মধ্যরাতের পরেই নদীর অপর তীরে নামলাম আমরা এবং আক্রমণ করলাম তাদের ওপর। বেশির ভাগই তখন গভীর ঘুমে মগ্ন, এমনকি প্রহরীরা পর্যন্ত। সবাই ধরে নিয়েছে যে তাদেরকে রক্ষা করার জন্য টেরামেশই যথেষ্ট। আমাদের রণহুংকারে তাদের ঘুম ভাঙল ঠিকই; কিন্তু বেশির ভাগই লড়াই করার চেষ্টা না করে চূড়ান্ত বিশৃঙ্খলা এবং কাপুরুষতার সাথে পালিয়ে গেল দুর্গ-প্রাচীরের দিকে। অর্ধেকেরও বেশি সেখানে আশ্রয় নিতে পারল। বাকিরা হয় মারা পড়ল না হয় বন্দি হলো আমাদের হাতে।
স্বাভাবিকভাবেই আমাদের সৈন্যরা পলাতকদের পিছু ধাওয়া করতে কিছুটা ভয় পাচ্ছিল। যদিও হুরোতাস তাদের সামনে একটা মাথা দেখিয়েছে এবং গতকালই দারুণ সাহসের পরিচয় দিয়েছে সবাই; কিন্তু অনেকেই ভয় পাচ্ছিল যে এই বুঝি হাজির হলো টেরামেশ।
তার পরও উটেরিকের লোকদের মধ্য থেকে প্রায় এক শর মতো লোককে বন্দি করতে সক্ষম হলাম আমরা। তাদের মধ্যে দুজনকে আমি চিনতে পারলাম। . ভালো লোক তারা, ভাগ্যের ফেরে উটেরিকের লোকদের সাথে বাধা পড়ে গেছে। জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য ওদের এক পাশে সরিয়ে নিয়ে এলাম আমি। ওরা আমাকে মনে করিয়ে দিল যে, ওদের নাম যথাক্রমে বাতুর এবং নাসলা। দুই ভাই ওরা, হিকসসদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে আমার সাথে। একটা মদের বোতল খুলে দুজনের হাতে দুটো মদভর্তি পেয়ালা ধরিয়ে দিলাম আমি। কিছুক্ষণের মধ্যেই মনে পড়ে গেল কতটা ভালো বন্ধু ছিলাম আমরা। প্রত্যেক পেয়ালা মদ পেটে পড়ার সাথে সাথে আরো দিলদরিয়া হয়ে উঠল দুই ভাই। আবু নাসকোস দুর্গের ভেতরের অবস্থা সম্পর্কে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ওদেরকে প্রশ্ন করলাম আমি। দুই ভাইও কোনো দ্বিধা না রেখেই জবাব দিল আমার সব জিজ্ঞাসার। জানাল, যেকোনো ধরনের আক্রমণের বিরুদ্ধেই প্রায় সম্পূর্ণভাবে নিরাপদ উটেরিকের দুর্গ। প্রবেশপথ কেবল একটাই এবং সেটাও নীলনদের বিপরীত দিকের দেয়ালে অবস্থিত। বিশাল এক জোড়া দরজা পেরিয়ে ঢুকতে হয় সেই পথ দিয়ে। দুর্গ-প্রাচীরের গঠন সম্পর্কে ওদের কাছে জানতে চাইলাম আমি। জানা গেল একটার ভেতরে আরেকটা- এভাবে সব মিলিয়ে তিন পাল্লা দেয়াল রয়েছে সব দিকে, এবং প্রত্যেকটাই অত্যন্ত দুর্ভেদ্যভাবে তৈরি করা। ওরা মতামত দিল যে, আক্রমণের জন্য সবচেয়ে ভালো উপায় হবে প্রাচীরের নিচ দিয়ে সুড়ঙ্গ খুঁড়ে ভেতরে প্রবেশ করা। তারপর জানতে চাইলাম, এমনিতে দুর্গের নিচ দিয়ে কোনো ভূগর্ভস্থ পথের কথা জানে কি না ওরা। কিন্তু এ ব্যাপারে দুই ভাইই জোর দিয়ে বলল যে, এমন কোনো পথের কথা তাদের জানা নেই। বোঝা গেল তেমন কোনো আশা নেই আমাদের সামনে। সমগ্র মিশরের মাঝে যে দুৰ্গটাকে রক্ষা করা সবচেয়ে সহজ সেটাই বেছে নিয়েছে উটেরিক, ভেবে এক টুকরো তিক্ত হাসি ফুটল আমার ঠোঁটে।
বাতুর আর নাসলার কাছ থেকে আরো জানা গেল যে, উটেরিক তার বেশির ভাগ ঘোড়া এবং রথকেই দুর্গ থেকে সরিয়ে দিয়েছে। খুব সম্ভব নীলনদের অববাহিকার কাছে তার যেসব দুর্গ আছে সেখানে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে ওগুলোকে, যাতে আমরা তার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিতে না পারি। তবে চল্লিশটার মতো রথ এবং ঘোড়াকে দুর্গেই রেখে দিয়েছে সে। ঘোড়াগুলো রয়েছে দুর্গের আস্তাবলে। হয়তো যুদ্ধ শুরু হলে আমাদের বিরুদ্ধে কাজে লাগাবে। তবে আমার মনে হলো যে যুদ্ধের জন্য নয় বরং দরকার হলে যেন পালাতে পারে সে জন্যই ওগুলো রেখে দিয়েছে উটেরিক।
এবার উটেরিকের পরিচয় নিয়ে যে বিভ্রান্তি সে ব্যাপারে দুই ভাইয়ের সাথে আলাপ করলাম আমি। ওরাও একমত হলো আমার সাথে। বলল, নিজের শত্রুদের অর্থাৎ হুরোতাস এবং রামেসিসকে ধোঁকা দেওয়ার জন্য নিজের নকল ব্যবহার করছে উটেরিক। তবে বাতুর এবং নাসলা দুজনই উটেরিকের কাছাকাছি থেকে কাজ করেছে এবং ওরা দাবি করল যে, আসল এবং নকল উটেরিকের মধ্যে তফাত ধরার ক্ষমত্ম আছে ওদের। তা যদি সত্যি হয় তবে বলতেই হবে যে ওরা অনেক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল আমাদের কাছে। তারপর জানা গেল প্রতিটা দিনই উটেরিকের উন্মাদনা নাকি আরো বাড়ছে, বাস্তবতা থেকে ক্রমেই আরো দূরে সরে যাচ্ছে সে। মনের ভেতর চলমান আকাশকুসুম কল্পনার কাছে হার মানছে তার বাস্তব জ্ঞান। এই খবরটা শুনে অবশ্য খুব বেশি অবাক হলাম না আমি। উটেরিকের মানসিক অবস্থা কখনোই সুস্থ ছিল না।
গত দুই বছর ধরে আবু নাসকোস দুর্গে বসবাস করে আসছে দুই ভাই। বিশাল ওই দুর্গের বেশির ভাগ গোপন পথ ঢোকা এবং বের হওয়ার রাস্তা এবং অন্যান্য অনেক কিছুই ওদের জানা হয়ে গেছে। যখন আমি জানতে চাইলাম যে ওরা কীভাবে উটেরিকের জালে ধরা পড়ল তখন ওরা বলল, নিতান্তই তরুণ অবস্থায় ফারাও টামোসের বাহিনীতে যোগ দিয়েছিল ওরা। টামোস যখন হিকসসদের হাতে মারা পড়লেন তখন তার বড় ছেলে উটেরিকই ফারাওয়ের মুকুট পরেছিল। কিন্তু খুব দ্রুতই উটেরিকের প্রতি সকল শ্রদ্ধা হারিয়ে ফেলেছিল দুই ভাই। দুজনই আমাকে আশ্বস্ত করল যে, অনেক আগে থেকেই ফারাও রামেসিসের পক্ষে যোগ দেওয়ার কথা চিন্তা করছিল তারা। রামেসিসকেই তারা সম্মান করে এবং ফারাও হিসেবে দেখতে চায়।
দুজনকে রামেসিসের সামনে নিয়ে এলাম আমি। সেও চিনতে পারল ওদের। বলল, এদের সম্পর্কে তার মনে কোনো সন্দেহ নেই। দুই ভাইকে গোপনে আমাদের গুপ্তচর হিসেবে কাজে লাগানোর প্রস্তাবে একমত হলো ও। বলল, ভবিষ্যতে কোনো না কোনো উপায়ে দুর্গে ঢুকতে হলে এদের সাহায্য কাজে আসতে পারে আমাদের। দুই ভাইয়ের মধ্যে বাতুরই বয়সে বড়। আবু নাসকোসে ফিরে যেতে সম্মত হলো সে। সেখানে গিয়ে সে অজুহাত দেখাবে এই বলে যে, হুরোতাসের সৈন্যদের হাতে সে ধরা পড়েছিল ঠিকই; কিন্তু পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে। তারপর সবার চোখে ধুলো দিয়ে ঢুকে পড়েছে আবু নাসকোসের ভেতরে। ছোট ভাইয়ের নাম নাসলা। দুর্গের বাইরে আমাদের সাথেই থাকবে সে, দুর্গের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার উটেরিক সম্পর্কে পরামর্শ ও তথ্য দিয়ে সাহায্য করবে আমাদের। নিজেদের মধ্যে দূর থেকে গোপনে যোগাযোগ রক্ষা করার জন্য এক জটিল পদ্ধতি আবিষ্কার করেছে তারা, ফলে তাদের তথ্য আদান-প্রদানে কোনো অসুবিধা হবে না বলেই আশা করা যায়।
