু হয়েছে রঙিন পোড়ামাটির টালির আবরণ। বোঝা যাচ্ছে আমাদের মাথার ওপর এখন আর নীলনদের পানি বয়ে চলছে না বা বইলেও তার পরিমাণ খুবই কম। এই টালিগুলোর ওপরে অবশ্য কোনো ছবি আঁকা নেই, তবে প্রাচীন কোনো এক রহস্যময় ভাষায় কিছু একটা লেখা রয়েছে। বুঝতে পারলাম এই সুড়ঙ্গের নির্মাতারাই লিখে রেখে গেছে এগুলো। হয়তো নিজেদের বুদ্ধিমত্তা ও দক্ষতার প্রশস্তি লিখে রেখে গেছে তারা। তবে লেখাগুলোর পাঠোদ্ধার করার জন্য কোনো সময় নষ্ট না করে সামনে এগিয়ে গেলাম আমি, সুড়ঙ্গটা কোথায় গিয়ে শেষ হয়েছে দেখার জন্য আর তর সইছে না। আরো দেড় শ কদমের মতো এমন ঢালু সুড়ঙ্গ বেয়ে ওঠার পর হঠাৎ করেই থেমে যেতে হলো আমাদের। মনে হলো যেন কোনো একসময় পাথরধস নেমে বন্ধ হয়ে গেছে সামনে এগোনোর পথ। আর সামনে যাওয়ার উপায় নেই। ব্যাপারটা এমন খেপিয়ে তুলল আমাকে যে, এমন কিছু একটা করে বসলাম যেটা কখনো করি না আমি। চেঁচিয়ে একটা গালি দিয়ে উঠলাম, তারপর সামনে পথ আটকে থাকা পাথরের স্কুপের গায়ে ঘুষি মারার জন্য পিছিয়ে আনলাম হাত।
পেছন থেকে আমার মুঠি পাকানো হাতের কনুই ধরে ফেলল নাসলা, ডান হাতের হাড়গুলো ভেঙে ফেলা থেকে বিরত করল আমাকে। কয়েক মুহূর্ত ওর কাছ থেকে হাত ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য ধস্তাধস্তি করলাম আমি, তারপর হার মেনে নিলাম।
ধন্যবাদ, বললাম নাসলাকে। তোমার কাছে কৃতজ্ঞ আমি। তুমি না থাকলে হয়তো দেয়ালটার আরো বেশি ক্ষতি হয়ে যেত।
কোনো অসুবিধা নেই প্রভু। এমন কাজ করার অভ্যাস আছে আমার। আমার ভাই বাতুরও দারুণ বদমেজাজি। কথাটা এমন মিষ্টি, বন্ধুত্বপূর্ণ গলায় বলল সে, কয়েক মুহূর্তের জন্য দেয়ালের গায়ে কপাল ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে রাখলাম আমি, প্রাণপণ চেষ্টায় সামলে নিলাম আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে চাওয়া ক্রোধকে।
তারপর ফিসফিসিয়ে কিন্তু তীক্ষ্ণ গলায় বললাম, আর কিছু বলার দরকার নেই, নাসলা। এবার যে পথে এসেছি সেই পথেই আবার ফিরে যাব আমরা। একটু তাজা বাতাসে নিঃশ্বাস নেওয়া দরকার। তা না হলে আমাদের দুজনের মাঝে। কেউ একজন হয়তো এখানেই মারা পড়বে।
তাই বলে এমনটা যেন কেউ না ভাবে যে আমি আমার মেজাজ নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। পরদিন সকাল নাগাদ প্রায় সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হয়ে উঠলাম আমি। বুঝতে পারলাম এটা সাময়িক একটা ঝামেলা মাত্র। সিদ্ধান্ত নিলাম এখানেও রামেসিসের দক্ষ চিন্তাভাবনা এবং সুচিন্তিত মতামতের প্রয়োজন আমার। নীলনদের পশ্চিম তীরের কাছে পাওয়া গেল ওকে, হুরোতাসের সাথে দুর্গের দেয়াল বরাবর সুড়ঙ্গ খোঁড়ার কাজ তদারকিতে ব্যস্ত। রানি সেরেনা ক্লিওপেট্রাও ওর সাথে রয়েছে দেখে আরো খুশি হয়ে উঠলাম, কারণ আমি আশা করছিলাম যে ওকেও এখানেই পাওয়া যাবে।
৮. আমার পথপ্রদর্শক
আমার পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করল সেরেনা, দুর্গ অবরোধে আমাদের কাজ কেমন চলছে সব ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখাল। বিভিন্ন কারিগরি ব্যাপারে ওর জ্ঞান দেখে অবাক হয়ে গেলাম আমি। সব দেখতে দেখতে সময় হয়ে গেল দুপুরের খাওয়ার। একটা এলম গাছের নিচে বসে একসাথে খাবার খেয়ে নিলাম সবাই। এখান থেকে উটেরিকের দুর্গ এবং যুদ্ধক্ষেত্রের পুরোটাই দেখা যায়। দুরে দেখা যাচ্ছে নীলনদ আর সেই চারটি দ্বীপ, যারা এখন আমার চিন্তাভাবনার প্রায় পুরোটাই দখল করে রেখেছে। এই দূরত্ব থেকে ওগুলোকে খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হচ্ছে না। তবে আমাদের আলাপকে সঠিক দিকে নিয়ে যেতে সাহায্য করল ওদের উপস্থিতি। দ্বীপগুলোর প্রতি আমার আগ্রহের কথা এখনো জানে না রামেসিস এবং সেরেনা। ওরা এবং ইনানা- এ দুই পক্ষের কাকে বেছে নেব তাই নিয়ে একটু দোটানায় আছি আমি। দেবীর সাথে আমার বিশেষ সম্পর্কটার ব্যাপারেও ওদের কিছু জানা নেই, তাই এ ব্যাপারে ইনানার কাছ থেকে পাওয়া সাহায্যের কথা সম্পূর্ণ এড়িয়ে গেলাম। পুরো ব্যাপারটা চাপালাম জাহাজের সারেং গানোর্ডের ঘাড়ে, যে কিনা প্রথম টালিটা দিয়েছিল আমাকে।
