ওরা যে আমাদের অত্যন্ত কাজে আসবে এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই আমার মনে।
*
পরের কয়েক সপ্তাহ কেটে গেল নদীর ওপার থেকে আমাদের সকল সৈন্যকে এ পারে নিয়ে আসতে, তারপর দুর্গের চারপাশে তাদের মোতায়েন করতে। উটেরিকের আস্তানার ওপর মরণকামড় বসানোর পরিকল্পনা করছি আমরা। শেষ পর্যন্ত যখন আমাদের আক্রমণের পদক্ষেপ শুরু হলো, বোঝা গেল যে আনুষ্ঠানিক নাচের সময় যেমন তিন পা এগিয়ে দুই পা পিছিয়ে আসতে হয় এখানেও ঠিক তাই ঘটতে যাচ্ছে। আমাদের প্রকৌশলীরা দুর্গের প্রচীর অভিমুখে পরিখা এবং সুড়ঙ্গ খোঁড়ার কাজে হাত দিয়ে ফেলল খুব তাড়াতাড়ি। দুর্গ-প্রাচীর থেকে নিরাপদ দূরত্বে এই কাজ শুরু করল তারা, যাতে প্রাচীরের ওপর দাঁড়ানো শত্রু তীরন্দাজদের তীরবৃষ্টির মুখে পড়তে না হয়। উটেরিকের লোকেরা রাতের বেলায় বের হয়ে এসে চেষ্টা করতে লাগল আমাদের সুড়ঙ্গ এবং পরিখা খোঁড়ার কাজে বাগড়া দেওয়ার। যার ফলে নিশ্চিদ্র অন্ধকারের মাঝে তাদের সাথে লড়াই করতে বাধ্য হলাম আমরা, যেখানে শত্রু-মিত্র চেনার কোনো উপায়ই থাকে না।
প্রতি রাতে এমন লড়াই হওয়ার পর সকালে উঠে ক্ষয়ক্ষতি হিসাব করে দেখি আমরা, তারপর আবারও হাত লাগাই নষ্ট হয়ে যাওয়া সুড়ঙ্গ মেরামতের কাজে। চেষ্টা করি মাটির নিচ দিয়ে দুর্গের দুর্ভেদ্য দেয়ালের দিকে এগিয়ে যাওয়ার। বলাই বাহুল্য যে, কাজটা আমার খুব একটা পছন্দ হলো না। তাই দুর্গ-প্রাচীর ভেদ করার মতো কঠিন কাজটা রামেসিস এবং হুরোতাসের মতো অপেক্ষাকৃত অভিজ্ঞ এবং ধৈর্যশীল লোকদের ওপরই ছেড়ে দিলাম আমি।
নীলনদের বুকে অবস্থিত সেই চারটি দ্বীপের চিন্তা আবারও ফিরে এলো আমার মাথায়। মনে পড়ল দেবী ইনানার কথা, ওই দ্বীপগুলোতে প্রায়ই যার দেখা পাওয়া যায় এবং আমাকে সাহায্য করার জন্য যে দারুণ আগ্রহী। নদীর পুব তীর থেকে শুরু করে তিনটে দ্বীপেরই সব কিছু পরীক্ষা করে দেখা হয়ে গেছে আমার, এখন কেবল আবু নাসকোস দুর্গের সবচেয়ে কাছে যে দ্বীপটা রয়েছে সেটাই পরীক্ষা করে দেখা বাকি। কিন্তু এই দুর্গের প্রাচীর থেকে ইচ্ছে করলে দুরপাল্লার তীর ছুড়লে তা এই দ্বীপ পর্যন্ত পৌঁছে যেতে পারে। এই কথা মাথায় রেখে আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, নদীর পুব তীরে যেখানে কিছুদিন আগেও হুরোতাসের শিবির ছিল সেখান থেকেই এই দ্বীপটার দিকে এগোনোর চেষ্টা করব। তবে তাতে করে অনেক লম্বা পথ সাঁতার কেটে পাড়ি দিতে হবে আমাকে, কিন্তু ধীরে ধীরে শীতকালও এগিয়ে আসছে। তাই শেষ পর্যন্ত সাঁতার কেটে বরং ডিঙি নৌকা নিয়ে রাতের অন্ধকারে পাড়ি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। আশা করা যায় যে, রাতের অন্ধকারে তীরন্দাজদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে হবে না আমাকে।
প্রথম যে রাতে আমি কাজটা করার চেষ্টা করলাম সে রাতে আকাশে আধখানা চাঁদ ছিল। ফলে চারপাশ দেখার জন্য যথেষ্ট আলো থাকলেও এত বেশি নয় যে দুর্গ-প্রাচীরের ওপর থেকে আমার ডিঙি নৌকাটাকে দেখা যাবে। দুর্গের উল্টো দিক থেকে দ্বীপটার দিকে এগোতে এগোতে আমি বুঝতে পারলাম অন্য তিনটি দ্বীপের সাথে এটারও অদ্ভুত রকমের মিল রয়েছে। চারটি দ্বীপের মধ্যে কোনো ধরনের সম্পর্ক থাকার ব্যাপারে যেটুকু সন্দেহ ছিল মনে তাও এখন দূর হয়ে গেল। দ্বীপের কাছাকাছি আসার পর ওপর থেকে পানির কাছাকাছি ঝুলে থাকা একটা লিয়ানা লতার সাথে নৌকা বাঁধলাম আমি। প্রথম যে জিনিসটা আমার চোখে পড়ল সেটা হচ্ছে অন্য তিনটি দ্বীপের তুলনায় এই দ্বীপের গঠনশৈলী তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি অক্ষত। এখানে এমনকি পাথরের আলাদা আলাদা টুকরোগুলোকেও চেনা যাচ্ছে। দেয়ালের গায়ে রয়েছে পা রাখার জায়গা, যেগুলোর সাহায্যে ওপরে ওঠার কাজটা অনেক সহজ হয়ে গেল। দ্রুত ওপরে উঠে এলাম আমি; দারুণ উত্তেজিত হয়ে আছি। ওপরে ওঠার সাথে সাথেই পেয়ে গেলাম সেই খাড়া নেমে যাওয়া সুড়ঙ্গটা, ঠিক যেখানে থাকবে বলে ভেবেছিলাম। দ্বীপের মাঝখানেই রয়েছে ওটা। তবে রাতের অন্ধকারের কারণে সুড়ঙ্গটার মুখ দিয়ে বেশি দূর ভেতরে দেখার উপায় নেই।
বুঝতে পারলাম সাথে করে নিয়ে আসা মোমবাতিগুলোর একটা জ্বালানো ছাড়া কোনো উপায় নেই। কয়েক দিন আগেই নলখাগড়া বা ঘাসের তৈরি মশালের বদলে এই মোমবাতিগুলো ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমি। মৌমাছির মোম থেকে বানিয়েছি এগুলো, এবং জিনিসটা নিঃসন্দেহে কাজের। কিন্তু এর কুফল হলো এই উজ্জ্বল আলো অনেক দূর থেকেও দেখা যায়। তবে দুর্গ-প্রাচীরের ওপরে অবস্থান নেওয়া প্রহরীদের চোখে ধরা পড়ে যেতে পারি জেনেও ঝুঁকিটা নিলাম আমি। প্রথমে সুড়ঙ্গের মুখ বেয়ে নেমে এলাম বেশ কিছুটা, অন্তত যতটুকু নিরাপদ মনে হলো। তারপর চকমকি পাথর ঘষে আগুন ধরালাম কিছু কাঠের গুঁড়োতে। তারপর সেই আগুন থেকে ধরিয়ে নিলাম মোমবাতির সলতে।
উজ্জ্বল আলোতে প্রায় সাথে সাথেই খাপ খাইয়ে নিল আমার চোখ। এদিক ওদিক তাকালাম আমি, এবং বিস্ময়ে অস্ফুট শব্দ বেরিয়ে এলো আমার মুখ দিয়ে। যে সুড়ঙ্গের প্রবেশপথে আমি প্রবেশ করেছি তার দেয়ালে লাগানো রয়েছে অসংখ্য হালকা সবুজ টালি। প্রতিটি টালির গায়ে একটা করে চোখা কানওয়ালা মরুশেয়ালের ছোট্ট ছবি।
