সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকা সৈন্যদের সামনে তৈরি করা মঞ্চে এবার উঠে দাঁড়াল রাজা হুরোতাস এবং ফারাও রামেসিস। পরস্পরের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়াল তারা; কিন্তু সৈন্যদের মাঝ থেকে কোনো উল্লাসধ্বনি ভেসে এলো না। ঢালের সাথে তলোয়ারের বাড়ি দিয়ে তাদের স্বাগত জানাল না কেউ।
বেশ কিছুক্ষণ বিরাজ করল এই গম্ভীর নীরবতা। তারপর একটা ইশারা করল হুরোতাস। সংকেত পেয়ে দুই দাস উঠে এলো মঞ্চের ওপর। দুজন মিলে বেতের তৈরি বড় একটা ঝুড়ি বয়ে এনেছে তারা। হুরোতাসের নির্দেশ পেয়ে সেটা এবার রাখল মঞ্চের সামনে। তারপর পিছিয়ে গেল আবার, যাওয়ার আগে মঞ্চের কাঠের মেঝেতে মাথা ঠেকিয়ে কুর্নিশ করে যেতে ভুলল না। আরো কয়েক মুহূর্ত নীরবতার পর কথা বলতে শুরু করল হুরোতাস।
দুই দিন আগে ফারাও রামেসিস এবং তার স্ত্রী ফারাওইন সেরেনা নীলনদ পাড়ি দিয়ে গোপনে শত্রু এলাকায় প্রবেশ করে। তাদের সঙ্গী হয়েছিল সম্মানিত টাইটা। আমরা সবাই যাকে দাগীমুখো তীরন্দাজ বলে জানি সেই শয়তানটার খোঁজেই গিয়েছিল তারা।
সৈন্যদের মাঝ থেকে একটা সম্মিলিত রাগান্বিত গুঞ্জন উঠল। হাতের ইশারায় তাদের চুপ করতে বলল হুরোতাস, তারপর বলে চলল আবার।
এই তীরন্দাজের আসল পরিচয় হচ্ছে টেরামেশ, অজেয় যার উপাধি। আমি আমার বীর প্রতিনিধিদের নির্দেশ দিয়েছিলাম তার আস্তানা খুঁজে বের করতে, তারপর তাকে উপযুক্ত উপায়ে শাস্তি দিয়ে তার কাটা মাথাটা আমার কাছে নিয়ে আসতে। কিন্তু এটাও বলে দিয়েছিলাম যে, এখানে আসার পর আমার আগে যেন আর কাউকে না দেখানো হয় সেই কাটা মাথা। এই পর্যায়ে আসার পর অনেকেরই মনোযোগ এখন হুরোতাসের দিকে নিবদ্ধ হয়েছে। ধীরে ধীরে মনমরা ভাবও কাটিয়ে উঠছে তারা। এমনকি সব ঘটনার সক্রিয় অংশগ্রহণকারী আমি নিজেও হুরোতাসের বক্তৃতা শুনে মুগ্ধ হয়ে গেলাম। এবার হাতের ইঙ্গিতে সামনে রাখা বেতের ঝুড়িটার দিকে নির্দেশ করল হুরোতাস। সাথে সাথে উপস্থিত রথচালক, পদাতিক এবং তীরন্দাজদের সবগুলো চোখ যেন মন্ত্রমুগ্ধের মতো ঘুরে গেল সেদিকে। এবার সামনে এগিয়ে এসে ঝুড়ির ডালাটা খুলে দিল হুরোতাস, তারপর ভেতরে হাত ঢুকিয়ে বের করে আনল একটা মানুষের মাথা। সেটাকে সবার দেখার জন্য উঁচু করে ধরল সে।
মাথাটার সাথে এখনো লেগে আছে পচা চামড়া আর মাংস। মুখটা হাঁ করে খোলা, নীলচে জিভটা বেরিয়ে আছে সেখান দিয়ে। চোখের কোটরগুলো শূন্য, যেন জিভ বের করে ভ্যাঙাচ্ছে সবাইকে।
এই যে সেই টেরামেশের মাথা! গর্জে উঠল হুরোতাস। উপস্থিত কেউই তার কথায় এক চুল সন্দেহ প্রকাশ করল না, কারণ মাথাটার সাথেই বাঁধা রয়েছে সেই সোনালি শিরস্ত্রাণ, যাকে সৈন্যরা সবাই খুব ভালো করেই চেনে এবং মৃত্যুদূতের মতো ভয় পায়। সাথে সাথে আট হাজার গলার সম্মিলিত জয়োল্লাসে কেঁপে উঠল চারপাশ।
টেরামেশ! টেরামেশ! টেরামেশ! তলোয়ার বের করে আনল সবাই, তারপর ঢালের সাথে তলোয়ারের বাঁট ঠুকতে লাগল উচ্চকিত চিত্তারের তালে তালে। মনে হলো যেন মানুষের কণ্ঠস্বর নয় বরং বজ্রপাত হচ্ছে একের পর এক।
বেশ কিছুক্ষণ তাদের চিৎকার করার সুযোগ দিল হুরোতাস। তারপর তাদের গলা যখন কর্কশ হয়ে এসেছে তখন কাটা মাথা থেকে শিরস্ত্রাণটা খুলে আনল সে, তারপর উঁচু করে ধরল সবার সামনে।
আসন্ন যুদ্ধে যে সেনাদল সবচেয়ে বেশি নৈপুণ্য প্রদর্শন করবে তাদেরকেই উপহার দেওয়া হবে এটা, ঘোষণা করল সে। সাথে সাথে আবার সিংহের মতো গর্জন করে উঠল সবাই। তারপর অন্য হাতে শূন্য অক্ষিকোটর আর ঝুলে পড়া জিভসহ কাটা মাথাটা উঁচু করে ধরে বলল, এবং এই মাথাটাকে উপহার দেওয়া হবে পরলোকের শাসনকর্তা হেডিসকে। আর তার কাছে এটা বয়ে নিয়ে যাবেন অগ্নিদেবতা হেফাস্টাস।
এই বলে মাথাটা নিয়ে কাছের অগ্নিকুণ্ডের দিকে এগিয়ে গেল সে, তারপর আগুনে ছুঁড়ে দিল। আমাদের সবার চোখের সামনে পুড়ে ছাই হতে লাগল সেটা। বিচক্ষণ রাজার মতোই সিদ্ধান্ত নিয়েছে হুরোতাস, ভাবলাম আমি। এখন আর কেউ খুলিটার সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারবে না, কারণ আর ওটার অস্তিত্ব রইল না।
*
সমস্ত দিন জুড়ে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে কাটাল সৈন্যরা। ধনুকে ছিলা জুড়ল তারা, তলোয়ারে ধার দিল, মেরামত করিয়ে নিল ঢাল আর বর্ম, সেইসাথে যতটুকু পারে বিশ্রাম নিয়ে নিল। আকাশের ক্ষয়টে চাঁদটা ডুবে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করলাম আমরা। তারপর যখন রাত নামল, সারি ধরে এগিয়ে নদীর তীরে হাজির হলো সবাই, উঠে পড়ল নিজেদের নির্ধারিত জাহাজে। কেউ কোনো রকম আলো জ্বালছে না, ফিসফিস করে নির্দেশ জানাচ্ছে। অধিনায়কেরা। এক এক করে রওনা দিল সৈন্যবোঝাই জাহাজগুলো, আলাদা আলাদা পথ ধরে এগিয়ে চলল উজানে। বিগত দিন এবং সপ্তাহগুলোতে নদীর ওই পারে আমাদের সৈন্যদের অবতরণের জন্য বেশ কিছু জায়গা বেছে রাখা হয়েছে সতর্কতার সাথে, এখন সেদিকেই এগিয়ে চলেছে ওরা।
আমরা ঠিক করেছিলাম শত্রুদের পাহারাদারদের চমকে দেব, এবং এ ক্ষেত্রে আমাদের নিরাশ হতে হলো না। টেরামেশের সুরক্ষার কারণে নিজেদের নিরাপদ ভাবতে শুরু করেছিল উটেরিক এবং তার লোকেরা। জানা গেছে এই সুরক্ষার বদলে তাকে দশ লাখ রৌপ্যখণ্ড দিয়েছিল উটেরিক। তবে এখন পর্যন্ত সে জানে না যে তার নিয়োগকৃত পাহারাদার আর বেঁচে নেই। আর এর ফলে উটেরিকের সৈন্যদের মধ্যে অর্ধেকই এখন আবু নাসকোস দুর্গের বাইরে অবস্থান করছে। সেখানে শস্য এবং সবজি চাষ করছে তারা, সেইসাথে গরু এবং ছাগল পালনের ব্যবস্থা করছে। অভিযানের সামনের দিনগুলোতে এগুলো দিয়েই নিজেদের রসদ জোগানোর পরিকল্পনা করেছে তারা।
